Wednesday, May 1, 2013

নীলকন্ঠের চিঠি - হারিয়ে যাবার গল্প, ১লা মে, ২০১৩!

প্রিয়  অরুণাভ,

এই পৃথিবীটাকে মাঝে মাঝে মনে হয় বড্ড অচেনা। যদিও জন্মাবধি দেখেছি কেবলই এই পৃথিবীটাকেই। আমি যখন ফুলের দিকে তাকাই, পাখির দিকে তাকাই রঙের দিকে তাকাই, আমার কাছে বড্ড বেশী চমৎকার লাগে। মনে হয়, এইতো আমার পৃথিবী। কিন্তু আমি যখন মানুষের মনের দিকে তাকাই, তখন আর কিছুই চিনতে পারিনা। চিনতে পারি না আমি নিজেকেও। আমার নিজেকে ক্লান্ত অবিশ্রান্ত পথে পথে ঘোরা উদ্ভ্রান্ত এক পথিকের মত লাগে। আমি তোমাদের ঠিক চিনি না।

আমি একলাই এই ধরণীর বুকে স্থির জলপদ্মের মত চেয়ে থাকি, বাকিরা সবাই গতি-মান। কেন যে তারা এমনি করে ছুটে চলেছে বুঝতে পারিনা। তাও যদি সকলে সরল পথে চলত, বুঝতুম।

আজ রাতে ঘুমের মাঝে ছটফট করেছি স্বপ্ন দেখে। দেখেছি লুবনা, জিতা আর শোয়েবকে। বাদ পড়ে গেছে আসিফটা। দেখলাম, যেই আমি বিতার্কিক ছিলাম, আবৃত্তি করতাম, সেই আমি যেন শাড়ি পড়ে দাঁড়িয়ে আছি সবার মাঝে। আমার কোন এক শিক্ষিকাও আছে সেখানে। তিনি আমায় ডাকছেন। আমিও কিভাবে যেন দাঁড়িয়ে গেছি বিতর্কের মঞ্চে। যেই কথা বলতে শুরু করেছি, তখন কোত্থেকে শোয়েব বলে উঠল, ও আবার কি বিতর্ক করবে, সব ভুলে গেছে। এখন ওর চেয়ে আমি ভালো বক্তৃতা দিতে পারবো। অডিটোরিয়াম ভর্তি মানুষের মাঝে শোয়েবের এমন করে আমাকে বলায় রাগ হল খুব। একটুখানি সান্ত্বনা পেলাম যখন আমার পিছনের শিক্ষক মহোদয় বললেন, এসব কথা কানে দেবার কিছু নেই, যে বলছে, সে আসলে নিজেই কিছু জানে না। কোত্থেকে মায়াময়ী লুবনা এসে আমাকে নিয়ে গেল আবারও মঞ্চে, বলল আমাদের বিতর্ক দলটি হবে ঠিক আগেকার মত, আমি তুই আর জিতা। এমনটাই কথা ছিল, কিন্তু জিতা কবিতা লিখছে, তাই জিতার জায়গা শোয়েবকে নেব। আমি আঁতকে উঠলাম, শোয়েবের মন তো পড়ে থাকে খালি মেয়েদের দিকে, ও তো বক্তৃতা দিতে গিয়ে অডিটোরিয়ামের মেয়েদের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকবে। ওর পর আমি গেলে তো খবর আছে, যে দলের ইতিমধ্যে বারোটা বেজে গেছে, বলার আর কোনকিছু অবশিষ্ট তো থাকবে না। এটা মনে হতে হতেই দেখি আমি মঞ্চে দাঁড়িয়ে গেছি, কথা বলছি কিন্তু আমার পারফর্মেন্সে আসলেই ঐ আগের মত তেজটা নেই। মনে মনে খুব কষ্ট পেলাম। দীর্ঘদিন অব্যবহারে আমার মেধায় মরচে ধরে গেছে। মন খারাপ করে বারান্দার রেলিং-এ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি দেখি জিতা এসেছে তার কবিতার খাতা নিয়ে। জিতার একটা কবিতার বই বেরুবে এবার। সেই জিতা, যে আমাকে কত্ত বলেছে, আমাকে নিয়ে একটা কবিতা লিখে দে। সেই জিতা, আজ আমায় বলছে, তুই তো ছেড়ে দিয়েছিস কবিতা লেখা, তাই আমিই লিখলাম কবিতা। আমি আবার খানিকটা কষ্ট পেলাম। কেন ছেড়েছি সবকিছু, যার সাথে আমার জড়িয়ে ছিল প্রাণ। অস্থিরতায় ভেঙ্গে গেল ঘুম আমার। জেগে উঠে অনুভব করলাম, আমি আসলেই ছেড়ে এসেছি আমার অনেক কিছু, কেন ছেড়েছি? আমার মনের মধ্যে কলেজ ইউনিফর্ম পড়া সেই লুবনা এখন আগের মতই মায়াবী, বদলে গেছে শোয়েব জিতা দুজনেই, কিন্তু ওরা দুজনেই আমাকে যা বলছে তা শতভাগ সত্যি। সত্যিই আমি ছেড়ে দিয়েছি অনেক অনেক কিছু... নিজেকে বুঝি এভাবেই ধ্বংস করেছি আমি।

কতকাল দেখিনা লুবনাকে, আগের সেই ছিপছিপে সুন্দরী ব্যক্তিত্বময়ী লুবনা, এখন হয়ত অনেকটাই অন্যরকম, কিন্তু কেমন আমি জানিনা। শুধু জানি, লুবনা এখন এক সন্তানের জননী। ওর একটি ছবিতে আমি দেখেছি বিষাদের ছায়া। আমার মনের অভ্যন্তরে সে একাধারে মনোমুগ্ধকারিনী এবং রহস্যময়ী। আমার চেনা লুবনা যে অর্ধেকটাই আমার কল্পনা, সে আমি বুঝি, কারণ বাস্তবে লুবাবের অনেক অনেক কিছুই আমি বুঝিনা, সেইসাথে বুঝতে চাইও না। ফেসবুকে জিতার সাথে যোগাযোগ আছে। জিতা ঠিক সেই আগের মতই রয়ে গেছে। সুখেও আছে। ২০১১ সালের নয়ই মার্চ সকালে আমি একটা লাল টুকটুকে ফতুয়া আর ওড়নাটা পড়ে বাসের জানালায় বসে ছিলাম, তখন জিতা এসে আমার পাশে বসেছিল। অনেকদিন পরে ওর সাথে কথা বলে আমার খুব খুব ভালো লেগেছিল। আজ মনে হচ্ছে আমি লুবনা জিতা শোয়েবের মাঝে কেবলমাত্র জিতাকেই চিনি। অরুণাভ , নিজেকেও কি আমি চিনি! আর কতদূরে গেলে আমি অনুধাবন করতে পারবো, আমাকে জন্ম দেবার অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত হয়েছে আমার প্রিয় বাবার!

কেমন আছ অরুণাভ?

                                                                                                         -নীলকণ্ঠ