Monday, August 27, 2012

নীলকণ্ঠের চিঠি (২৭শে আগস্ট, ২০১২)

প্রিয় অরুণাভ, 

পার্থর কাছ থেকে আমি জীবনের নতুন একটা দৃষ্টিভংগীর কথা জানলাম। লাইফ ইজ বিউটিফুল মুভি থেকে অণুপ্রাণিত দৃষ্টিভংগী। চলচিত্রটি তো দেখেছি আগেই, কিন্তু কখনও ভেবে দেখিনি অমন একটা জীবনযাপন করা সম্ভব কিনা। মুভিটাকে কেবল মুভি বলেই মনে হয়েছিল, মনে হয়েছিল কেবল চলচিত্রেই অমন রূপকথার মত জীবনযাপন সম্ভব, যেখানে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের জীবনও রূপকথার অংশ হয়ে যায়, এমনকি মৃত্যুও। পার্থ জানালো সুব্রতর কথা, যে কখনো ঋণাত্মক দৃষ্টিভংগীর প্রকাশ করে না। কষ্ট যন্ত্রণা ঝামেলাকেও সুন্দর করে মেনে নিতে জানে। জানিনা, সুব্রত কতদিন পারবে এমন সুন্দর জীবনের প্রবাহ ধরে রাখতে, কিন্তু সুব্রত যে জীবন চর্চা দেখিয়েছে, তা থেকে কিছু শেখার আছে আমার। 

আজ একটা  ঘটনার অথবা ভিডিও চিত্রের সম্মুখীন হলাম, যার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। আমি সুব্রতর মত মহান হতে চাইলেও এখন হয়ে উঠতে পারিনি, তাই হৃদয়ের ভিতরে একটা শ্রদ্ধার আসনের খানিক পতন হল, পতনের শব্দটা কেবল আমি শুনেছি সত্য, তারচেয়েও বড় সত্য আমি শুনতে চাইনি কখনো। চাইনি অনুপ্রেরণার জন্মস্থল স্তব্ধ হয়ে যাক। এখন এই স্তব্ধতা আমাকে মুখরতায় পরিণত করতে হবে। ইস, সুব্রতর মত যদি হাসতে হাসতে ভুলে যেতে পারতাম! আমি জানি, পারবো একদিন।

বাংলাদেশ নামের ছোট্ট ভূখন্ডের মাঝে হয়ত জীবন অথবা কর্মকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা প্রহসন ছাড়া কিছুই হবে না, অন্ধ জাতীয়তাবাদী চিন্তা একধরনের জাতিভেদও বটে। এবার বৈশ্বিক চিন্তায় নিজেকে আলোকিত করবার সময় এসেছে। সে পথে যদি কিছু করতে পারি আমি, সে পথে যদি আসে সংকীর্ণতা থেকে মানবতার মুক্তি!

-নীলকণ্ঠ
২৭শে আগস্ট, ২০১২।

Friday, August 10, 2012

নীলকণ্ঠের চিঠি (১০ই আগস্ট, ২০১২)

প্রিয় অরুণাভ,

পৃথিবীতে একটা শব্দ আছে, যে শব্দটি কখনো কোন অবস্থাতেই "না বলা" রয়ে যেতে নেই। শব্দটি "ভালবাসি", এই উচ্চারণটায় কি এক অদ্ভুত শক্তি আছে! জীবনের সমস্ত প্রতিকূলতায় অথবা সুন্দর সময়ে এই শব্দটিই যেন ভালোবাসার মানুষগুলোকে পাশে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। এই কথাটি আমি এতোকাল কেবল বিশ্বাস করতাম, এখন অনুভব করি। ভালবাসার সুরভী আমি হৃদয় দিয়ে স্পর্শ করতে পারি।

-নীলকণ্ঠ
১০ ই আগস্ট, ২০১২।

Wednesday, August 8, 2012

নীলকণ্ঠের চিঠি (৮ই আগস্ট, ২০১২)

প্রিয় অরুণাভ,

আজকাল আমি লেখালেখির সাথে একধরনের দূরত্ব অনুভব করছি। গত দুইবছরের বেশী সময় ধরে আমার লেখালেখি মূলত ঘুরেফিরে বিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ থেকেছে, বলতে গেলে কিছুই লিখিনি নিজের সম্পর্কে, কোন ফিকশনের আশ্রয়েও প্রকাশ করিনি নিজেকে। ওটা ছিল নিজের উপর নিজেরই আরোপিত একধরণের অবরোধ। আমি খুবই আবেগী একটা মানুষ। গত কয়েকবছর ধরে আমার আবেগের বহিঃপ্রকাশে একধরণের পরিবর্তন এসেছে। একজন স্বচ্ছ মানুষের হৃদয়ে যখন আনন্দ খেলা করে, তার হাসিতে তার চোখের তারায় তারায় সেই আনন্দ ঝলমলিয়ে ওঠে। আবার যখন বুকের অলিন্দে কষ্টের ঢেউ আছড়ে পড়ে, সেই ঢেউয়ের গর্জন শোনা যায় বাইরে থেকে। মানুষটার চেহারার ভাঁজে, হাসিতে, চাহনিতে এক তীরভাঙ্গার গান শোনা যায়। আমার চেহারাতে এইসব অনুভূতি প্রকাশ পায়ই, প্রকাশ পায় আমার লেখাতেও। একজন ব্যক্তি আমি - তার কষ্ট আছে, আনন্দ আছে, তৃপ্তি আছে... সবই আছে। কিন্তু আমাদের সমাজে একধরনের চর্চিত আচারও আছে, যা শেখায়, অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ না করায় ভালো। জানতে চাও কেন? মানব সমাজে যুগে যুগে সবসময় কিছু অসুস্থ মানসিকতার মানুষ থাকে, যাদের নিজেদের মাঝে মানবিক চিন্তাবোধের অভাব আছে। সেই লেজকাটা শেয়ালের দল বাকি সবাইকে লেজ না থাকার ফজিলত বর্ণনা করতে চায়। তাদের নিজেদের হৃদয়টা শীসায় মোড়ানো বলে বাকিদেরও অনুভব করাতে চায় জৈবিক হৃদয় জিনিসটা ভালো নয়, পৃথিবীর সমস্ত জৈবিক হৃদয়ের মানুষকে এরা নির্দ্বিধায় বিদ্রুপ করে, আবেগের বহিঃপ্রকাশ দেখলে তাচ্ছিল্যে হেসে কুটি কুটি হয়। এরা না জানে আবেগকে অনুভব করতে, না জানে মানবীয় আবেগকে সম্মান জানাতে। সাম্প্রতিক পৃথিবীরে এদের সংখ্যা এতটাই বেড়ে গেছে, মানুষগুলো আজকাল এদের মাঝে দলিত মথিত হয়ে কোনমতে টিকে থাকে। এইদলটির সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল মাহজেরীনরের সাথে পরিচয়ের মাধ্যমে। ক্রমেই জেরীনের কিছু শিষ্যেরও দেখা মিলল। জেরীনের এই হৃদয়হীনতার প্রকাশটা এতোটাই শিল্পিত ছিলো, যে কিছু মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডহীন ব্যক্তি সেটাকেই আদর্শ ভাবতে শুরু করল। হৃদয়হীনতার অশিল্পিত রূপটাও আমি দেখেছি, মৌ নামের আমাদের এক সহপাঠিনীর মাঝে। গত কয়েকটা বছর কষ্ট যন্ত্রণা ভালোবাসাময় এমন একটা তীব্র সময় পার করেছি, যে শেষের দু বছরে আমি সযতনে হৃদয়ের কথা আড়াল করে গেছি, আর কোন কারণে নয়, কিছু হৃদয়হীন মানুষের কাছে আমার হৃদয়ের অনুভূতিগুলো আঘাতপ্রাপ্ত হবার সুযোগ সৃষ্টি হোক সেটা চাইনি বলেই। এখন ক্রমাগত হৃদয়ের ঝাঁঝ অনেকতা সহনীয় হয়ে এসেছে, তবুও মাঝে মাঝে অকল্পনীয় তুফানের মত তা প্রকাশিত হয়ে যায়। হৃদয়ের মাঝে পাথর চাঁপা সেইসব অনুভূতিকে এইবার তাই মুক্তি দিয়েছি, "বিচ্ছিন্ন দ্বীপ" নামের ছোট্ট লেখাটির মাধ্যমে। নিজেকে এখন আমার আগের চেয়ে অনেক নির্ভার লাগছে। আর এখন তোমার কাছে নিবেদন করছি, আমার দিনরাত্রের সকল কাব্যগাঁথা। একধরনের তৃপ্তি অনুভব করছি।

আমার বিগত দুইবছরের লেখালেখিতে আমি নিজেকে উপেক্ষা করে কেবল বিজ্ঞান চর্চা নিয়ে মেতে থেকেছি, কষ্ট ভুলে থাকার একধরনের ইন্দ্রজালের মত। সেখানে যে আমাকে সবাই দেখেছে, সে এক লৌহমানবী, জ্ঞানে বুদ্ধিতে সাধণায় আগ্রহে ঝকঝকে তারার মত। কিন্তু আজকের আমি নিতান্ত সাধারণ একজন মানবী, আমার আনন্দ দুঃখ বেদনা ভালোবাসা সবকিছু নিয়েই আমি, সম্পূর্ণা এবং আমার মানবীরূপ আজ প্রকাশিত। আজ আর কেবল বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখির আড়ালে আড়াল করতে চাই না আমি নিজেকে। গবেষণা তো আমার সারাজীবনের কর্ম। সে আমি করবই, তবে হৃদয়কে আড়াল করে আর নয়।

সম্প্রতি আমার কাজের মাঝে এমন একটা মোড় এসেছে, এখন খানিকটা আমার দিনরাত পড়ার সময়, জানার সময়। একদিকে নিউরোসায়েন্সের খুব মৌলিক বিছু বিষয়কে যেমন গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে, তেমনি তা প্রকাশের জন্য গণিতের অস্ত্রে শানও দিতে হবে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আর যাই হোক, আমার গণিতের অস্ত্রটাকে ধারালো করার বুদ্ধি বাতলে দেয়নি। আজকের প্রজন্মের কিশোরেরা গণিত অলিম্পিয়াডের মাঝে গনিতকে শিখ বুঝতে ভালোবাসতে শিখে যায়। আমার সেই না করে ওঠা কাজটা এইবার আমাকে করতে হবে। আমি আজকের কিশোরদের মত গণিতযজ্ঞে পারদর্শী না হলেও আমাকে হয়ে উঠতে হবে, আমার স্বপ্নের কাছাকাছি পৌছবার জন্য। তাই অল্প জেনে লেখালেখি করার মত সময় এখন আর নেই আমার। আমার লক্ষ্য জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক হওয়া না, জাত বিজ্ঞান গবেষক হওয়া। জনপ্রিয়তা আমাকে টানে না, যা টানে আমাকে, সেই জানার নেশার চক্করে নিজেকে এবার মনপ্রাণ দিয়ে সঁপে দেব।

-নীলকণ্ঠ
৮ই আগস্ট, ২০১২

Friday, August 3, 2012

নীলকণ্ঠের চিঠি (৩রা আগস্ট, ২০১২)

প্রিয় অরুণাভ,

গতকাল রাত থেকে আমি সময় খুঁজছিলাম, কখন যে তোমার সাথে কথা বলার সময় পাবো তাই ভাবছিলাম বারেবারে, অবশেষে সময়টা পেলাম আমি। আসলে তো আমি সবসময়েই মনে মনে কথা বলতে থাকি। নিজের মধ্যে যখন কথোপকথন চালাতে থাকি, তখন আজকাল তোমার নামটা মনে করতে হয় না, অরুণাভ নামটা আপনাতেই চলে আসে। আমি বলতে থাকি, তুমি যেন শুনতে থাকো। আমার সাথে ঘুরতে থাকা আমার ছায়াটাই যে আমার এতো চমৎকার, এতোটা নির্ভরযোগ্য বন্ধু হয়ে যাবে, ভেবেছিলাম বুঝি!  আমি সেই ছোট্টবেলা থেকেই একটু অদ্ভুত রকমের, শহুরে ছেলেমেয়েদের মত বড় হয়েছি ইট-পাথরের বন্দী পটভূমিতে। আগের চিঠিতেই তোমাকে জানিয়েছিলাম, আমার চারপাশের সমাজ থেকে, জগৎ থেকে কিভাবে আমার মনোজগতটা একটু একটু করে আলাদা হয়ে গেছে। সেখানেই শেষ নয়, আমার মনের ভেতরে গড়ে উঠেছে একটা অন্যরকম সুন্দর জগৎ, যেখানে জ্ঞানের পিপাসা আছে, মানুষের মনকে অনুধাবন করার শক্তি আছে, জগতে যতই কালো থাকুক অন্ধকার থাকুক, আমার মনজগতে সুন্দরের ছড়াছড়ি! আমার সত্যকে সত্য বলা সাহস আছে, মিথ্যেকে মিথ্যে বলার সাহসও আছে। আমাদের বাংলাদেশের রক্ষনশীল তথাকথিত সভ্য - আসলে অসভ্য- যে সমাজে মানবিকতার বিকাশের চেয়ে ধর্মের নামে মানবিকতার গলা টিপে হত্যা করা হয়, রক্ষণশীলতার নামে মেয়েদের ঘরের মাঝে বন্দী করে রাখা হয়, পোষাকের নামে বোরকা নামের বস্তায় মেয়েদের বেঁধে ফেলা হয়, চাপা থাকা কামের নগ্ন অগ্নুৎপাতে প্রতিদিন পত্রিকায় ধর্ষনের খবর বেরোয়, লাশে লাশের রক্তের হোলি খেলা হয়, শিক্ষা মননকে আলোকিত করার বদলে সার্টিফিকেট আকারে বিক্রয় হয়, শিশু/কিশোরেরা/তরুণদের মন-ইচ্ছা-জীবন যাপনের স্বাধীনতা গুরুজনকে সম্মানের নামে বাবা মা নামের নিষ্ঠুর জল্লাদের হাতে খুন হয়, যে সমাজে যেকোন ধরণের বিকাশকে অবরুদ্ধ করা হয় সেই সমাজের চেয়ে অসভ্য জান্তব সমাজ পৃথিবীতে আর কিছুই হতে পারে না। মানুষ ভিন্ন অন্য প্রাণীদের সমাজ মানব সমাজের চেয়ে সভ্য। কিছু মানুষ বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে প্রযুক্তি গড়েছে,  মানব সমাজ উন্নতি করেছে, কিন্তু মানবতা অর্জন করতে পারেনি, সভ্যতা অর্জন করতে পারেনি। এই সমস্ত অসুন্দর গুলো বাইরের পৃথিবীতে থাকলেও আমার পৃথিবীতে নেই অরুণাভ। আমার পৃথিবীতে আছে মমতা, মানুষের জন্য ভালবাসা। এ এক অনন্য সুন্দর পৃথিবী অরুণাভ। আমি গড়ে নিয়েছি একে। তুমি ভেবে দেখো, এই যে আমি তোমার সাথে এমনি করে কথা বলছি, এইভাবে কথা বলার কথা এই পৃথিবীর ৯৯.৯৯৯৯৯৯% মানুষ বা তারচেয়েও বেশী মানুষ ভাবতেই পারে না। আমাকে ওরা পাগল বলবে, আমি জানি। কিন্তু কি আসে যায় বল, আমি নিজেকে কলুষিত করে ওদের একজন হতে চাইনা। হতে পারে এটা আমার একটা ফ্যান্টাসীর জগত, হ্যাঁ কেউ বোঝে না এই জগতটা, আমি কাউকে বোঝার জন্য বলবও না, এই জগত নিয়ে যদি একজন মানুষ, এই আমি পৃথিবীতে মানুষের মত বেঁচে থাকি- সে তো অনেক!  

তোমাকে আজ একটা মজার কথা বলি। আমি যখন সদ্য এস.এস.সি পরীক্ষা শেষ করেছি, তখন আমার মায়ের মাঝে একটা অদ্ভুত রকমের পরিবর্তন এলো। তার দুইবছর আগে, আমি যখন নবম শ্রেণীতে পড়ি, তখন উচ্চতর গণিত পড়ার ব্যাপারে আমার মা একরকম ঘোর আপত্তি তুলেছিল। কারণটা ছিল এমন, আমার ছোট কাকু মাসুম সপ্তম শ্রেণীতে থাকা অবস্থায় আমাদের বাসায় থেকে পড়ালেখা করেছে। ছোট কাকু গণিতের কথা শুনলেই ভয় পেত। ম্রেটিক পরীক্ষা পর্যন্ত বাধ্যতামূলক ভাবে যেটুকু গণিত করতে হয়েছে তারচেয়ে বেশী কোনদিন করেনি। আমার আম্মুর ভাষায়, সে গণিত করত অনেকটা মুখস্থ করে। গণিত জিনিসটাকে সে এতোটাই ভয় পেতো যে বুঝতে না পারলে বোঝার চেষ্টা না করে সোজা মুখস্থ করে কাজ খতম। পরীক্ষায় কেবল মাথা থেকে নামিয়ে বসিয়ে দিতো। সে যেহেতু অন্য সব ভাইয়ের চেয়ে ভালোভাবে পড়ালেখা করার সুযোগটা পেয়েছে, তার জীবনে আকাংখাটাও ছিল তেমনই। ডাক্তার হতে চেয়েছিল সে। হয়েছে। ডাক্তার হতে তো আর গণিত লাগে না। খাটাখাটুনির জোরে ভালোভাবেই মেডিক্যাল কলেজে চান্স পেয়ে গিয়েছিল। তো আমার মা তো গ্রামের মেয়ে, গায়ের স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করার পর আর তার পক্ষে পড়ালেখা করা সম্ভব হয়নি। ততদিনে আমি কোলে এসে গিয়েছি। আমার কাকুর মত সেও গণিত কি জিনিস চেখে দেখেনি এবং ভয়টা বোধ করি মাসুম কাকুর চেয়ে বেশীই পেত। গণিত না পড়েই যখন কাকু ডাক্তার হয়ে গেল, তখন আমার মায়ের মনেও স্বপ্ন, আমিও ডাক্তার হব। তাই আমাকে কাকুর মত নিতে হবে জীববিজ্ঞান। মন দিয়ে জীববিজ্ঞান পড়তে হবে। আমার মা পড়ালেখা বলতে মুখস্থ করাকেই বুঝে, বোঝেনা আত্মস্থ করা বা গাণিতিক সমীকরণ সমাধান করা। তাই আমি যখন উচ্চতর গণিত নিতে চাইলাম, তখন আমার মা বসল বেঁকে, না কিছুতেই নিতে দেবে না। ডাক্তার হতে গণিত লাগে না, গণিত নিলে আমার রেজাল্ট যদি খারাপ হয়, যদি আমি জীববিজ্ঞান কম পড়ে গণিত বেশী পড়ি! এইসব ভয়ে রীতিমত আমাকে গণিত না নেয়ার জন্য মানসিক চাপ শুরু করল। আমি তো নেবই, বললেই হল নাকি! শেষে মধ্যস্থতা হল, বায়োলজি আবশ্যিক বিষয়, আর গণিত ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে নিতে দেবে। কিন্তু আমি যে কি ঘাড় ত্যাড়া। আমি গণিতই নেব আবশ্যিক বিষয় হিসেবে, তখনকার জীববিজ্ঞান বই দেখলে আমার গায়ে জ্বর আসতো। একটুও বোঝার কিছু নেই, খালি পাতার পর পাতা মুখস্থ কর, আমি এতো চাপ নিতে পারবো না বাবা। আমি ঠিক করে ফেলেছি ফাইনালি রেজিস্টার করার আগে গণিত আবশ্যিক করে দেব। মা উপায়ন্তর না দেখে আমার কাকাদের শরণাপন্ন হল, তারাও সবাই আমার মায়ের সাথে সুর মেলায়, আমার বাবা ছাড়া। আমার বাবা তো খুব খুশি আমার সিদ্ধান্তে। বাকি ছিল কেবল মাসরুর কাকা, যে আমাদের পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে শিক্ষিত বলে সবাই মনে করত। তো কাক যেদিন আমাদের বাসায় এলো, মা তাকে গিয়ে অভিযোগ জানালেন। ফল হল হিতে বিপরীত, কাকু নিজে ত ইঞ্জিনিয়ার সে বলে নিতে চাচ্ছে নিক না, জীববিজ্ঞান ঐচ্ছিক নিলেও মেডিকেলে ভর্তি হতে কোন সমস্যা হবে না। আমার মায়ের চোখমুখ গেল কাল হয়ে, আর আমার খুশি দেখে কে! কোনভাবেই আমাকে থামাতে না পেরে শেষে বলল, আচ্ছা ঠিক আছে, তোমার যেটা ইচ্ছা হয় সেটাই কর, তবে আমাকে একটা কথা দিতে হবে, জীববিজ্ঞানে ভালো করতে হবে, ঐচ্ছিক নিচ্ছ বলে ঐটা কম পড়া যাবে না। আমি অতশত না ভেবে বলে দিলাম আচ্ছা। সেও আর কিছু বলতে পারল না। আমি মোটামুটি ভালোই রেজাল্ট করতাম সব বিষয়ে যদিও জীববিজ্ঞানে তখন একটুও আগ্রহ পেতাম না, তবুও খারাপ করিনি কখনও। সেইদিনের কথা মনে হলে এখনও আমার বুক আনন্দে ভরে যায়, সেইদিন, সেইদিনই আমি বুঝেছিলাম, আমার ইচ্ছাশক্তি কতখানি। যমের মত যে মা আমার মনের উপর ইচ্ছেমত হুকুম চালাত, সেই মা আমার ইচ্ছাশক্তির কাছে হেরে গিয়েছিল। তখন তো বটেই, এরও অনেকদিন পর্যন্ত, বলতে গেলে আমি কোরিয়াতে চলে আসার আগ পর্যন্ত, আমার মা আমার জীবনের কোন সিদ্ধান্ত আমাকে স্বাধীন ভাবে নিতে দেয়নি। সে নিজে বেশী দূর পড়ালেখা করেনি অথচ আমার পড়ালেখার উপর জোর করে তার  সব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চেয়েছে। তবে আমিও কোনদিন হার মানিনি। অবাক হবার মত ব্যাপার হল, এস.এস.সি. তে যিনি এতোটা বাধা দিয়েছিলেন গণিত নেয়ার ব্যাপারে, সেই কিনা এইচ.এস.সি সময় আমি যাতে গণিতে পিছিয়ে না পড়ি, সেজন্য অন্য সব বিষয় বাদ দিয়ে আমার গণিতের শিক্ষক ঠিক করে ফেললেন, এমনকি আমার একাদশ শ্রেণীর ক্লাস শুরু হবার দুইমাস আগে!

মা কেন, যেই হোক না, কাউকে আমার জীবনের রাশ টেনে ধরার সুযোগটা দেয়নি। পাগলা ঘোড়ার সেইসব মানুষগুলোকে, যারা আমায় বাধা দিয়েছিল, আমার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, তাদের সব্বাইকে পিছনে ফেলে আমি আমার পথ বেছে নিয়েছি। নিজের জন্য আমার এখন আনন্দ হয় অরুণাভ, যেই বন্দী পরিবেশে আমি বড় হয়েছি সেই বন্দিত্বের শিকল আমি গুড়িয়ে দিতে পেরেছি বলে। খুব বড় বড় কিছু করিনি, আমার অর্জনগুলো খুব খুব সামান্য, কিন্তু আমি বিন্দু বিন্দু করেই সিন্ধু ছিনিয়ে নিয়েছি, আমার জীবন সিন্ধুর একটি বিন্ধুও কেউ আমার কাছ থেকে আর কেড়ে নিতে পারবে না, আমি আর কখনই কেড়ে নিতে দেব না অরুণাভ। আমার এই জয়ের সাথী যে তুমিও, তাই শুভেচ্ছা তোমাকেও। আমার মন খুশি খুশি হয়ে গেছে অরুণাভ। :)

ভালোকথা, তুমি কি জানো, কেন আমি তোমাকে এই গল্পটা বললাম? ঐযে আমার গণিতের শিক্ষক, তার রেজিস্টার খাতার একদিন একটা নাম দেখেছিলাম, নামটি ছিল শিশির। এতো ভালো লেগেছিল নামটা তখন, সেইসময় আমি যখন একা একা কথা বলতাম, তখন আমি তোমার নাম দিয়ে ফেলেছিলাম শিশির। যদিও আমি তখন বুঝতাম না, আমি কেন বারবার আনমনে কথা বলতে গেলে শিশির নামটা বলি! এখন বুঝি, আজকের অরুণাভ, গত-সপ্তাহে যাকে শর্মিলি বলে ডেকেছিলাম, সেই ছিল শিশির। কি, জানলে তো তোমার আদ্যিকালের নামটা? :)


-নীলকণ্ঠ
০৩/০৮/২০১২