Thursday, September 2, 2010

আত্মার বন্ধন

অনেকদিন ধরেই কিছু লিখতে পারছিল না নীল। কাগজ কলম হাতে নিয়ে বসে থাকে... মনের মধ্যে হয়ত কবিতার দু'এক লাইন গুন গুন করে ওঠে... তারপর নিজেই বিরক্ত হয়ে যায়। নিজের ভিতরে জমে থাকা কষ্টের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতেই বুঝি কাগজটাকে টুকরো টুকরো করে ছিড়ে ফেলে নীল। এই ঘটনা আজকাল প্রায় ঘটায় সে। কখনও কাগজ ছেড়ে, কখনও কলমটাকে ভেঙ্গে ফেলার বৃথা চেষ্টা করে... এখন আর নীলের কীবোর্ড থেকে খটখট শব্দের ঝড় ওঠে না...লিখতে ইচ্ছা করে না নীলের। মনে হয়, গল্প, কবিতা লেখার মত হাস্যকর প্রহসন আর কিছু হতে পারে না... বাস্তবের সাথে প্রহসন!

অর্ণব বেশ কিছু দিন ধরেই বলছে... এবার তোকে কিছু লিখতেই হবে। এই ছেলেটার কথা ভাবলেও নীলের অবাক লাগে। নীল বুঝতে পারেনা... আসলে অর্ণব কি চায়! কেন সবসময় ছায়ার মত ওর পাশে থাকে! নীলের মধ্যে যে ক্ষ্যাপাটে মানুষটা বাস করে... সেই মানুষটার কোন ঠিক ঠিকানা নেই... ইচ্ছা হলে খাবে, না ইচ্ছা হলে খাবে না। হয়ত কাল পরীক্ষা, কিচ্ছু পড়বে না, পায়ে একজোড়া চটি জুতো গলিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পরবে। মাথাটা নীচু করে একা একা হাঁটতে থাকবে... কাল কি হবে, সেই ভাবনা আজ সে ভাবে না... অন্যের কথা ভাবলেও ভাবতে পারে... কিন্তু নিজের ব্যাপারে পুরো উদাসীন সে। সেই নীলকে কিনা ইদানীং অর্ণবের কথা ভাবতে হচ্ছে। ছেলেটা তাকে রীতিমত ভাবিয়ে তুলছে। নীলের সবকিছুতে তার এতো খেয়াল, মনে হচ্ছে অর্ণবের আন্তরিকতার কাছে সে বাঁধা পড়ে যাচ্ছে। কি করবে বুঝতে পারে না নীল। যে ছেলে নীলের চোখের বিষন্নতা কেড়ে নিতে চায়, তাকে কি করে সে বলবে, "আমার কথা তোর ভাবতে হবে না"। নীল তো চায় না পৃথিবীর একজন মানুষকেও কষ্ট দিতে। অর্ণব একটু স্বার্থপর টাইপের ছেলে হলে নীল খুশি হত। তাহলে অন্তত সে নীলের মত ছন্নছাড়ার বন্ধু হত না সে। অর্ণব এখন নীলের কাছে রীতিমত এক বিস্ময়। একবার সিড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে প্রায় পা পিছলে পড়ে গিয়েছিল অর্ণব, চট করে হাত ধরে ফেলেছিল অচেনা নীল। পা মচকে সিড়িতেই বসে পড়েছিল অর্ণব। ওর আবার একটা অদ্ভুত সংস্কার আছে, কখনও কাউকে পা ছুঁতে দেয় না, নিজেও কারোর পা ছোঁবে না। নীলকেও নিষেধ করেছিল। নীল একটা ঝাড়ি দিয়ে বলেছিল, পায়ে মনে হয় বেশ ভালই ব্যাথা পাইছো, বেশী বকবক করো না। তোমার পা ছুঁলে কি আমার জাত যাবে নাকি? ওই ঝাড়ি খেয়ে আর কিছু বলার সাহস হয়নি অর্ণবের। বিপদ হয়েছে নীলের, একটা ছায়াসংগী জুটেছে!

অর্ণব মাঝে মাঝেই রক্তের খোঁজে এ রুম ও রুমে ছোটে। নীল বুঝে না... এই কাজে ও এতো কি আনন্দ পায়! এটা মনে হয়, কাজটা ভাল... কিন্তু অর্ণব মনে হয় কাজটাকে ভালোবাসে! এটা কি আসলেই ভালোবাসার মত কোন কাজ? ও যেভাবে এক হলে রক্তের খোঁজ না পেলে অন্য হলে খোঁজ নেয়, সেখানে না পেলে আরেক হলে... ওহ, এতোটা করার কথা ভাবে না নীল। কাউকে রক্তের খোঁজ দিতে না পারলে অর্ণব যেন রোগীর আত্মীয় স্বজনের চেয়ে বেশী নিরাশ হয়ে পড়ে! অর্ণব বলে, যারা একসাথে বাঁধন এ কাজ করে, তারা সবাই নাকি এইরকম। এভাবেই বাঁধন এর কাজের সাথে ওদের আবেগ জড়িয়ে গেছে! সেইবার রক্তের গ্রুপ পরীক্ষার জন্য জোর করে ধরে নিয়ে গেল অর্ণব! মহা বিরক্ত হয়েছিল সেদিন নীল । এমনিতেই রক্ত দেখলে ওর ভেতরটা কেমন গুলিয়ে ওঠে। লাভের ব্যাপার এই... রক্তের গ্রুপটা জানা গেল, AB+. অবশ্য না জানলেও তার কোন সমস্যা হচ্ছিল না। অর্ণবদের মনে হয় সমস্যা হচ্ছিল... লিস্টিং করতে এসে হতাশ হয়ে ফিরে গেছে।

এইতো সেদিন নীল হলে ফিরে দেখে টেবিলের উপর এক গুচ্ছ সাদা রঙের ফুল... সাথে ছোট্ট একটা রাইটিং প্যাড, একটা চিরকুট...


তোর জন্য।

কয়েকদিন দেখা হবে না...


বাড়িতে যাচ্ছি।


মা অসুস্থ।


নিজের খেয়াল রাখিস।


--অর্ণব



কি বলার আছে... অর্ণব মেয়ে হলেও না হয় বোঝা যেত... ব্যাপারটাকে প্রেম ট্রেম কিছু বলা যেত। তাও তো বলা যাচ্ছে না... সবকিছুই ঠিক ছিল... কিন্তু ওই ফুল দিয়ে যাওয়া কি মনোভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি না! আচ্ছা এটা কি? এইসব শব্দতো ইদানীং মাথায় ও আসতে চায় না। শব্দগুলো কি হতে পারে? মমতা, স্নেহ, ভালোবাসা... আচ্ছা বন্ধুত্ব ব্যাপারটাও কি এক রকমের ভালবাসা? নীল একমাত্র মা ছাড়া আর কারোর ভালোবাসাটা বুঝতে পারে না। ভাই, বোন, বাবাও ঠিক কতটা ভালোবাসে সে জানেনা। আসলেই কি বাসে নাকি সংসারে একসাথে থাকলে এমনিতেই একটা অনুভূতি তৈরী হয়? কিন্তু মায়ের অনুভুতিটা যদি ভালোবাসা হয় তাহলে অন্যগুলো কি? নাহ মেলে না... ওগুলো হয়ত বন্ধন, কিন্তু সবগুলোই কি ভালোবাসা?... তা কি করে হয়... আজকাল মাথায় আর এসব জটিল জিনিস ঢুকে না। কেবল এখনও মায়ের ভালোবাসাটা বুঝে... মা এখনও ঘুমের মাঝে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে যায়, খেতে গেলে মুখে তুলে খাইয়ে দেয়, কপালে চুমু দিয়ে যায়... কোনকিছু যখন খুঁজে না পায়... তখন পাশে এসে আস্তে করে বলে যায়, ওই যে, ওইখানে রেখেছিস, ভুলে গেছিস? আজ মা নেই বলেই হয়ত মায়ের অস্তিত্ব আরো বেশী করে টের পায় নীল। মাস চারেক আগে, এক সড়ক দূর্ঘটনা নীলের কাছ থেকে ওর মাকে কেড়ে নেয়। ওর মায়ের মুখের শেষ শব্দটা ছিল, নীল......! মা যদি আর একবার এসে ওকে বলত... নীল, তোর নতুন কবিতাটা আমাকে শোনাবি না? তাহলে কি নীল না লিখে পারতো!?

অর্ণবের ডাকাডাকিতে ঘুম ভেঙ্গে গেল নীলের। এই ভোর বেলায় অর্ণব!

--আরে, তুই না বাড়িতে ছিলি, আসলি কখন?

--ওসব কথা পরে হবে, তুই এখন রক্ত দিতে পারবি? মা অপারেশন থিয়েটারে... AB+ রক্ত লাগবে, কাউকে পাচ্ছি না! আমার মা মনে হয় বাঁচবে নারে নীল!

বলেই অঝরে কাঁদতে শুরু করে দিল অর্ণব... যেন অনেক জল ওর চোখে জমা হয়ে ছিল... কিন্তু এসব দেখার সময় নেই নীলের। ওর মাথায় ঘুরছে কেবল একটা কথা, "মা মনে হয় বাঁচবে নারে নীল!!" অর্ণবের কাঁধে হাত রাখে নীল।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে অর্ণবের মা, মাথার কাছে বসে আছে নীল, পাশে অর্ণব। অপারেশনের পর ডাক্তার ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছেন। এ যাত্রা বেঁচে গেছেন তিনি... কিন্তু আরেকটু দেরী হলে কি হত বলা মুশকিল! কি মায়াবী, প্রশান্ত চেহারা অর্ণবের মায়ের! একি শুধু অর্ণবের মায়ের মুখ! নীলের মায়ের মুখও তো একই রকম ছিল!... নীলের মনে হচ্ছে, এক্ষনি মা ঘুম থেকে উঠে বলবে, নীল, তোর নতুন কবিতাটা আমাকে শোনাবি না? নীল কি না শুনিয়ে পারবে? তার রক্ত যে আজ নতুন কবিতা লিখেছে... কবিতার নাম "আত্মার বন্ধন"।

প্রকাশঃ সুভ্যেনির, বার্ষিক সাধারণ সভা-২০০৮, বাঁধন (স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের সংগঠন)

মায়ের মত বউ!

আড্ডা দিচ্ছিলাম বুয়েট শহীদ মিনারের ঘাষের উপর বসে, আমরা চারজন। আড্ডাটা আসলে আরো বিশাল হওয়ার কথা ছিল... দুর্ভাগ্যবশত Rangs ভবনে সেদিন সকাল থেকেই চলেছে হাতুড়ির আঘাত। সেই আঘাত সইতে না পেরে ক্ষোভে অভিমানে গ্রামীনফোনের নেটওয়ার্ক সকাল থেকে বন্ধ! তাই বাংলালিঙ্ক, একটেল এর সম্মানিত চারগ্রাহক বাকিদের সাথে যোগাযোগ না করতে করতে পেরে বসিয়ে ছিল ছোট্ট একটা সান্ধ্য আড্ডা। এইখানে বলে রাখি, আমাকে আমার ব্যাচমেটদের সাথে আড্ডা দিতে দেখা যায় কদাচিৎ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যাদের সাথে দেখা যায় তারা আমার চেয়ে বয়সে বড়ো... কাজের সুবাদে তাহাদের সাথে আমার পরিচয়, অতঃপর সখ্যতা। বয়সে কিবা আসে যায়, যা কিছু আসে যায় তা কেবলই মানসিকতায়। এইবেলা চারজনের পরিচয়খানি দিয়ে ফেলি... রাকিবা আপু, আশীষদা, সুকান্তিদা এবং আমি, উহাদের মধ্যে কনিষ্ঠতম সরল(!) বালিকা। চারটা ভিন্ন ডিপার্টমেন্টের, চার ব্যাচের চারজন ভিন্ন স্বভাবের মানুষ। মিল শুধু একটা জায়গায়... আমরা বাঁধন কর্মী। ভ্যাম্পায়ারদের(বাঁধন কর্মীদের) কথা শুনে ভয় পাবেন না... আমাদের আড্ডার বিষয় কেবল মাত্র ভ্যাম্পায়ারিজম নয়। স্বর্গ থেকে মর্ত্য পর্যন্ত হালকা এবং কঠিন রসে পরিপূর্ণ সব কিছুই আমাদের আড্ডায় ঠাঁই পায়!

এ কথা সেকথায় একসময় আশীষদা বললেন, তিনি যেখানে পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকেন, সেই বাসার আন্টির কথা। আন্টি এতো ভালো যে বাসার সবাই না খেলে তিনি না খেয়ে বসে থাকেন। আশীষদা দেরী করে ঘরে ফিরলে হয়ত আন্টি না খেয়ে বসে থাকবেন। শুনেই চট করে বলে ফেললাম, আমার এই রকম শাশুড়ী চাই, যে আমাকে খুব আদর করবে! বাকি তিনজনের কেউই হয়ত আমার চেয়ে চালাক নয়... তাই এই কথা নিয়ে কেউই আমাকে মধুর খোঁচা শোনায় নি। এই সুযোগে আমি একটু ভাবার সময় পেয়ে গেলাম... আমার আসলে কেমন শাশুড়ী চাই! ভেবে দেখলাম, শুধু এইটুকুতেই আমার সাধ মিটবে না। আমার মামণি এখনো আমাকে মুখে তুলে খাইয়ে দেয়। আমার আসলে আমার মায়ের মত শাশুড়ী দরকার, যিনি পুত্রবধূর মুখে তুলে খাইয়ে দিতেও সানন্দে রাজি থাকবেন, আমাকে আমার মায়ের অভাব বুঝতে দেবেন না! আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে চট করে সুকান্তি দা বলে ফেললেন, আমার মায়ের মত শাশুড়ীতে চলবে না, মায়ের মত বউ চাই! সাথে সাথে মুহূর্তটা সুকান্তিদা বাদে বাকি তিনজনের বিস্ময়ধ্বনি আর অট্টহাসিতে মুখর হয়ে গেল... এরপর শুরু হল সুকান্তিদার প্রতি তীক্ষ্ণ বাক্যবাণ! ... হুমম বউমা কি মায়ের মত স্বভাবের? মানে, আমরা আর ডিটেইলসে না যায়! আমি ফিচেল মার্কা হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করি, বৌদির স্বভাবগুলো একটু বলেন দেখি... কি কি করেন? সোজা কথা, সুকান্তিদার রোমান্টিক লাইফের ফালুদা বানিয়ে ছেড়ে দিলাম! সুকান্তিদা আমাদের চেয়েও এক কাঠি উপরে... নিজের বিয়ের প্ল্যান নিজ মুখে বলে গেলেন... মানে এই আরকি... কবে বিয়ে করবেন, সিনিয়ররা যেন তার আগেই বিয়ে করে নেয়... ইঙ্গিতে সেই হুশিয়ারি উচ্চারণ করলেন... আরো অজস্র কথায় সেদিনের আড্ডা শেষ হল। কিন্তু মায়ের মত বউ কথাটার রেশ আমার মাথায় রয়ে গেল... পরে মনে মনে বলেছি, শাবাশ সুকান্তিদা!


যারা রবীন্দ্রনাথের দুইবোন উপন্যাসটা পড়েছেন তারা বুঝবেন, মেয়েদের আসলে দুটো জাত। একটা মায়ের জাত, আরেকটা প্রেমিকার জাত। একজন ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল, আরেকজন হেলেন অফ ট্রয়! পৃথিবীতে যা কিছু কল্যানকর, তার অর্ধেক(আমার মতে অর্ধেক নয়, তারচেয়েও বেশী) যদি সত্যিই গড়ে থাকে নারী, তবে সেই অর্ধেক গড়েছে শুধু এই মায়ের জাতটাই। অপরিসীম আত্মত্যাগের বিনিময়ে ওরা সব মহৎ কাজের পিছনে মহত্বর প্রেরণা হয়ে থেকেছে। এই পৃথিবীতে ভালোবেসে চোখের জলও ফেলে কেবল এই জাতটাই। আজো বাঙ্গালী মেয়েরা প্রিয়তমের জন্য নিজের হাতে রান্না করে, সামনে বসে খাইয়ে আনন্দ পায়। প্রগাঢ় ভালোবাসায় সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিয়ে আনন্দে তাদের চোখের কোণে জল আসে। ঘুমন্ত প্রিয়জনদের নিষ্পাপ মুখের দিকে গভীর মায়ায়, মুগ্ধ বিস্ময়ে চেয়ে থাকে, বোধের অজান্তেই তাদের হাত প্রিয়মানুষদের চুলে বিলি কেটে যায়, ভালোবাসা দিয়ে তাদের পৃথিবীর সব অমঙ্গল থেকে আগলে রাখতে চায়। একজন মেয়ে হয়েও বলতে দ্বিধা নেই, ওইখানে প্রেমিকার জাতের কোন অধিকার নেই। হেলেন অফ ট্রয়রা অথবা রবীন্দ্রনাথের উর্মিলারা ছলনার জালে জড়াতে পারে, ভাঙতে পারে, তছনছ করতে পারে, কিন্তু গড়তে পারে না। ওরা পৃথিবীতে পেতে এসেছে, কাউকে কিছু দিতে আসেনি! তবু মাঝে মাঝে নির্বোধ কিছু মানুষের কারনে মায়ের জাতটাকে কষ্টের নদীতে স্নান করতে হয়। সুকান্তিদা অন্তত সেই নির্বোধের দলে নয়।


মায়ের মত নারীদের শ্রদ্ধা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। আমার ভান্ডারে যত শব্দ আছে তার একটা শব্দও তাদেরকে শ্রদ্ধা জানানোর উপযুক্ত নয়। মা, তুমি আমাকে ক্ষমা কর, ক্ষমা কর, ক্ষমা কর!


প্রকাশঃ ২৮ অক্টোবর, ২০০৭