Wednesday, July 25, 2012

নীলকণ্ঠের চিঠি (২৫শে জুলাই, ২০১২)

অরুণাভ,

তুমি এমন একজন মানব চরিত্র, যার জন্ম আমার মনোভূমে, কিভাবে তার জন্ম হয়েছিল ঠিক আমি বলতে পারবো না। এসো, আমরা দুজনে মিলে তোমার জন্মের ইতিহাস খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। তখন আমি এক স্কুল পড়ুয়া বালিকা ছিলাম, যার হৃদয়ের উন্মেষ হতে চলেছে একটু একটু করে। আমার মনে পড়ে, আমার হৃদয়ের উন্মেষটা যে সময়কালে হয়েছিল, সেই সময়টাকে বলা চলে আমার কৈশোর বেলা। আমি হয়ত তখন পড়ি সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণীতে। সদ্য পেরিয়েছি আমার শৈশব। কি অবাক হচ্ছ? একজন নারী বলছে তার শৈশব পেরুতে লেগে গেছে বারোটি-তেরটি বছর! হ্যাঁ, ঠিক তাই। শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে উপনীত হবার নির্দিষ্ট কোন বয়স নেই, এই রূপান্তরটি ঘটে একজন মানুষের মনের ভিতরে, তার মানসিক বিকাশের সাথে সাথে। আমাদের বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা  খুব অল্প বয়সেই ভাবতে শুরু করে তারা বড় হয়ে গেছে। আমি যখন ক্লাস সিক্স কি সেভেনে পড়তাম, তখন আমি বাদে আমার ক্লাসে আর একটি মেয়েও ছিল না, যে নিজেকে শিশু ভাবতো। তাদের তখনকার ভাবখানা ছিল তারা যথেষ্ট পরিমাণে মানসিক ভাবে পরিপক্ব, বড় হয়ে গিয়েছে তার, তাছাড়া এখনো যারা মানসিকভাবে পরিপক্বতা অর্জন করে নাই, তারা হাসির পাত্র। বুঝতেই পারছ অরুণাভ, আমি ছিলাম সেই ব্যক্তি, যে তখনো শিশুসুলভ আচরণের কারণে সমবয়সী বালিকাদের কাছে ছিল হাসির পাত্র। আমি তখন পুতুল খেলাতাম না ঠিক, তবে আমার সহপাঠিনীদের কথা, মনোভাব, চিন্তার দৌড় এসব আমি বুঝতে পারতাম না। আমি তখন সত্যকার অর্থেই একটি শিশু ছিলাম, মেয়ে হয়ে উঠিনি। আমার মাঝে কোন লিঙ্গ প্রভেদ গত বোধ ছিল না। আমি যে স্কুলটিতে পড়তাম, সেই স্কুলে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত ছেলে-মেয়েরা একসাথে পড়ত। পঞ্চম শ্রেণী থেকে ছেলেরা ভর্তি হত অন্য একটি ছেলেদের স্কুলে। তাই পঞ্চম শ্রেণী থেকে আমার কোন সহপাঠী ছিল না, ছিল কেবল সহপাঠিনী। সেই সময় থেকেই আমি কেমন একটা নতুন পরিবেশের মধ্যে পড়ে গেলাম, য পরিবেশে ঠিক খাপ খাওয়াতে পারছিলাম না আমি। আমার কাছে সহপাঠিনী ডরথী আর সহপাঠী মুশফিকের মাঝে কোন প্রভেদ ছিল না। ওরা দুজনেই যখন আমার সাথে পড়ত, তখন ওরাও পরস্পরকে প্রভেদ করত কিনা আমার জানা নেই, তবে বউচি খেলায় যে ছেলে আর মেয়েদের দল আলাদা হত মনে আছে সে কথা। এমনকি বউচি খেলা থেকে ক্লাসরুমে ফিরে এসে যে ক্লাসের মেয়েরা আমাকে বলেছিল মুশফিকের সাথে মুনার প্রেম, সেও আমার কাছে ভিনগ্রহের কোন কথা মনে হত। আমি বোকার মত বলতাম, এর মানে কি? প্রেম কিভাবে হয়? আমার এসব বোকার মত প্রশ্ন শুনে আমার চারপাশের ইঁচড়ে পাকা বালিকাদের দল যে হো হো করে হেসে ফেলত, খুব মনে আছে তা। আমি বোকা থেকে আরও বোকা হয়ে যেতাম। এখন এসব কথা মনে পড়লে আমার ঠোটে মুচকি হাসি খেলে যায়, আমার জন্য নয়, আমার সহপাঠী ইঁচড়ে পাকা বালক বালিকাদের জন্য, আমি নাহয় বোকা ছিলাম, কিন্তু ওরা আমার চেয়েও বোকা ছিল। আমি জানতাম, প্রেম কাকে বলে, আমি বুঝি না, কিন্তু ওরাও যে বোঝে না, সেটাও ওরা তখন বুঝত না। দশ বছর বয়সে বুঝতাম না, এখনও ছাই বুঝি আমি!

আমার সহপাঠীরা অন্য স্কুলে ভর্তি হবার পর থেকে সহপাঠিনীরা আরও অন্যরকম হয়ে গেল। তাদের চোখে মুখে চাপা কৌতুক আর কৌতূহল! তারা ছেলেদের ব্যাপারে যেমন আগ্রহী, তেমনি আগ্রহী  মেয়েদের ব্যাপারে। একটা পরিষ্কার লাইন টেনে ছেলে আর মেয়েদের আলাদা করে ফেলেছে। এইযে মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন, আমার তখনো সেই পরিবর্তন ঘটেনি। বয়সের তুলনায়, চারপাশের কিশোরীদের তুলনায় আমার অপরিপক্বতা আমাকে অসস্ত্বিতে ফেলে দিতো। একধরণের অচেনা সংকোচে আমি ওদের থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছিলাম। তখন আমি সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি, অথচ পিরিয়ড কি, তা জানিনা। এটা শুনে আমার ক্লাসের একটি মেয়েও আমাকে বিশ্বাস করেনি। ওরা ভেবেছিল, আমি জানি,অথচ না জানার ভান করছি। যাই হোক, যদিও বিশ্বাস করেনি কেউ যে আমি জানিনা, কিন্তু তবুও আমাকে বিপাশা বলেছিল, মেয়েদের প্রতিমাসে একবার করে রক্তপাত হয়, এটাকে পিরিয়ড বলে। তখন পরিচ্ছন্ন থাকার জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করতে হয়। তোমার যখন হবে, তখন তুমি আরও ভালো করে বুঝতে পারবে। এসব ব্যাপার আমাকে মা শিখিয়েছে, আমাদের সাথে পরা অধিকাংশ মেয়েকেই তাদের মা বা বড় বোন শিখিয়ে দেয়। তুমি তোমার আম্মুকে জিজ্ঞেস কর, আন্টি তোমাকে বুঝিয়ে দেবে। আমি বিপাশাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এটা কি কোন অসুখ? রক্তপাত কেন হয়? বিপাশা আমাকে বলেছিল, না অসুখ নয়, একটা স্বাভাবিক ব্যাপার, প্রত্যেকটা মেয়ের এটা হয়। এইসময় মেয়েদের শরীর বদলে যায়। সেই প্রথম আমি মেয়েদের শারীরবৃত্তীয় চক্র সম্পর্কে তত্ত্বীয় জ্ঞান পেয়েছিলাম, বাস্তবে বুঝেছি তারও বেশ কিছুটা পড়ে। এখন বুঝি, আমি আমার সহপাঠিনীদের চেয়ে কেবল মানসিক ভাবে  অপরিপক্ব ছিলাম না, শারীরিক ভাবেও ছিলাম, আমার মনো-দৈহিক পরিবর্তনগুলো খানিকটা ধীরে হয়েছে।

এই মনো-দৈহিক ব্যবধানটা আমি বাস্তবে আর কোনদিনই অতক্রম করতে পারিনি। আমার যখন শৈশব পেরিয়ে কৈশোর এলো, চিন্তায় মননে কিছুটা পরিপক্বতা, স্থিরতা এলো, তখন আমি আগ্রহী হয়ে উঠেছি চারপাশের অনেক অজানাকে জানতে। তখন থেকেই আমার সাহিত্য পাঠ শুরু হল। আগেই বলেছি, আমি আমার সহপাঠীদের সাথে ব্যবধানটা অতিক্রম করতে পারিনি, তাই আমার কোন বন্ধুও ছিল না, যার সাথে চিন্তা ভাবনার আদান প্রদান আমি করতে পারি। তাই বড় হয়ে উঠতে থাকলাম একা একাই, চুপচাপ বসে বসে অন্যদের দেখি, বুঝতে চেষ্টা করি আর প্রচুর বই পড়ি। আমার এই পাঠভ্যাসটা আমাকে শানিত করে তোলে, আমি ভিতরে ভিতরে একজন ভিন্ন মানুষ হয়ে উঠতে থাকি। সেই সাথে আগের চেয়ে ভালো রেজাল্টও করতে শুরু করি। তাই আমার সম্পর্কে ক্রমাগত অন্যদের ধারনা হয়ে উঠতে থাকে, পড়ুয়া ছাত্রী, আগ্রহের শেষ নেই, একটু পাগলাটে এবং অপরিপক্ব। বন্ধুদের আড্ডায় যেহেতু আমার সময় কাটেনা, তাই আমি মেতে উঠি আবৃত্তি, বিতর্ক অথবা কুইজ প্রতিযোগিতায়। জ্ঞান বিজ্ঞানের বদ্ধ জানালাটা খুলে যায় আমার চোখের সামনে। এই ভিন্ন-ধারার একাকী কৈশোরটাই আমাকে টেনে নিয়ে যায় বুদ্ধির চর্চার জগতে। সাথে ছিল আমার বাবা, যে কিনা তার জানা যেকোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করতো তার কিশোরী মেয়েটির সাথে। আমি কখনই বলবো না, আমার বাবা মহাজ্ঞানী, অনেক কিছু জানেন। তবে আমার বাবা যেটুকু জানতেন, সেটুকুই উদার হস্তে শিখিয়েছেন আমাকে। তার সবচেয়ে বড় অবদান, আমাকে চিন্তা করে শেখানো। তিনি এমন করে আমার সাথে আলোচনা করতেন, যে আমার চিন্তা না করে উপায় ছিল না। এভাবেই পার করেছি আমি আমার কিশোর-বেলা।

এইবার কিঞ্চিত প্রসঙ্গে ফিরি, বুঝতে চেষ্টা করছিলাম, কিভাবে আমার মাঝে জন্ম হল তোমার। আমি যে আমার কিশোর-বেলায় অনেক বই পড়তাম, সে কেবল পাতার পর পাতা উলটে নয়, প্রত্যেকটা অক্ষরের সাথে মিশে গিয়ে। আমি যখনই যা কিছু পড়তাম, সেইসব কিছুর সাথে আমার একটা আত্মিক যোগাযোগ গড়ে উঠত। আমি গ্রহণ করতাম, যা কিছু গ্রহণযোগ্য। আমি মনে মনে ভাবতাম, আমি আসলে কেমন মানুষকে খুঁজি? আমি আমার বন্ধু হিসেবে চাইবো এমন মানুষকে, যার সাথে আমি কথা কইতে পারবো, আলোচনা করতে পারবো। যে আমার মত, আমার মত স্বপ্ন দেখে, চিন্তা করে, অবশ্যই সৎ এবং সাহসী, হৃদয়ে যা কিছু আছে, তা সাহসের সাথে প্রকাশ করতে পারো, ভিতরে এবং বাহিরে আদ্যোপান্ত একই মানুষ। এমনি করেই আমি আমার মনের মধ্যে গড়ে ফেলেছিলাম আমারই এক প্রতিবিম্ব। কিন্তু আমি এটা বুঝতাম না, এমনকি কখনও ভাবতামও না, এ আমার কল্পনা, বাস্তব পৃথিবীতে তার কোন অস্তিত্ব নেই।  এই অনুধাবনটা আসতে আমার কত বছর বয়সে পৌছুতে হয়েছে? ছাব্বিশ/সাতাশ বছর। তুমি সেই প্রতিবিম্ব অরুণাভ, যাকে আমি ভেবেছিলাম, বাস্তব। যাকে আমি আরোপ করতে চেয়েছিলাম রক্ত মাংসের মানুষের দেহে। আমি মানুষ সৃষ্টি করতে পারিনা অরুণাভ, পারলে হয়তো, একটি মানব দেহ তৈরি করে তাতে তোমায় আরোপ করে নিতাম। তাই তুমি রয়ে গেছ আমারই চিন্তায়, আমারই কল্পনায়। এইতো কিছুক্ষণ আগে তোমার নাম দিয়েছি অরুণাভ। গতকাল থেকেই তোমার একটা নাম খুঁজছিলাম আমি, মনের মত নাম পাচ্ছিলাম না। আজ পেয়েছি, তবে নিশ্চিত করে বলতে পারিনা, আই তোমাকে আর কোন নামে ডাকবো না। গতকালই তোমাকে ডেকেছিলাম শর্মিলী বলে। নামটা আমার তেমন বেশী পছন্দ হয়নি। আজ যখন মাথায় অরুণাভ নামটা এলো, তখনই ঠিক করে ফেললাম, আমার কল্পলোকের প্রতিবিম্বটির নাম হবে অরুণাভ!

-নীলকণ্ঠ
২৫শে জুলাই, ২০১২।