Thursday, September 23, 2010

নির্জনার চিঠি

মাউথ অরগানটার সুর আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায়। আশেপাশে কোন বাড়িতে অজানা কেউ বুঝি বাজাচ্ছিল, হয়ত সে অজানা নয়, কিন্তু কে সে জানে না নির্জনা। জানার কোন ইচ্ছাও কাজ করেনা, সুরস্রষ্টা নয়, সুরটা তাকে ছুঁয়ে গেল। মনে হচ্ছিল সুরটা বুঝি তারই জন্য, কখনও ঝর্ণার মত উচ্ছল, উচ্ছলতার শেষে এক নির্জনা সে, রাতির মত শান্ত, নিকষ অন্ধকার সেখানে... সেই গভীর অন্ধকারের মাঝে আনন্দ আছে না কষ্ট আছে, উচ্ছল ঝর্ণার চোখে এখন জোৎস্না নাকি আরেকটি ঝর্ণা, কেউ দেখতে পায় না তা। মাস ছয়েক আগেও নির্জনার যখন ঘুম আসতো না, তখন চারপাশে নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে একটা বাঁশির সুর বেজে উঠতো... সেই বাঁশিওলা বুঝি চলে গেছে অন্য কোথাও, অনেকদিন শোনেনা সেই বাঁশির সুর। যখন হলে থাকতো সে, জানালার পিছনে ছিল অনেকগুলো আম-কাঁঠালের গাছ, তাতে রাজ্যের পাখিরা ভর করে ছিল, মাঝরাতে মাঝে মাঝে সব পাখি একসাথে ডেকে উঠতো, ঘুম ভেঙ্গে যেতো নির্জনার। কিছুক্ষন চুপ করে বসে থাকতো, তারপর বারান্দায় গিয়ে রেলিং এর উপর পা দুটো তুলে আকাশের দিকে চেয়ে থাকতো। কখনও সেখানে বিস্তৃত ছেড়া ছেড়া মেঘ, প্যাঁজা তুলোর মত ভেসে বেড়াচ্ছে, কখনো বা আকাশ ভরা তারা।

গতকাল রাতে অরণ্যকে লেখা একটা পুরোনো চিঠি হঠাৎ খুলে ফেলেছিল সে... তারপর বসে বসে সেই চিঠি পড়তে লাগলো... নির্জনার মনে হতে লাগলো... এমন স্রোতের মত ভাষায় সে চিঠি লিখতো! কি সুন্দর কথাগুলো! কত স্বপ্ন... কত আত্মবিশ্বাস চিঠিতে! কত শক্তিশালী কথা, “খুব সম্ভবত আমি আমার স্বপ্নের ব্যাপারে আপনার চেয়েও বেশী উন্মাদ।” এইভাবে কি এখন আর নির্জনা বলতে পারে? নিজেকে প্রশ্ন করে সে... ভিতর থেকে উত্তর আসে না... মনের ভিতরে যে লু্কানো মনটা তার সাথে কথা বলত, সে হারিয়ে গেছে। বাইরের কেউ না... হারিয়ে গেছে ভিতরের কিছু একটা অথবা সেই মনটা এখন বধির হয়ে গেছে। কোন প্রশ্ন তাকে আর আলোড়িত করে না। কি ছিল স্বপ্নগুলো, চিঠি পড়ে বুঝার চেষ্টা করে নির্জনা। একটা দেশ, সেই দেশটার জন্য এতোদিনেও কিছু করতে না পারার যন্ত্রনা, একটা পতাকা কে উর্ধে তুলে ধরার স্বপ্ন,একজন অরণ্য, অরণ্যের স্বপ্নগুলো আপন করে নেয়া, সেই স্বপ্নগুলোর জন্য যেকোন কিছু করতে চাওয়ার মত মানসিক দৃঢ়তা!

আজ নির্জনার মনে হচ্ছে, ঐ চিঠিটা তার লেখা না, এক দুঃসাহসী মেয়ের লেখা! সেই মেয়েটাকে আজ এখন এই নির্জন দুপুরে আরেকবার দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে...

সেই অরণ্য, যার স্বপ্নের পাশে থাকার সবটুকু চেষ্টা করেও একদিন নির্জনার মনে হয়েছিল, সে পারেনি... সে পারেনা, নিজেকে সেদিন খুব ব্যর্থ একজন মানুষ মনে হয়েছিল তার। আজ অনেক দিন পর সে জেনেছে, সে স্বপ্নের চোখেও স্বপ্ন আঁকতে পেরেছিল। আজ তার চোখে জল, অরণ্যের জন্য নয়, মনের মাঝে লুকিয়ে থাকা মনটার জন্য, সাহসী মেয়েটার স্বাপ্নিক চোখের জন্য।

অরণ্য তার কানে ফিসফিসিয়ে বলেছে, নির্জন অরণ্যের নির্জনতা ভেঙ্গে প্রানের সুর লহরীর কথা। নির্জনা মনে মনে বলে, আমার চোখ দুটোকে ক্যানভাস ভেবে তাতে ইচ্ছেমত স্বপ্ন একে দাও। কিভাবে স্বপ্ন দেখতে হয়... এবার আমাকে তাই শেখাও। ছোট্টোবেলায় যেমনি করে ঘুড়ি উড়াতে আর ভাবতে, আমার ঘুড়িটা একদিন সবচেয়ে উঁচুতে উঠবে, নাহয় এবার সেই স্বপ্নটাই দেখতে শেখাও।

চপলা নির্জনা ভাবে, একদিন পৃথিবীটা অরণ্যময় হয়ে উঠবে। ঘন মেঘের আড়ালে একটুখানি আলোর আভা। সমস্ত পৃথিবীতে সে এবার অরণ্যের বীজ বুনে দেবে...

ফেব্রুয়ারী ৩, ২০১০।

Wednesday, September 22, 2010

কুয়াশা ও চন্দ্রকলা

এ কেমন রূপকথা শোন,
নেই কোন দত্যি দানো।
আছে কুয়াশা আর চন্দ্রকলা,
আছে ভুবন ভরা ভালোবাসা।


দেশের নাম চন্দ্রালোক। পরীর রাজ্য চন্দ্রালোক। রাজ্যে এখন ঘোর দুর্দিন। চন্দ্রালোকের বুড়ি রাজমাতার কথায় চলে রাজা আর রাজ্য। কি জাদুর জালে এমন হয়ে গেল রাজা, কেউ জানে না।

মাস তিনেক আগেও ছিল সব ঠিক ঠাক। রাজ্য জুড়ে আনন্দের ফোয়ারা। আর ক’মাস পরেই রানীর কোল জুড়ে আসবে ফুঁটফুঁটে এক শিশু। গোটা রাজ্যের নতুন উত্তরাধিকার। সে রাজপুত্র হবে নাকি রাজকন্যা, এখনো জানেনা তারা। রাজপরী শিশুর নাম কি হবে, তাই ভেবে পায় না। একরত্তি পরীবাবু, হবে সবার নয়নের ধন। পরী রাজা আর রানী তো রূপে রূপে রূপের সায়র। বাবু যে কত্তো সুন্দর হবে, কেউ ভাবতেই পারছে না। রাজার মনে বেজায় খুশি... রানীর চোখে রাজ্যের হাসি। এমন সুখের দেশ মহাবিশ্ব তন্ন তন্ন করে খোঁজা হলেও কেউ পাবেনা। সেই রাজ্যে... হঠাৎ কি হল, কেউ বুঝে পাচ্ছে না। রাজার চলা ফেরা কেমন যান্ত্রিক মানুষের মত। ঐ যে, মানুষদের পৃথিবীতে রোবট না কি যেন বলে, তেমন। রানীকে দিয়েছে নির্বাসন। শিশুর মুখ দেখতে চায় না রাজা। এই শিশু ভূমিষ্ঠ হলে রাজ্যের নাকি অমঙ্গল হবে। রাজমাতার অনুগত জ্যোতিষ পরীর ভবিষ্যতবানী এ। না ফলে যাবে কোথায়। আর যাই হোক, রাজ্যের তো অমঙ্গল ডেকে আনা যায় না। রানীর ডানা কেটে তাই মানুষের রাজ্যের এক গহীন জঙ্গলে দিয়েছে তাকে নির্বাসন। রাজমাতার যুক্তি, এই শিশু অভিশাপ। তাই এই রাজ্যে তার ঠাঁই হবে না। অমন রানী গেলে আর কি হবে। নতুন রানী আনা যাবে। নাইবা হল রানী সুলেখার মত এতো লক্ষী, নাই বা হল এতো সুন্দরী, রানী রানীই।

রানীর কি অসহায় অবস্থা! জীবনে কোনদিন রাজপ্রাসাদের বাইরে হাঁটেনি। সেই রানী কিনা আজ গহীন বনে একাকিনী। গর্ভে তার রাজ্যের উত্তরাধিকার। রাজমাতার সব ষড়যন্ত্রের পরও, সেই আসল উত্তরাধিকার।একে যেভাবেই হোক বাঁচাতেই হবে তাকে। দুঃখিনী রানীর বুকের ধন। এই গহীন বনে কেউ না জানুক কে সে, তাকে একা হলেও বেঁচে থাকতেই হবে। কতক্ষন ধরে সে হাঁটছে। এক ফোঁটা পানি পর্যন্ত খায়নি। তেষ্টায় বুকটা ফেটে যাচ্ছে। ক্ষুধায়, পিপাসায় রানী টলে পড়ে মাটিতে। আর কিচ্ছু মনে নেই তার। চোখ মেলে দেখে, এক অদ্ভুত কুটিরে সে শুয়ে। মাথার কাছে এক কুৎসিত দর্শন বুড়ো মহিলা। পরনে তার অদ্ভুত পোষাক। এমন তো আগে সে দেখেনি। বুঝতে পারল, এই বুড়িই তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। ঘরের কোনে জলের কুঁজো। বুড়ি তো বোঝে না কি চাই সে। সে অবাক চেয়ে আছে রানীর মুখের দিকে। এমন সুন্দর কোন মানুষ হতে পারে, তার বিশ্বাস হতে চায় না। আসলে তো রানীকে এখন মানুষের মতই লাগছে। তার পাখা তো কেটে দিয়েছে রাজমাতা কলাকৌশলে। শেষে রানী যখন হাত বাড়িয়ে জলের কুঁজো দেখালো বুড়ি বুঝল, পানি খাবে সে। বুড়ি ছুটে যায়। বুড়ি এটা আনে, ঐটা আনে। কি দিয়ে এই রমনীর সেবা করবে সে ভেবে না পায়। তার ভাঙ্গা ঘরের চাঁদের আলো হয়ে কে এল হেথায়! এই গহীন বলে কিভাবে এলো সে হায়! বুড়ি তাকে বুকে আগলে রাখে... মন দিয়ে যতন করে। কি মায়ার জালে বাধা পড়ে গেছে দুজনেই দুজনাতে।

অবশেষে জন্ম নেয় ফুটফুটে এক চাঁদের মত রাজপরী। ছোট হাত ছোট পা, সাথে ছোট দুটো পাখা। বুড়ি বুঝে ফেলে আসলে এটা পরীর বাচ্চা। বুড়ি তো অবাক! ইশারায় ইশারায় রানীকে কেবলি শুধায়। আর বোঝাতে চায় পরীকন্যাকে লুকিয়ে রাখতে হবে। কেউ তাকে দেখে ফেললে সর্বনাশ! আর বাঁচাতে পারবে না তাকে। ভয়ে রানীর বুক কাঁপে। আঁচল দিয়ে আগলে রাখে সে মেয়েকে। সবসময় চোখে চোখে রাখে পরী রাজকন্যা চাঁদের কণাকে। চাঁদের কণা বড় হতে থাকে। তার ডানা একটু একটু করে ঝাপটাতে শুরু করে। মা আর বুড়ি মার কোলে আনন্দে কাটে তার দিন। শুধু বাইরে গেলেই ঝামেলা। মা ডানা নিয়ে তাকে কিছুতেই যেতে দিতে চায় না। ডানা দুটো খুলে রাখতে বলে।বেজায় রাগ হয় তার মায়ের ‘পরে। একদিন রানীকে ফাঁকি দিয়ে চাঁদের কণা উড়াল দেয় আকাশে। আনন্দে সে আত্মহারা। সে ডানা মেলে ওড়ে। তার নিজের ডানা মেলে। এদিক যায় ওদিক যায়... শতদিক ঘুরে আর ঘুরে! একসময় ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে এক বিশাল মেঘের উপরে। ক্লান্তিতে চাঁদের কণার ঘুম চলে আসে। সে কোথায় আছে, কিভাবে সে খেয়ালে নেই সে। মেঘ ভেসে যায় আপনমনে। সারাদিন ঘুরাফেরা করে সাঁঝের বেলা ঘরে ফেরে মেঘরাজ। মেঘরানী দেখে মেঘরাজের পিঠের উপর এক ফুটফুটে চাঁদ বরণ শিশুপরী। ছোট ছোট পাখা দুখানি। অস্থির হয়ে বলে ওঠে মেঘরানী, “কার বুকের ধন নিয়ে এলে এমন ভাবে?” মেঘরাজ তো অবাক। সারাবেলা যে সে পিঠে করে এই চাঁদের পুত্তুলি নিয়ে ঘুরেছে, তাতো সে জানেই না! এতো হালকা, যেন পাখির পালকের মত ছোট্ট সে শরীরখানি। মেঘরানী বুকে তুলে নেয় চাঁদের কণাকে। ডাকে চন্দ্রকলা বলে। বলে চন্দ্রকলার বাবা মাকে যতদিন না খুঁজে পাই, ততদিন আমার কুয়াশার সাথেই বড় হবে চন্দ্রকলা। মেঘরাজ মেঘরানীর কোলে চন্দ্রকলার সুখের জীবন। আর সাথে আছে খেলার সাথী কুয়াশা, মেঘরাজ আর মেঘরানীর একমাত্র পুত্র। কুয়াশা আর চন্দ্রকলা খেলে আর হাসে। গান গায় আর নাচে। কবিতা বাঁধে আর মিঠে মিঠে ঝগড়া করে। এই আড়ি নেয় আবার পলকে ভাব করে ফেলে। একজনকে ছাড়া আরেকজনের যেন চলেই না।এ যেন সখা সখির খেলা। এদিকে চন্দ্রকলার বাবা মায়েরও খোঁজ পায় না মেঘরাজ মেঘরানী। তারা সুখেই আছে পরীকন্যা চন্দ্রকলা আর কুয়াশাকে নিয়ে। বিকেল বেলায় দুজনে ঘুরতে এর হয় এই মানিকজোড়কে নিয়ে। 

কুয়াশা আর চন্দ্রকলা দিনে দিনে বড় হয়ে উঠতে থাকে। যেমনি কুয়াশা তেমনি চন্দ্রকলা। কুয়াশার সুকুমার মুখখানি দেখে গর্বে ভরে ওঠে মেঘরাজ মেঘরানীর বুক। তাতে আবার চন্দ্রকলা সোনায় সোহাগা। কুচবরন দীঘল কেশ তার হাটু ছুঁই ছঁই করে। পদ্মকলির মত চোখ দুখানি। টুকটুকে লাল ঠোট তার। মুখে সোনা ঝরা হাসি লেগেই থাকে। মেঘরাজ মেঘরানী ভাবে, আরেকটু বড় হোক দুজনে, দিয়ে দেবে দুজনার বিয়ে। এই চন্দ্রমাসের মাসের পূর্ণিমায় চন্দ্রকলার বয়স হয়ে যাবে পনেরো। যদিও মেঘেরা জানেনা সে কথা। জানে কেবল তার দুঃখিনী মা আর সেই আশ্রয়দাত্রী বুড়ী। এতো বছরেও মায়ের চোখের জল মোছেনি একটু খানি। মাঝে মাঝে চন্দ্রকলা ভাবে কে তার বাবা, কে তার মা? ভাবতে ভাবতে উদাসীন হয়ে যায় মাঝে মাঝে। কুয়াশার দুষ্টুমীতে ঘোর ভাঙ্গে।হাসে কুয়াশা আর চন্দ্রকলা। হাসে চন্দ্রকলা-কুয়াশা।

একদিন, কুয়াশা আর চন্দ্রকলা যায় নদীতে ঘুরতে। ছোট্ট একটা পাল তোলা নৌকা নিয়ে জলে ভাসে তারা। কুয়াশার হাতে বৈঠা। আর চন্দ্রকলা গায় গান। কুয়াশাকে ছুঁয়ে বসে থাকে চন্দ্রকলা। দুজনের চোখে মুখে হাসি আর দুষ্টুমী। হঠাৎ কুয়াশার ঠোটে ঠোট ছুঁয়ে দেয় চন্দ্রকলা। কুয়াশা ভালোলাগায় নিজেকে ছড়িয়ে দেয় আপন স্বত্তায়। বৈঠা ছেড়ে সে এবার পুরো নদী জুড়ে আনে কুয়াশা। চারিদিকে শুধু কুয়াশা আর কুয়াশা। আর কিছুই দেখা যায় না। এদিকে নৌকা দুলতে শুরু করেছে। চন্দ্রকলা চারিদিকে কুয়াশা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না।নৌকার দুলুনীতে পানিতে পড়ে যায় সে। বাঁচার জন্য ডানা ঝপটাতে শুরু করে। কুয়াশার সেদিকে নেই খেয়াল একেবারে। সে এখন আনন্দে আত্মহারা। চন্দ্রকলা পানিতে ভেসে অনেক দূরে চলে যায়। তারপর একসময় বাতাসে ভর করে উঠে যায় আকাশে। নিয়তির কি অমোঘ আকর্ষনে সে উড়তে থাকে চাঁদের পানে। কুয়াশা দেখে চন্দ্রকলা নেই। নৌকাখানা শুন্য ভাসে মাঝ নদীতে। কুয়াশা তাকে এদিক খোঁজে ওদিক খোঁজে, কোথাও না পায়।

এদিকে মায়ের চাঁদের কণা পৌছে যায় চাঁদে। চাঁদের মাটিতে পা রাখতেই সবাই অবাক চোখে তাকেই চেয়ে দেখে। এমন সুন্দর পরী তারা এই জন্মে দেখেনি।সবাই তার চারপাশ ঘিরে জটলা করে। চাঁদের কণাও খুবই অবাক। এখানে সবার দুটো করে ডানা আছে। ঠিক তারই মত। তাহলে এই কি তার আসল রাজ্য! সবাই চাঁদের কণাকে নিয়ে যায় রাজার কাছে। বিরহী বুড়ো রাজা। গর্ভবতী স্ত্রীকে নির্বাসন দেয়ার তিন বছর পর মারা যায় রাজমাতা। মৃত্যুর আগে ক্ষমতার সর্বোচ্চ অপব্যবহার করেছে সে। তার মৃত্যুর সাথে সাথেই যাদুর সম্মোহন থেকে মুক্তি পায় রাজা। ছোট্ট শিশুর মত কাঁদতে শুরু করে স্ত্রী-সন্তানের জন্য। কিন্তু কি করবে সে, কোথায় পাবে তাদের।। মাঝে মাঝে রানী সুলেখার ডানা দুটো বুকে জড়িয়ে বসে থাকে রাজা। রাজ্যে সুখ নেই। প্রজারাও রাজার দুঃখে অসুখী।

চাঁদের কণা অবাক চোখে রাজ দরবার দেখে। কি সুন্দর করে সাজানো সব কিছু। এক নারীর ছবির সামনে অবাক তাকিয়ে রয়, কেমন যেন আপন আপন লাগে তার এই নারীকে। এক চোরা মায়ায় ভরে ওঠে মন। রাজা আসে। রাজার বিষন্ন চেহারা দেখেও তার মায়া মায়া লাগে। চোখের দিকে তাকালে মনে হয় সে চোখে কতদিনের বুভুক্ষা। ভালোবাসার তৃষ্ণা। রাজাও অপলক চেয়ে থাকে চাঁদের কণার দিকে। গলার কণ্ঠহারের দিকে চোখ যায় তার। ঠিক এমনি এক কণ্ঠহার ছিল তার রানীর। সন্তানের ভাবী আগমন বার্তা শুনে নিজ হাতে পরিয়ে দিয়েছিল রাজা। রাজ জ্যোতিষকে ডাকে রাজা। শুধায় এই অপরূপ সুন্দরী পরীর পরিচয়। জ্যোতিষী গণনা করে বলে এই হল রাজকুমারী চাঁদের কণা। রাজ্য জুড়ে বেজে ওঠে আনন্দধ্বনি। রাজা তাকে শুধায় মায়ের ঠিকানা। সে বলতে পারে না। রাজা মরিয়া হয়ে শুধায় তার রানীর ঠিকানা। জ্যোতিষ বলে, সে আছে গভীর জঙ্গলে জংলী বুড়ির কুটিরে একাকিনী। রাজকুমারী সেখান থেকে হারিয়ে গিয়েছে চৌদ্দ বছর আগে। চোখের জলে ভাসা রানী সুলেখা। রাজা, মহা সমারোহে নিয়ে আসে রানীকে। রানী তার কন্যাকে ফিরে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা। রাজ্যে আবার ফিরে আসে সুখ। পাখিরা গান গায়। কত ফুল ফোঁটে। সরবরে টলটল করে স্বচ্ছ জল। কিন্তু রাজকুমারীর মনে পড়ে কুয়াশার কথা।
কুয়াশার কষ্টে কাঁদে মেঘরাজ মেঘরানী। কোথায় পাবে তারা চন্দ্রকলাকে। তাদের মহাকষ্টের ভারে আসে কালবৈশাখী। পুরো বর্ষা কেঁদে ফেরে তারা। মাঝে মাঝে চাঁদের দিকেও উঁকি মারে তারা। কিন্তু সেখানে তো যেতে পারেনা। তখন চাঁদ ঢেকে যায় মেঘে। শীতকালে কুয়াশার চাঁদরে মুড়ে থাকে প্রকৃতি। চন্দ্রকলার খোঁজ চলে ভুবন জুড়ে। কোথাও পায় না সে চন্দ্রকলাকে। পরী রাজ-রানীও দেখে চাঁদের কণা হাসে না। খায় না। কষ্টে তার চোখে মেঘ ভর করেছে। রাজা রানীর সুধায় কেন তা? চাঁদের কণা বলে তার মনের কথা। বলে মেঘরাজ-মেঘরানীর কোলে বড় হওয়ার কথা। বলে কুয়াশার কথা। পরী রাজ-রানী ঠিক করে তাদের খুঁঝে বের করবে তারা। চাঁদের কণার ষোড়শ জন্ম পূর্ণিমায়, তারা কুয়াশাকে খঁজে পায়। খুঁজে পায় মেঘরাজ মেঘরানীকেও। মহা ধুমধামে চাঁদের কণা আসে কুয়াশার বধূ হয়ে। সুখে থাকে সবাই।

এখনো চাঁদের কণা চন্দ্রালোকে বেড়াতে গেলে, মেঘরাজ মেঘরানী উঁকি মারে চাঁদের বুকে, তাদের পুত্রবধূর খোঁজে। তখন চাঁদ ঢেকে যায় মেঘে। শীতকালে, কুয়াশা তার বধূকে নিয়ে বের হয় বিশ্বভ্রমনে। রাতের বেলা কুয়াশার আলো আঁধারীতে নাচে গায় চাঁদের কণা। প্রকৃতি সে গান শুনে তাদের জন্য মেলে ধরে সুবাসী পুষ্পবন্যা।

[লেখকের কথাঃ স্কুলবেলায় একটা কুইজ কম্পিটিশন জিতে পেয়েছিলাম বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের রূপ কথার বইয়ের সেট। যখনই আমার শিশু মনের ক্ষিদে টের পেয়েছি, পড়েছি ঐ রূপকথা গুলো। ছোটবোনের জন্য কিনেছিলেম ঠাকুরমা’র ঝুলি। সেদিন লীলেন দা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন রূপকথার পিছনের কিছু কথা। বুঝিয়ে দিলেন, আমার শিশুমনের খোরাকে স্লো পয়জনিং হচ্ছে। তাই এবার নিজের মনের ক্ষিদেয় নিজেই লিখতে বসলাম রূপকথা। আর আমার লেখা রূপকথা উৎসর্গ করে দিলাম আমার অনাগত সন্তানদের উদ্দেশ্যে, যারা পৃথিবীতে এসে অবাক বিস্ময়ে এই সুন্দর পৃথিবীর সুন্দর দিকগুলোই সবার আগে জানতে চাইবে।

নিখাদ রূপকথাই লিখতে চেয়েছি। রূপকথা লেখার মত এতো শক্তিশালী কল্পনা শক্তি আমার নেই। নেই কথাকে ছন্দে বাঁধার মোহনীয় ক্ষমতা। তবুও সাহস করে লিখেই ফেললাম। হয়ত লিখব এভাবে আবারো। তবে, আমি অপেক্ষায় আছি এমন সব বাংলা রূপকথার, যা একদিন বিশ্বসাহিত্যের ভান্ডারে ঠাঁই পাবে। হয়ত একদিন কোন চীনে বালিকা অবিষাক্ত বাংলা রূপকথার সুধায় মেতে উঠবে।]




Tuesday, September 21, 2010

মুহূর্তিকা

অনেকদিন আগে লিখতাম কবিতা। সেগুলো ছিল আমার হৃদয়ের কথা। অনেক গভীর অনুভূতি, যা পারতাম না মুখে বলতে, তাই অগ্নুৎপাতের মত বেরিয়ে আসতো কবিতা হয়ে। তাতে ছন্দ ছিল কিনা জানিনা। ভাব ছিল, সে জানি। সে মেলা দিন আগের কথা। বছর তিনেক হল প্রায়। অযত্নে অবহেলায় হারিয়ে গেছে কয়েকটা। কিভাবে যেন বুকে আঘাত পেয়েছিলাম। তাই কবিতারাও অভিমানী হয়ে দিয়েছিল ছুট। কিছুদিন হল, হৃদয়ে শুনি গুন গুন। হঠাৎ হঠাৎ দেখি গুন গুন গুলো আঙ্গুলের ছোঁয়ায় শব্দ হয়ে যাচ্ছে। এগুলোর নাম দিয়েছি মুহূর্তিকা। মুহূর্তেই আসে, মুহূর্তেই হারিয়ে যায় আনমনে। হাতের কাছে কম্পিউটার না থাকলে লেখা হয় না। কিছু আবার বন্দী হয়ে যায় ডিজিটাল ডট পেন্সিলে। এইগুলোর মত। যত্ন করে গড়া না হলেও অযত্নে যেন না হারায় তাই জমিয়ে দিলেম সচলের খাতায়।

#১
বন্ধু তুমি কেমন আছ?

বন্ধু তুমি চোখের আড়াল,
চুপ করে তাই কাটে বিকাল।
অসীম আকাশ, একলা চিল;
উড়ছে একা আনন্দবিহীন।
বন্ধু তুমি কেমন আছো?
তুমি কি এখনো তেমনি হাসো?

#২
দেখিনি হৃদয় মাঝে

দেখিনি দেখিনি হৃদয় মাঝে,
শেষ বিকেলে অথবা মায়াবী সাঁঝে,
অর্থহীন কিছু গুঞ্জনের অবসরে,
কে আমার মন ছুঁয়েছে।
দেখিনি দেখিনি গত বিকেলের বর্ষনে
আঁধার মুছে রক্তিম সূর্যোদয়ে
কোন আবীরে সেজেছি শখে,
সদ্য ঘুম ভাঙ্গা চোখে,
কোন স্বপ্নের রেশ লেগে আছে।
তবু আজ জেনে গেছি,
ঘুমিয়ে ছিলাম গত রাতে,
কোন ভালোবাসার অন্তর জুড়ে।

#৩

একাকীত্বের অভিসারে

একাকীত্বের অভিসারে আমি ছুটে গেছি
সেই তুমুল বর্ষার মাঝে,
ভেজা মনে হাটু গেড়ে
জল মেখেছি আঁজল ভরে,
পূজারিনীর ভঙ্গিতে।
প্রার্থনার সুরে গেয়েছি প্রানপণে,
প্রানহীন অস্তিত্বের বন্দীশালা যাক ভেঙ্গে।
আমায় একটুখানি ঠাঁই দেবে
জীবনের প্রানোচ্ছল প্রানহীন প্রতি স্তরে?
তোমার বুকের পাঁজরে?
আমি তোমাকেও ভেজাবো,
আমার তীব্র প্রার্থনার বৃষ্টি জলে।



Monday, September 20, 2010

এইতো তোমার কাছেই আছি


তোমার জন্য গল্পগুলো জমিয়ে রেখে,
চলছি পথ আনমনেতে;
ভাবছি আমি পথের শেষে,
দেখা হবে আমাতে-তোমাতে।
কথা হবে নতুন রঙ্গে,
আঁকবো ছবি নতুন ঢঙ্গে;
তুলিতে জড়াবো তোমার হাসি,
সুর তুলিবে তোমার বাঁশি।
এইতো তোমার কাছেই আছি,
মনে মনে মন ছুঁয়েছি,
হৃদয় দিয়ে বেধেছি হৃদি।

Sunday, September 19, 2010

পাথুরে মানবীর হৃদয়ে

আমি মূক বধিরের মত;
ভাসতে পারিনা প্রগলভ স্রোতে,
চেয়ে থাকি কেবলই নীরবে।
আমার চাহনি কী কথা বলে?
সে আমি জানিনে।

চোখের জল চোখেই ধরে রাখতে
সে আমার বেশ সয়ে গেছে।
তুমি আনন্দের বার্তা নিয়ে এলে,
আমার হৃদয় কাঁপে না উচ্ছাসে।

তুমি আবেগঘন হয়ে এলে,
আমি অনুভব করিনা নিঃশ্বাসে
তোমার মর্মস্পর্শী গানে,
আমি বসে থাকি নির্বিকারে।

এই পাথুরে মানবীর হৃদয়ে
কিছু কথা আছে।
তবু গান থেমে যায়
ভাবের প্রকাশে।
বলা হয়নি তোমাকে,
খুব ইচ্ছে করে,
পিয়ানোতে নতুন সুর বাঁধতে।
গাঢ় লালে আমার ক্যানভাস রাঙ্গাতে।
বলা হয়নি কেবল ভাষাতে।

সেই নির্জন দুপুরে,
ঠিক যেমনি করে,
মাথা রেখেছিলে কোলে,
সেদিনও আমি নীরব ছিলাম,
তোমার চোখে চোখ রেখে।
সেই পরম কাঙ্খিত প্রহরে
চোখেতে তোমার আঙ্গুল ছুঁয়ে
কথা ছিল নিভৃতে।

এতগুলো দিন
কেটে যাবে ভাবি প্রতিদিন;
কত রাত কাটে কল্পবিলাসে,
প্রতীক্ষাতে।
তোমার চুল দেখি আঙ্গুলের ফাঁকে।

তীব্র অনুভবে
কথা কই নৈঃশব্দের সুরে সুরে।

Friday, September 17, 2010

উৎসর্গ তোমাকে

এতো সুদীর্ঘ প্রতীক্ষা কখনো করিনি
প্রতীক্ষার গল্প লিখেছি আমি
এক ম্লানমূখী গোলাপী চাঁদে
বিমূর্ত অস্থিরতা অস্তিত্বের ঘোষনা দেয় 
প্রতিমুহূর্তে নীরবতার নূপুর নিক্কনে
নিঃশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকি আঁধো অন্ধকার রাতে
মাঝ নদীতে অনিশ্চয়তা খেলে নৌকার পালে


কথার ফুলঝুরি ছোটে মনে মনে দুজনাতে
হয়ত কখনো দেখা হবে
জোস্নার বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে
কোন এক অচেনা নদীর তীরে
চোখে চোখ রাখি প্রচন্ড সাহসে
কেঁপে উঠি তোমাকে হারাবার ভয়ে

কাঁপা হাতের নৈবদ্যে স্বপ্ন সাজিয়েছি, 
শুধু বলতে পারিনি-- ভালোবাসি!

সুদূরে তোমার লাজুক বধূ

আমার মতন মানুষ গুলো,
হয়ত এমন এলোমেলো।

সুর তুলেছে মনের মাঝি,
হৃদয়মাখা গভীর তুমি।
কথায় আমি প্রেম না বুঝি;
কাব্যে তাই তোমায় বলি,
খুব যে তোমায় ভালোবাসি।

ছুঁয়েছি ঐ চোখ দুটি,
ছুঁয়েছি ঐ চাপা হাসি।
এই যে আমার জাগরণে,
খেলছ তুমি মায়ায় মৌতাতে।
নিত্য মোরা স্বপনে ভাসি,
তোমারই জন্যে তুমি আমি।

সুদূরে তোমার লাজুক বধূ;
হিয়ার ছোঁয়া অদূর তবু।
ঘুম পাড়াবো আদর করে,
চেয়ে রব আলতো স্বরে,
ঘুড়িতে আঁকি তোমার ছবি,
আমায় দেখে হাসে রবি।


Thursday, September 16, 2010

পঞ্চমীর চাঁদ

মিঠু ভাই,
এ নিছকই এক সাধারণ চিঠি। আমি কি লিখতে যাচ্ছি এই চিঠিতে এখনও জানিনা। তবে সবার আগে যে কাজটি করলাম, তা হল, আপনার নামের সামনে থেকে প্রিয় শব্দটা তুলে দিলাম। অজানা অচেনা প্রফেসরকে মেইল করতে গেলেও ডিয়ার লিখেই শুরু করি, বহুল ব্যবহারে, প্রিয় শব্দটি আমার কাছে মূল্য হারিয়েছে। তবে, প্রিয়তম শব্দটি এখনও মূল্য হারায় নি। এই শব্দটি ব্যবহার করে এখন কাউকে প্রেমপত্র লেখা হয়নি। ভাবছি, এই কাজটিও করে ফেলতে হবে। জীবনে সব কিছুই একবার হলেও করে দেখা দরকার। নইলে পৃথিবীর রঙ, রূপ, গন্ধ ঠিক বোঝা যায় না। মানব জন্ম যখন একটাই, এটাকে যথাসম্ভব পরিপূর্ণ করাটাই ভালো।আমার ধারণা, একটা শিশু যখন জন্মায়, তখন তার জীবনের ক্যানভাসটা কাল থাকে। কাল মানে, সব বর্ণের আলোর অনুপস্থিতি। আস্তে আস্তে ক্যানভাসে রঙ লাগতে শুরু করে। আমি চাই, আমার মৃত্যুর সময় এই ক্যানভাসটা যেন সাদা হয়ে যায়। মানে সব বর্ণের আলোর উপস্থিতি যেন সরব হয়ে ওঠে। পুনর্জন্ম বলে কিছু আছে কিনা, জানিনা আমি। না মরলে জানতেও পারব না। মরলেও জানতে পারব কিনা, তাও জানিনা। আমার ধারণা, আত্মার অমরত্ব বলে কিছু নেই। আমার নিউরনগুলো পচে, গলে মাটির সাথে মিশে যাওয়ার সাথে সাথেই আমার আত্মার সব ধরণের অস্তিত্ব শেষ হয়ে যাবে। সেই ভালো, যুগ যুগান্তরের, জন্ম জন্মাতরের এতো স্মৃতি নিয়ে যদি কোন আত্মাকে চলতে হয়, সেটা নিজের ভারেই মুখ থুবড়ে পরে যাবে। দেখেন, কথাবার্তা কেমন মৃত্যুর দিকে চলে গেল। এক্ষনি হয়ত কেউ বলে উঠবে, কি সব বাজে কথা বল। আমি বলি, না বাজে কথা না। আমি যে এই পৃথিবীতে দু’দিনের ঘরে আছি, এটা ভুলে যাওয়াই একটা বাজে ব্যাপার। মৃ্যুর কথা মনে না রাখলে জীবনের সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যায় না।

আমার মধ্যে মৃ্ত্যু নিয়ে অনেক ফ্যান্টাসি কাজ করে। জন্মাবার সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা আমার ছিল না। কিন্তু মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা আমার থাকা উচিৎ। আপনার মনে আছে, সেন্টমার্টিনের সৈকতে রাতের বেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল এগারো জনের পর্যটক দল? তারাভরা রাতের আকাশে অমিতাভ আমাদের দেখিয়েছিল মিল্কিওয়ে, লঘু সপ্তর্ষি, গুরু সপ্তর্ষি আরো কত কি! আপনি কি এক বিরহের গান গেয়ে উঠলেন! অভি আমাকে জিজ্ঞেশ করেছিল, সমুদ্রের কাছে এলে তুমি এমন নিশ্চুপ হয়ে যাও কেন? আমি বলেছিলাম, সাগরের বিশালতার সামনে আমার কথা হারিয়ে যায়। মনে মনে কি নিজেকে তখন কেবলি এক প্রবালখন্ড ভাবিনি? ভেবেছিলাম। আজ অন্য কিছু ভাবছি। একাকী অমন এক তারা ভরা জোৎস্নাময় রাতে বসে থাকব ঢেউ আর বালি সন্ধিস্থলে। আকাশে থাকবে পূর্ণিমার চাঁদ। আস্তে আস্তে পানির উচ্চতা বেড়ে যাবে। একসময় প্রবল স্রোত আমাকে টেনে নিয়ে যাবে সমুদ্রের কোলে। আমি তখনও প্রকৃতির সুধায় ডুবে থাকবো, যতক্ষন পারা যায়। মৃত্যুর ঠিক আগের মূহুর্তে হয়ত বেঁচে থাকার প্রবল ইচ্ছা জাগবে আমার মধ্যে। হয়ত আরো কয়েক সেকেন্ডের জন্য এই সুন্দর পৃথিবীর সুন্দরের অংশ বলে নিজেকে ভাবতে চাইব। তারপর সত্যি সত্যি সাগরের ফেনা হয়ে যাবো। অসাধারণ! বার্ধক্যে ধুঁকে ধুঁকে মরার চেয়ে এই মৃত্যু আমার কাছে অনেক বেশী আরাধ্য! আপনি আবার ভেবে বসেন না, কোন গভীর হতাশা বা অপূর্ণতা থেকে আমার এমন মরার সাধ জেগেছে। আমার জীবন এই মূহুর্তে অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে পরিপূর্ণ। আমার জীবনকে ঘিরের আছে অদ্ভুত সুন্দর ভালোবাসা। আমার বর্তমান সময়টা অনেক সুন্দর বলেই আমি এমন একটা মৃত্যুর কথা চিন্তা করতে পারছি। আসলে এই মূহুর্তে আমি রোমান্টিসিজমে ডুবে আছি। আমি এখন ওয়ার্ডসওয়ার্থের প্রেমিকা। আমি মানুষ নয়, হয়ত কোন এক জলজ প্রানী। হয়ত আমি কেবলি এক শিশির ভেজা ঘাস। হয়ত আমি জীবনানন্দ দাসের সেই শংখচিল অথবা শালিখ। জীবনানন্দ দাস কত সুন্দর করে তার রোমান্টিক দর্শনকে কবিতায় লিখে গেছে। আমি অবাক হই।

“যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ
মরিবার হল তার সাধ।”
আমি হয়ত সেই মানুষটি যার পঞ্চমীর চাঁদ দেখলে মরতে সাধ জাগে।

আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়তাম, তখন ফিজিক্স ছিল আমার কাছে চকলেট সাবজেক্ট। এখন সেই চকলেটের স্বাদ ফিজিক্স থেকে ফিলোসোফিতে এসে গেছে! এ আমার নতুন পাগলামী। আমার কাছে এখন জীবন, মৃত্যু, ভালোবাসা সবই ফ্যান্টাসি।

আমার মনে হয় ভালোবাসা ঘেরা এক নতুন পৃথিবীতে আমি জীবন আর মৃত্যুর সীমান্তে দাঁড়িয়ে আছি। যেকোন সময় যেকোন দিকে আমি চলে যেতে পারি। কি? ভয় পেলেন নাকি? আমার মা জননী একবার আদর করে আমাকে ডেকেছিলেন, “কিঞ্চিত ছিটগ্রস্থ বালিকা!” কথাটা কিন্তু আমার দারুন লাগে। এমন মানুষ যেকোন সময় কেবলি একটি কবিতা অথবা দেয়ালে টাঙ্গানো একটা ছবি হয়ে যেতে পারে। ইচ্ছে হলেই নিজেকে এক টুকরো মেঘ ভেবে অসীম আকাশে ঘুরে বেড়াতে পারে। গাছের সবুজ পাতায় লেগে থাকা রোদ্দুর হয়ে যেতে পারে। আমিও পারি।হাসি

-ইতি
নীল রোদ্দুর

[বিঃ দ্রঃ আপনি শুধাতে পারেন, চিঠিটা কেন আপনাকেই লিখলাম? র‌্যান্ডম স্যাম্পলিং এ কে বা কি আমার হাতের মুঠোতে উঠে আসলো তা কিন্তু কোন ব্যাপার না। নিয়তিবাদীরা হয়ত বলবে, নীল রোদ্দুর প্রজেক্ট থেকে মিঠু প্রজেক্টে অমুক সময়ে অমুক স্থানে একটা যোগাযোগ হবে, তা পূর্ব নির্ধারিত ছিল।]



Wednesday, September 15, 2010

ফিনিক্স পাখির গান

লেখিকা হওয়ার কোন যোগ্যতাই আমার নেই। কারন, আমি হলাম বাদশাহী আলসেখানার আলসেদের মত, লিখতে আমার মহা আলিস্যে। আর যদিও বা কিছু ছোট ছোট লেখা লিখে ফেলি মাঝে মাঝে, সেগুলো জনসাধারণের পাঠের উপযুক্ত মনে হয় না আমার। তাতে থাকে আমার একান্ত ব্যক্তিগত কিছু অনুভূতির ছোঁয়া। পানিতে নেমে এখনও কাপড় ভেজার ভয় আমার কাটেনি। কেন যেন, ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলোকে আমার মনের কুঠুরিতে সযত্নে লালিত মুহূর্ত করেই রাখতে ভালো লাগে। তাতে যদি আনন্দ থাকে, আমি মনে মনে হাসব, চেহারার আয়নাতে তার ভাসা ভাসা ছাপ পড়ে রইবে। তাতে যদি বেদনা থাকে, তবে আমার কপোল বেয়ে নিঃশব্দে জল গড়িয়ে পড়বে। কিংবা যদি খুব সাদামাটা কোন ব্যাপার হয়ে থাকে, তবে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে নির্লিপ্ত হয়ে বসে রইব। এই স্বাধীনতাটুকু কখনই হারাতে চাই না। তাই বিখ্যাতদের এড়িয়ে যেতেও ভালো লাগে, বিখ্যাত হতেও ভয় লাগে। আমার সহজ সরল নিটোল জীবনে কখনও বার্জার কিংবা এলিটের ইলাস্টিক পেইন্ট পড়ে যাক, সে আমি চাই নে। চেহারায় এখনও আমার খানিকটা কিশোরী সুলভ লালিত্য রয়ে গেছে। আর মায়ের কাছে, ভালোবাসার জনগুলোর কাছে আদুরে গলায় করি শিশুর মত আবদার। ওইটুকু হারালে আমি একেবারে খাঁটি মানব যন্ত্র হয়ে যাব।তাইতো আমার এতো আড়াল আবদার। অফিস, বিশ্ববিদ্যালয় আর বাসার বাইরে কাউকে চিনি না। চিনে ফেলার সম্ভাবনা থাকলে আগে ভাগে পালিয়ে বাঁচি। যোগাযোগের এই যুগে বসেও নেট বন্ধুতা আর টেলিফোনে সখ্যতা দারুন ভিতীকর আমার কাছে। এগুলো আমার কাছে প্রয়োজনে যোগাযোগের মাধ্যম, এর চেয়ে বেশী মূল্য পায়নি। সেই যে একবার, কলেজের বন্ধুরা মিলে গিয়েছিলাম পিকনিকে, সেখানে গিয়ে পুকুরের জলে পা ডুবিয়ে জলকে মুকুর বানিয়ে নিজের রূপে মুগ্ধ হয়েছিলাম, ভুলিনি তা।

আরেকবার জাহাংগীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শীতকালীন পাখি দেখতে গিয়ে গাছে চড়ে বানরী খ্যাতি পেয়েছিলাম, আফসোস আমার বানর সখাকে খুঁজে মরি। শৈশবে গাছে চড়তে পারিনি বলে কি জীবনেও সে সাধ মেটাবোনা? বরং ভালোই হয়েছে, কিছু শিশুসুলভ সাধ অপূর্ণ রয়ে গেছে বলে আমার শৈশবও এখনো কাটেনি। আমার ছোট বোন আমাকে ডাকে বাবুনী, ইলেকট্রিসিটি চলে গেলে চার্জার নিয়ে যখন পড়তে বসি, আমার মুখখানির দিকে আমার ছোট্ট বুবুনীটা অপলক তাকিয়ে থাকে, মাঝে হঠাৎ বলে ওঠে, তুমি আসলেই বাবু।আমি দেই কষে একটা বকা। ইঁচড়ে পাকা মেয়ে কোথাকার!

বুয়েটে যখন তরতাজা বছর, তখন এক স্ট্রাইকের দিনে দেয়াল টপকে ক্যাম্পাসে ঢুকে অ্যাডভাইজার স্যারের কাছে রেজিস্ট্রেশন করতে গিয়ে দিয়েছিলাম তাকে মহা চমকে! সে রিতীমত আমাকে জেরা করেছিল, ঢুকলে কিভাবে? আমি তো লাজুক লতাটির মত মাথা নীচু করে আছি দাড়িঁয়ে। বলিনা বলিনা। শেষে যখন বলে দিলাম, স্যার দেয়াল টপকে, স্যার যে বিখ্যাত হাসি খানা দিলো, সে আমি মরার আগেও ভুলব না।

ডিকেডি স্যারকে ভয় পায় না, এমন ছাত্রছাত্রী এখনো বুয়েটের মেক্যানিকাল ডিপার্টমেন্টে আসেনি। সেই স্যার কে দেখেছি মায়া গোপন করতে, অন্য স্যারকে দিয়ে খোঁজ নেয়াতে, তিনটি বালিকা কেন চুপসে আছে উৎসবের এক কোণে! স্যারের পড়ানোর ধরনে আমি স্যারকে শিক্ষক হিসেবে শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছিলাম। সেইদিন দেখেছি তার পিতৃরূপ। আমরা আবার আজকালকাল ছেলেমেয়ে তো। শিক্ষকদের নামের শেষে যে স্যার উচ্চারন করতে হয়, তা মনে রাখা বাহু্ল্য মনে করি। কিন্তু আমি বড়ই গুরুভক্ত। দীপক কান্তি দাশ স্যারকে আমার সামনে কেউ ডিকেডি বললে বেহায়ার মত শুধরে দিয়ে বলি, ডিকেডি না, ডিকেডি স্যার।
ফুটবল গ্যঞ্জাম আমরাও পেয়েছি। ব্রাজিল, আর্জেনটিনা, ফ্রান্সের গোল বন্যায় চিৎকার দিয়ে উল্লাসে মাতব বলে টার্ম জ়টে পড়তেও কখনো আমরা দ্বিধা করিনা। এইবার হল ভ্যাকান্টের পরের দিন ভালবাসার ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখি, ক্যাম্পাস এখন স্কুল ছাত্রদের দখলে। ভীষন হাসি পেয়ে গেল। মনে পড়ে গেলো প্রথম বর্ষের প্রথম দিনের কথা। ওএবির গোলক ধাঁধায় পথ হারিয়ে ক্লাস খুঁজে না পাই। এক অচেনা ছেলেকে তার অজান্তে অনুসরণ করে দেখি, সে আধাঁরে হারালো। আমি দাড়ালাম থমকে! এই অন্ধকারে ঢুকবো? এইখানে কি কোন ক্লাস থাকতে পারে? ছেলেটা এর মধ্যে ঢুকে আর বেরোচ্ছে না কেন? দুরু দুরু বুকে আমিও পা বাড়ালাম সেই অন্ধকারে। আধাঁর পেরিয়ে দেখি, সেই্খানে এক আদ্যিকালের ক্লাসরুম এবং সেটাই বিখ্যাত, ওএবি ২২২! জানালা দিয়ে দেখা যায়, স্কুলের বাচ্চাগুলো ক্লাসে মনোযোগ না দিয়ে খাতার পাতা ছিড়ে চিড়িয়াখানার বাঁদরকে কলা ছোড়ার মত করে আমাদের ক্লাসের দিকে ছুড়ে মারছে।

তৃতীয় বর্ষে পা দিয়েই উড়তে শিখেছিলাম। ক্লাস বাং মারা, ক্যাফেটরিয়া নিজেদের দখলে নেয়া, মেক্যানিকালের ছেলেবন্ধুদের সাথে ক্যাম্পাসে নতুন নতুন পাখি দেখা এবং দেখানো, অটো, সেশনালের রিপোর্ট কপি করা, ক্লাস টেস্ট না দেয়া, নবাগত বালক স্যারকে রিতীমত উপেক্ষা করে পিছনের বেঞ্চের বন্ধুর সাথে আড্ডা মারা এহেন কাজ নেই যা করিনি। সেইসাথে শুরু হল আমার বাঁধনে পদচারনা। আড্ডাবাজিতে রাতারাতি খ্যাতি পেয়ে গাদাখানেক জুনিয়র সাথে নিয়ে রাত সাড়ে নয়টা দশটা পর্যন্ত শহীদ মিনারে হৈ-হুলোড় কিছুই বাদ দেইনি।ক্লাশের বন্ধুরা ডাকে ভ্যাম্পায়ার! ক্যাম্পাসের দেয়ালে দেয়ালে দলবল নিয়ে পোষ্টার সাঁটি আর জায়গায় জায়গায় প্রোগাম বুঝে ব্যানার ঝুলাই। নিজেকে বেশ বড় বড় লাগে তখন। এসব করে টরে মনে হয়েছে, জীবনের রংগুলো সবই দেখে নিয়েছি। কিন্তু রঙ দেখা যে এখনো বাকি, সে আমি জানি।

সুইডেনে স্বপ্নসাধের বায়োমেডিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্সে চান্স পেয়ে খুশির রেশ না কাটতেই দেখি, ফাঁকা ফাঁকা লাগে! মনে হয়, পায়ের নিচ থেকে ঝুর ঝুর করে সরে যাচ্ছে মাটি। মামনির আদর করে সকাল বেলা ঘুম ভাঙ্গানো হাত কেমন যেন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। ছোট দুটো ভাই বোন যেন জোড়া চড়ুই পাখির মত উড়ে চলে যাচ্ছে। আমাকে ঘরে না দেখলে বাবা অস্থির হয়ে যায়, বাবা আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, না আমারই ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে! শেষবার যখন আমি আর আব্বু ট্রেনে চড়ে ঢাকায় ফিরছিলাম, সেদিনের গল্পগুলো, গাছগুলো, সবুজ মাঠ গুলো সব যেন হারিয়ে যাচ্ছে। অফিসের ট্যুরে নীলফামারীর নীলসাগরে গিয়ে হাতে মিউজিক বক্স নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলাম পানিতে পা চুবিয়ে।কয়েকটা জলফড়িং ঘুরছিল আশেপাশে।দেশময় সোনালী ধান আর সোনালু ফুলের ঝুলের গায়ে শেষবিকেলের যে রোদের ছোঁয়া দেখেছি, সব আমাকে পিছনে ফেলে যেতে হবে।সুইডিশ এম্বাসীর ডাকের অপেক্ষায় আছি কেবল।

মাথায় এখন নতুন চিন্তা। ভিসা, বাসা আর বেঁচে থাকার খোরাক যোগাতে হবে নিজের জন্য। সেই সাথে স্বপ্ন গড়া। একটা একটা করে বইয়ের পাতা উল্টাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে দারুন কিছু গবেষনায় যুক্ত হব, সেই আশা মনে। দেশের মাটি ছেড়ে যাবো, একটা মিশন নিয়ে। সেই মিশনে হেরে যাবার কোন পথ খোলা নেই আমার জন্য। তাই এখনি, মনোযোগ বিচ্যুত হতে পারে, এমন সব কিছু থেকে সরিয়েছি নিজেকে। কিন্তু নিজের আত্মাটাই তো এখানে। বাসে চড়ে ঘরে ফেরার মুহূর্তে মনে হয়, যে পথে পা বাড়ালাম, সে পথকে টেনে আমার দেশের দিকে আনতে পারবো তো। বিজয়ীনির বেশে আমার শাড়ির আঁচল উড়বে তো দিন শেষের পাগলা হাওয়ায়? নিশ্চিত স্থবির জীবনের প্রতি আমার মোহ নেই, মোহ আছে এই লড়াইয়ের প্রতিই। তাই এই অনিশ্চয়তা আমার কাছে স্বাগত। পাহাড়ী মেয়ের মত এইবার পাহাড় ডিঙ্গাবো, জলকন্যার মত এইবার জলে দেব ডুব, ফিনিক্সের মত এইবার উড়বো আকাশে। কিন্তু পুড়ে কি ছাই হব? দেশের মাটির বুকে সমাধিটুকু পাবো তো শেষটাই? জানিনা। জানার সময় হলে জেনে যাবো।শুধু প্রান আর স্মৃতি, আমার নিঃশ্বাসকে যেয়ো না নিঃস্ব করে।



বাসন্তী করবীর খোঁজে

যেখানে আমার জীবনের শুরু
দাগকাটা কাগজে লিখেছি বড় বড় অক্ষরে
ব-তে বাংলাদেশ
ল-তে লাল
স-তে সবুজ
প-তে পতাকা
পেন্সিলে একেঁছি মানচিত্রের সীমারেখা
যেখানে বিশাল সবুজ মাঠে
ছোট্ট দু’পায়ে অবিরত হেঁটেছি
দু’হাতে ঘাসের শিশির ছুঁয়েছি
কখনো কখনো ঘাসের নীচে
মাটির সোঁদা গন্ধ নিয়েছি
প্রজাপতির মত শৈশব কৈশরে
যেখানে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন গেয়েছি
“আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবসি”
সেখানে আবার ফিরেছি আমি।


আমার শৈশবের সেই সেখানে
স্মৃতির ফ্রেমে কৃষ্ণচূড়া জারুল খুঁজেছি
বিষন্ন আমিত্বের প্রাচীর ভেঙ্গেছে
তোমার নীরব উপস্থিতি।
স্বপ্নডানায় স্মৃতিময় অতীতে
আমরা দুজনে যে পথে হেঁটেছি
মায়াময় সে পথে
জারুল হারানোর কান্না ভুলে
আমার হাসিতে হেসেছে তখন অজস্র করবী।


আমার শৈশবের সেই সেখানে
তোমাকে নিয়ে বর্তমানের আমি
কুসুম লালিমায় আপন হারিয়ে
ছুঁটেছি বাসন্তী করবীর খোঁজে।

Monday, September 13, 2010

তারার হাতছানি

০১
চারপাশে ঘন অরণ্য। এখান থেকে আড়াই মাইলের মধ্যে কোন মানুষের বসবাস নেই। একেবারেই নির্জন জায়গাটা। শব্দ বলতে পাখির কিচিরমিচির। আশে পাশের গাছে মাঝে মাঝে কিছু বানরের দেখা মেলে। কাঠবিড়ালির ও দেখা মিলেছে। মাত্র দুদিন হল এইখানে এসেছে অরিত্র। একটা ছোট টিলার উপর তার তাঁবুটা। একমাসের খোরাক নিয়েই এসেছে সাথে করে। আসার সময় পথে যে আদিবাসী বসতি চোখে পড়েছে, সেখান থেকেই খাবার পানি নিয়ে এসেছে। ফুরিয়ে গেলে আবার আনা যাবে। আড়াই মাইল, বেশী তো দূরে না। ধারে কাছেই নাকি একটা নদী আছে। ভীষন খরস্রোতা। আগামীকালই ঐটা দেখতে যাবে ঠিক করল সে। এখন বিকাল বেলা। সন্ধ্যা পর্যন্ত অরিত্র এখানে বসে থাকবে। তারপর আর তাবুর বাইরে থাকা ঠিক হবে না। বাঁশিটা বাজানোর জন্য ঠোঁটের কাছে তুলে নিল সে। একসময় সুরের মাঝে মগ্ন হয়ে গেল। এই মূহুর্তে তার বাশির সুর আর কিছু কিচিরমিচির ছাড়া কোন শব্দ নেই আসে পাশে। অবশ্য, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই কিচিরমিচির বেড়ে যাবে। এসবের জন্যই তো এখানে আসা। লোকালয়ের ব্যস্ততায় অস্থির হয়ে গেলে মাঝে মাঝেই এমন অজ্ঞাতবাস নেয় সে। এখানে কোন টেলিফোন নেটওয়ার্ক নেই। এইটা একদিক থেকে ভালো হয়েছে। না হয় মা দিনে কম করে হলেও দুইবার ফোন করত আর চলে আয়, চলে আয় বলে ঘ্যান ঘ্যান করত। অরিত্রের মায়ের ধারনা, তার ছেলেটা পাগল। তার বাবার চেয়েও বেশী পাগলাটে। সেও মাঝে মাঝে অদ্ভুত কিছু পাগলামি করে, কিন্তু ছেলেটার পাগলামি অতিরিক্ত। একটা বিয়ে দিয়ে দিতে পারলে পাগলামি কিছুটা কমলেও কমতে পারে। মায়ের টান তো বোঝেই না, মায়ের অস্থিরতাও বোঝে না। বউ যদি একটু দেখেশুনে রাখতে পারে। কিন্তু ছেলেটাই তো বোঝে না সে কথা। সে যে কি করবে এই ছন্নছাড়া ছেলেকে নিয়ে। অরিত্র মনে মনে হাসে। বাঁশি থামিয়ে দিয়েছে। এখন পাখিদের ফেরার সময়। ঐযে, তাদের কুচকাওয়াজ শুরু হয়ে গেছে। ভালো লাগায় চখ বন্ধ করে রেখেছে সে। হঠাৎ চমকে গেলো অরিত্র।
চারপাশে তো কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু মনে হল যে, জংগলের মধ্যে কারোর পায়ের শব্দ! তাহলে কি ভুল শুনলো সে? খুব বেশী দূরে হলে তো তার শুনতে পাওয়ার কথা না। হলে কাছেই হবে। কিন্তু কোথায় কে? কেউ তো নেই। ঐ তো আবার শোনা গেল। পূর্ব দিকে না? অরিত্র ঊঠল, দেখা দরকার। কেউ যদি তার নির্জনতা ভাঙ্গায় তাহলে মনে মনে বিরক্তই হবে সে, কালই তাবু গুটিয়ে ঢাকায় ফিরে যাবে। আস্তে আস্তে টিলা থেকে নেমে এল। টিলার উপরে কেউ নেই। নাহ, এখনো কাউকে দেখা যাচ্ছে না। সন্ধ্যাও তো নেমে আসছে।

০২
সকালে নদীটার খোঁজে গিয়েছিল। আসলেই ভীষন খরস্রোতা। এই নদীতে নামা ঠিক হবে না। নামলেও বেশী ভিতরের দিকে যাওয়া বিপদ জনক। ওইখানেই গোসল সেরে নিল। এসে থেকে এই সুযোগটা পায়নি সে। এখন স্বস্তি পাচ্ছে সে। বেশ খানিকটা ঘুরলো আজ। ক্লান্ত হয়ে বিকালের দিকে ফিরে এলো তাঁবুতে। কি করবে এখন? বই পড়বে নাকি গতকালের মত বাঁশি নিয়ে ধ্যানস্থ হয়ে যাবে। বাঁশিটাই নিল। হঠাৎ বাঁশি থামিয়ে দিল। আজো তার মনে হচ্ছে আশে পাশে কেউ আছে। ঐযে, গাছের আড়ালে একটু পোশাকের প্রান্ত দেখা যাচ্ছে না! আকাশি রঙের। তাড়াতাড়ি উঠেই দৌড়ে গেল সেদিকে। আরে, একটা মেয়েতো! দৌড়ে টিলার নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। নিচে নেমে দেখে কেউ নেই। আশ্চর্য! জলজ্যান্ত একটা মেয়ে এভাবে হাওয়া হয়ে গেল? বেশী তো দূরত্ব ছিল না। মাত্র কিছুক্ষণের জন্য না চোখের আড়াল হয়েছিল! আর সে এভাবে পালালোই বা কেন? না, ব্যাপারটা কি জানতে হবে। পালিয়ে গেলই বা কোথায়? কেমন রহস্য রহস্য লাগছে। সবচেয়ে বেশী অবাক লাগছে, এত দ্রুত চোখ ফাঁকি দিয়ে কিভাবে পালালো মেয়েটা। মুখটাই তো দেখতে পারলো না। কেবল পিঠ ছড়ানো রেশমী কাল চুল আর আকাশি রঙের স্কার্ট! এইখানে কাউকে এমন পোষাক পরা দেখতে পাওয়ার কথা না! কাল পুরোপুরি সতর্ক থাকতে হবে।
নিরাশ হয়ে তাবুতে ফিরে এল অরিত্র। কিন্তু উত্তেজনায় আর কিছুই করতে পারছে না সে। অনেক বই এনেছে আসার সময়। কাল রাতে যেটা পড়তে শুরু করেছিল, সেটাই হাতে নিল। কিছুই পড়া হচ্ছে না। মাথায় ঘুরছে, কি হল ব্যাপারটা? সে অশরীরী বিশ্বাস করে না, তারমত এতো লেখাপড়া জানা একটা আধুনিক ছেলের কাছে এটা কোনভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। আর যদি করতও, তবু এমন সাঁঝের বেলায়? রাত হলে না হয় আলাদা কথা ছিল। আরেকটা জিনিশ খেয়াল করেছে সে, দুইদিন এ ঠিক একি সময়ে ঘটল ব্যাপারটা। পায়ের শব্দ। প্রথম দিনও নিশ্চয় এই মেয়েটাই ছিল। কে সে? কোথায় থাকে? এখানে কেন আসে? কিভাবে আসে? হঠাৎ করেই পায়ের শব্দটা পাওয়া যায়। এখানে আসতে হলেও তো কোন না কোন পথে তাকে আসতে হয়। তাহলে তো হঠাৎ করে পায়ের শব্দ শুনতে পাওয়ার কথা না। তাকে জানতেই হবে ব্যাপারটা কি...

০৩
অরিত্র বসে আছে বাঁশি হাতে... আজ সে বাজাচ্ছে না। মন তো এখন অন্য খেয়ালে। অরিত্রের উত্তেজনা দেখে মনে হয় গাছ আর গাছের বানরগুলোও মজা পাচ্ছে। কিন্তু সেদিকে কি আজ তার খেয়াল আছে! তার যেন আজ মূহুর্ত কাটে না... সময় যাচ্ছে বড় ধীরে... অরিত্র শুধু একটু পর পর এদিক ওদিক তাকায়। একসময় তার মনে হয়, ঠিক তার পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে কেউ। যাকে সে এদিক ওদিক খুঁজছে, সে ঠিক তার পিছনে এসে দাঁড়িয়ে যাবে! ব্যাপারটা কেমন হাস্যকর হয়ে গেল না? তবু ধীরে ধীরে ঘুরল অরিত্র... চোখ এবার আসলেই ছানাবড়া! মেয়েটা সত্যি দাঁড়িয়ে আছে, শুধু দাঁড়িয়ে না, হাসছেও! চোখের তারায় কৌতুহল আর হাসি, দুটোই।
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কোন মতে অরিত্র জিজ্ঞেস করে, “কে আপনি?”
-“নক্ষত্র, তারা বলে ডাকতে পারেন।” অকম্পিত স্থির উত্তর।
-“ডাকতে পারি মানে? আসলে আপনি কে?”
মেয়েটা হাসে, “তারা।”
-“কোথা থেকে এসেছেন? কেন এসেছেন? কোথায় থাকেন? অনেক গুলো প্রশ্ন একসাথে করে ফেলল সে। অরিত্রের মস্তিস্কের উত্তাপ দেখে তারা এবার খিলখিল করে হেসে ফেলল।
তারপর বলল, “এখানেই থাকি, এখান থেকেই এসেছি, আমি একজন মানুষ এবং এই মুহুর্তে আপনার কাছেই এসেছি, কাল ও আমি আপনার কাছেই এসেছিলাম, কিন্তু দেখা দিতে চাই নি, তাই পালিয়ে গিয়েছিলাম”।
মেয়েটা এমন শান্ত কন্ঠে হাসতে হাসতে উত্তর দিচ্ছে, অরিত্রর নিজেকে বোকা বোকা লাগছে...
-“কেন এসেছেন আমার কাছে?”
এবার মেয়েটা কাছে এগিয়ে আসে, বাঁশির দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে শুধায়, “এটা কি?”
-“বাঁশি, আপনি চেনেন না!”
সে আরো বিভ্রান্ত হয়ে যায়, মেয়েটা এসে দাড়াবার আগে সবকিছু রহস্যময় লাগছিল, এখন দূর্বোধ্য লাগছে। তারা বুঝতে পারে ব্যাপারটা।
-“আমি বুঝতে পারছি, আপনি কি ভাবছেন। আসলে এমনটাই হওয়ার কথা। কিন্তু এতো ভেবে আসলে কোন লাভ নেই। আমার উপস্থিতি সম্পর্কে আমি যা জানি, তা যতক্ষন আমি আপনাকে না বলব, আপনি যা রহস্য ভাবছেন তার সমাধান করতে পারবেন না। আমি বাঁশির সুর শুনে থমকে গিয়েছিলাম, আপনার কাছ থেকেই এই সুরটা প্রথম শুনেছি। এজন্যেই আপনার কাছে আসা। নইলে আপনি আমাকে কোনভাবেই দেখতে পেতেন না, আমাকে শোনাবেন সুরটা?”
অরিত্র চোখ তুলে মেয়েটার দিকে তাকালো, শান্ত অথচ বুদ্ধিদীপ্ত ভঙ্গিমা, শ্যামলা মিষ্টি মেয়ে, বাঙ্গালী মেয়েদের সাথে অনেক মিল আছে, আবার অনেক মিল নেইও। কিন্তু ঠিক কোন অঞ্চলের সাথে মিল আছে, তাও বোঝা যাচ্ছে না। চোখদুটোতে কেমন সবুজাভ দীপ্তি আছে। বাঙ্গালী হলে এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। যত যাই কিছু হোক না কেন, মেয়েটা হাসে সুন্দর করে, তারচেয়েও বেশী সপ্রতিভ সে। বুঝল, তারা যা বলছে, তা হয়ত সত্যি। কিন্তু সে কি জানতে পারবে না, আসলে কি হচ্ছে? এটা ভাবতে ভাবতেই তারা বলে উঠল, “আমার যদি মনে হয়, আমার সম্পর্কে আপনি যা জানতে চান, তা আপনাকে বলা সম্ভব, আমি আপনাকে জানাবো”।
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল অরিত্রের ভিতর থেকে। গোয়েন্দাদের মত করে রহস্য বের করার উপায় যে তার নেই, এটুকু সে বুঝতে পারছে!

০৪
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে তারা বলে, “আমার যাবার সময় হয়ে এলো”।
উৎসুক চোখে তাকিয়ে থাকে অরিত্র।
“আপনি এভাবে তাকিয়ে থাকলে আমি যেতে পারবো না। আমি আবার আসবো”।
তারা হাসে। আবার আসবে শুনে অরিত্রও হাসে। আর তাকিয়ে থাকে না।
উপস্থিতিটুকু যেন আকাশে তারাবাজীর একবার ঝলসে উঠেই হারিয়ে যাওয়ার মত।
অরিত্রর নিজেকে বোকা বোকা লাগে।

০৫
তারা অরিত্রকে খুব বেশী বুঝে। কিছু বলার আগেই বুঝে যায় কি ভাবছে অরিত্র। অরিত্র অবাক হয়।

০৬
অরিত্র মনে মনে ভাবার চেষ্টা করে, নীল শাড়ি পড়লে কেমন লাগবে তারাকে? একটা অদ্ভুত অনুভূতি ছুঁয়ে যায় তাকে। কিন্তু তারা তো একটা জলজ্যান্ত রহস্য!

০৭
আজ পাঁচ দিন তারা আসে না বাঁশি শুনতে। অরিত্র অস্থির! অপেক্ষায় থাকে রোজ। তার যাওয়ার সময়ও তো ঘনিয়ে এলো। এভাবে বনে বাঁদারে আর কতদিন!

০৮
তারা এসেছে। খুব ভাল লাগতে থাকে অরিত্রর। মুখে বলে না সে কথা।
-“তারা, আমার নির্জনবাসের সময় প্রায় শেষ”।
-“শোনেন, আজ সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিব, যা জানতে চেয়েছিলেন”। অরিত্রের হৃদকম্পন বেড়ে গেছে।
-“আমি এখন, একবিংশ শতাব্দীতে আপনার পাশে বসে আছি। কিন্তু আমার জন্ম ৪৫৩২ সালে। আমি ঠিক এখানটাতেই থাকি। কিন্তু ছেচল্লিশ শতকে ঠিক এইখানটাতে কোন সবুজ নেই, কোন টিলা নেই। এখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা বিশাল অট্টালিকা, ওরই ২৩০ তলায় আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট। আমার ভাষায় আমার নাম সাওতা। আপনার ভাষায় এর অর্থ তারা। কিভাবে আমি এখানে আসি, সেটা কি আন্দাজ করতে পারছেন? আপনাদের সময়ে কিছু কল্পবিজ্ঞানী লেখক কল্পনায় এমন একসময় থেকে আরেক সময়ে যাওয়া আসার কথা ভেবেছিল। আমার জন্মের প্রায় পাঁচ শত বছর আগেই তা বাস্তব হয়ে গেছে।”
-“টাইম মেশিন!”
-“আমার হাত ঘড়িটা আসলে একটা টাইম মেশিন। ওটাতে যে যে সময় দেয়া হবে, সেই সময়েই এটা আমাদেরকে নিয়ে যাবে।”
-“কিন্তু কিভাবে সম্ভব হল?”
-“আমাদের যুগটা হল স্পেক্ট্রনিক যুগ। ইলেক্ট্রনিক যুগকে মানুষ অনেক আগেই পাড়ি দিয়ে ফেলেছে। আপনি যেহেতু সেসব কথা জানেন না, আপনাকে বলছি, পঁয়ত্রিশ শতকেই মানুষ ইলেক্ট্রনকে ভেঙ্গে ফেলেছিল, ইলেক্ট্রা আর স্পেক্ট্রা নামে দুইটা অংশে। ইলেক্ট্রা হল ইলেক্ট্রনের মূল ভর , আর স্পেক্ট্রা হল শক্তি। ইলেক্ট্রা এবং স্পেক্ট্রাকে একটা থেকে আরেকটাতে বদলে ফেলা যায়। প্রথম দিকে ব্যাপারটা বেশ কঠিন ছিল। কিন্তু একবার ইলেক্ট্রনকে ভেঙ্গে ফেলার পরই এটা হয়ে গিয়েছিল একটা চার্জবিহীন ভর। একে দিনের পর দিন আর ক্ষুদ্র অংশে ভাঙ্গা সম্ভব হয়েছে। যত ক্ষুদ্র করা সম্ভব হয়েছে, তত বেশী বেগ অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। এভাবেই একসময় মানুষ পদার্থে আলোর সমান গতি দিতে সক্ষম হয়। তার পর একেও অতিক্রম করে ফেলে একসময়। আর তাতেই সম্ভব হয়েছে এই বিদঘুটে যন্ত্র টাইম মেশিন আবিস্কার।”
-“বিদঘুটে কেন?”
-এটার কারণেই আমি জেনেছি, আগের পৃথিবী কত সুন্দর ছিল আর ভবিষ্যতের পৃথিবী কত অসুন্দর। আমরা এখন দেশদেশান্তরে, গ্রহ গ্রহান্তরে না, সময় সময়ান্তরে ভ্রমন করি। আমাদের কোন আলাদা দেশ নেই আপনাদের মত। সবাই মিলে একটা পৃথিবীতে বাস করি। আর প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে প্রযুক্তির অভিশাপের বিরুদ্ধে কাজ করি। কিন্তু আমরা কেউই কখনও অতীতে এসে বাস করি না। কারন আমার সময়ের জন্য যা প্রযুক্তির সুবিধা ঠিক দুই শতক আগে সেই সুবিধা যদি মানুষ পেত, তাহলে পৃথিবীটা আর দ্রুত নষ্ট হয়ে যেত। হয়ত, আমার জন্ম পর্যন্তই পৃথিবী বেঁচে থাকত। এই আমি স্ব্য়ং, একবিংশ শতাব্দীর জন্য একটা অভিশাপ। আজকের আগ পর্যন্ত ছিলাম না। আজ আমি যখন আপনাকে আমার সব রহস্য জানিয়ে দিচ্ছি তখন থেকে অভিশাপ হয়ে গেলাম। আমি যা বলছি, তা আপনাদের চিন্তার স্বাভাবিকতার জন্য ক্ষতিকর।”
“আমার কর্মক্ষেত্র আসলে উনপঞ্চাশ শতকে, আপনারা যেমন একদেশের মানুষ বিপদে পড়লে, প্রয়োজনে আরেকদেশ থেকে গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতেন, তেমনি, আমরা উনপঞ্চাশ শতকের ভগ্নাবশেষ থেকে কিছু মৃতপ্রায় মানুষকে বাঁচাতে চেষ্টা করছি। কিন্তু আমাকে আমার সময়ই পয়তাল্লিশ শতকে গিয়ে এখন নীরবে পর্যবেক্ষন করা ছাড়া আর কোন কাজ করার অনুমতি দেবে না। এটা আমাদের নীতি বিরোধী”।
-“তাহলে আপনি আসলেন কি করে এখানে?”
-“আমিতো সময়ান্তরে ঘুরি অতীত থেকে শেখার জন্য। পৃথিবীটা কে আরেকটু বেশীদিন বাঁচানোর জন্য আমাদের শিখতেই হবে। কিন্তু আপনাকে এসব বলার কথা ছিল না আমার। আমি আমার নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে বলছি।”
-“তাহলে কেন বললেন?”
তারা চুপ করি তাকিয়ে থাকে অরিত্রের দিকে। “আমি জেনে গেছি, আপনি কি ভাবছিলেন। আমার মস্তিস্কে একটা ব্রেইন ফ্রিকয়েন্সি ট্রান্সলেটর বসানো আছে। যুগযুগান্তরের এতো ভাষা আয়ত্ত করা তো সম্ভব না, তাই আমরা ওইটা ব্যাবহার করি অন্য যুগের মানুষের চিন্তা বোঝার জন্য। এটাকে বলতে পারেন থট রিডার। সরাসরি প্রত্যেকটা অনুভূতির কারণে যে ব্রেইন ফ্রিকয়েন্সি তৈরী হয় মস্তিস্কে, তাই বিশ্লেষন করে। আমি যে আপনার সাথে আপনার ভাষায় কথা বলছি, আসলে ওই যন্ত্রটা যেমন আপনার চিন্তাকে জানিয়ে দিচ্ছে আমাকে, তেমনি আমার চিন্তাকে আপনার ভাষায় অনুবাদও করে দিচ্ছে। ”
অরিত্র কি বলবে বুঝে পায় না। ও ভাবে, “তারা সব জানে। তারা কি পারেনা, ওর সময় ছেড়ে আমার সময়ে এসে থাকতে?”
এই ভাবনার উত্তর তারা দিয়ে দেয়। “না পারিনা। আমার সময়, নীতি, পেশা কিছুই আমাকে একবিংশ শতাব্দী তে আসার অনুমতি দেয় না। এমন কি, আমি আপনাকেও আমার সময়ে নিয়ে যেতে পারি না।”
ছোট্ট করে শুধায় অরিত্র, “কেন?”
-“ঐ কুৎসিত পৃথিবীতে আপনি বাঁচতে পারবেন না। আপনার বাঁশির সুর ও আর বাজবে না”। তারার দু চোখ ছলছল করছে। তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ায় তারা। বলে, “আসি।”
তারপর, এই প্রথমবারের মত, অরিত্রের সামনেই টাইম মেশিনে সময় ঠিক করে ঊধাও হয়ে যায় সে। আর অরিত্র... নিশ্চুপ বসে থাকে।

০৯
তারার কথা মনে পড়ে অরিত্রের, সবসময় মনে পড়ে। রাতের আকাশে দিকে তাকিয়ে থাকে অরিত্র। মনে হয়, তারাগুলো যেন তারা হয়ে হাতছানি দিয়ে ডাকছে তাকে। নাকি সেই তারাকে ডাকছে! ছেচল্লিশ শতক আসলেই তার কাছে অভিশাপ। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করে অরিত্রর।



জলফড়িং এর ছোটাছুটি

ধানমন্ডি ৩২ নং এর পাশ দিয়ে প্রায় যাওয়া আসা করতে হয় আমাকে। তবে কখনই অবসর মেলেনা লেকের দিকে ঘুরে তাকাবার। আজ মিলেছিল। কাজ শেষ করে দেখি মাত্র দুপুর ৩টা বাজে। এত তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরতে ইচ্ছা করছে না। হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম লেকের ধারে। মোটামুটি জনমানুষহীন একটা জায়গা দেখে বসে পড়লাম। নিভৃতচারী মানুষদের যা অবস্থা... মাঝে মাঝে মানুষজনের উপস্থিতি ভাল লাগে না, আমার সেই মুহুর্তে সেই দশা। লেকের জলে হাল্কা ছন্দ... তাতেই হয়ে গেলাম মগ্ন। একটা মরা ডাল জলের মাঝে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে... তাতে একটা স্বচ্ছ পাখনার ফড়িং বসে আছে অলস দুপুরের ভঙ্গিমায়। ডালটার ঠিক আশেপাশের অঞ্চলে পাঁচ-ছয়টা জলজ পোকা ঘুরে বেড়াচ্ছে... ওগুলো যে আসলে কি... তা তখনও ঠিক বুঝে উঠিনি। কেন যেন ডালে বসা অলস ফড়িং এর প্রভাবে আমার মস্তিস্ক বলে উঠল... ওগুলোও ফড়িং... জলফড়িং! জলফড়িং! মগ্ন হয়ে ওগুলোর জ্যামিতিক দিগ্ববিদিক ছোটাছুটি দেখছি...কিসের সন্ধানে জলফড়িং এর ছুটে চলা!

মগ্নতা ভাঙ্গালো একজোড়া ছেলেমেয়ে... উফ, বিরক্তিকর! ওরা কি এই জায়গা ছাড়া আর কোন জায়গা পেল না... মেজাজটাই গেল চড়ে। মনটাও গেল বিক্ষিপ্ত হয়ে... জলফড়িং এর ছোটাছুটি বাদ দিয়ে এবার নজর পড়ল জলফড়িং এর দিকে... আরে! এগুলো তো ফড়িং না... ফড়িং কি জলে থাকে! এগুলোর তো পাখনা নেই, পাখনা ছাড়া ফড়িং হয় কি করে?... দিব্যি লম্বা লম্বা পা দিয়ে সাঁতার কাটছে... কি এগুলো? কি দরকার তা নিয়ে মাথা ব্যথা করার! আজ থেকে এগুলোই জলফড়িং... আর কেউ না জানুক... আমি তো জানি! ইচ্ছে করল না... এতো সুন্দর নামটা বাদ দিয়ে অন্য কোন নামে এগুলোকে ডাকতে... জলফড়িং! জলফড়িং! জলফড়িং!

প্রথমে ভেবেছিলাম... ছেলেমেয়ে দুটো এসেছে আমার মত বেরসিকের ধারে কাছে বসে নিরাপদে প্রেম করতে... আমাকে দেখলে এটুকু অন্তত বোঝা যায়, আপদ বা বিপদ ঘটানোর যোগ্যতাটুকুও আমার নেই... নিতান্তই উদাসীন পাগলাটে টাইপের মানুষ। প্র‌য়োজন পড়লে তাদের এখান থেকে উঠতে হবে না, আমিই উঠে যাবো... একটু পর আমার ভুল ভাঙলো... এরা আসলে প্রেম করতে আসেনি... এসেছে মনোরোগ সারাতে... সম্পর্কে দেবর-ভাবী। ছেলেটা পড়ে কোন এক বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকেন্ড ইয়ারে। ভাবীর বয়স তার চেয়ে দুবছর বেশী। চোখের সামনে দেখেছে... তার দেবর মহাশয় দিনে দিনে বিষন্ন হয়ে যাচ্ছে... কারো সাথে কথা বলে না... ঘরের বাইরে যায় না... কি যে সমস্যা কাউকে বলে না... ভাবী তাই জোর করে তাকে নিয়ে এসেছে বাইরে... বাইরের আলো বাতাস দেখাতে... বার বার দেবর কে জিজ্ঞেস করছে... কেন তুমি তার নাম বলতে চাইছ না... কি সমস্যা নাম বললে? দেবর মৌন। সে তার হৃদয়ের ধন কাউকে দেখাবে না... কাউকে বলবে না তার প্রিয়তমার নাম। ভাবী গল্প করতে লাগল... সে নাকি তার বরের কাছে শুনেছে, সানি নামের ছেলেটি আগে খুব ধার্মিক ছিল... খুব প্রানোচ্ছল ছিল... তারপর হঠাৎ করেই সব কিছু ছেড়ে দিল... হারিয়ে গেল তার উচ্ছলতা... তাকে যে আবার আগের মত উচ্ছল দেখতে চায় সবাই...কে সে... যে কেড়ে নিল তার উচ্ছলতা টুকু! অবশেষে তার দেবর মশায়ের মৌনতা ভাঙলো।
নাহ... আর এখানে বসে থাকা যাবে না... এবার বরফ গলে গেছে... এরপরো বসে থাকলে অনাহুত আমাকে বসে বসে সানির বিষন্নতার গল্প শুনতে হবে... আমি আনন্দের গল্প শুনতে চাই, বিষন্নতার নয়। আমার সহপাঠী সুনীল যেদিন আমাকে বরুনার গল্প শুনিয়েছিল... আমার ভাল লাগে নি... মনীষার চোখে যেদিন টলটলে জল দেখেছিলাম... আমার ভালো লাগেনি।
ভালো লাগে লিমা-রহমতের চোখে চোখে হাসি দেখতে...

আমি সানির গল্প শুনতে চাইনি... তবু গল্পের ভূমিকা আমায় শুনতে হয়েছে... উঠে আসার সময় মনের অজান্তেই একবার সানির মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম, মাথা নীচু করে বিষন্ন ছেলেটা তার ভাবীকে কষ্টের গল্প শোনাচ্ছে... সানিদের মাথা যেদিন হৃদয়ের আনন্দে উঁচু হয়ে যাবে... সেদিন আমার ভালো লাগবে... আমি সুনীল-বরুনার গল্প শুনতে চাই না... তবুও কেন যেন গল্পচিত্র চোখে পড়ে যায়। জলফড়িং এর জ্যামিতিক দিগ্ববিদিক ছোটাছুটি চোখে পড়ে যায়!

এর পর কিছুটা সময় ধানমন্ডির রাস্তায় কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করেছি... চলার পথে একটা হলদে রঙের ফুল দেখে থমকেও দাড়িয়েছিলাম... ফুলটার নাম জানিনা... নাম দিতেও আর ইচ্ছা করল না... মাথায় যে শুধুই জলফড়িং এর ছোটাছুটি!

বাসায় ফিরেছি সন্ধ্যায়। সাইন্সল্যাবের মোড়ে দুটো বাস নাকি কারা পুড়িয়ে দিয়েছে... তাই বাস বন্ধ। রিকশায় করে বিশাল লম্বা পথে হাওয়া খেতে খেতে বাসায় ফিরে এসেছি। সমস্ত পথ জুড়ে মাথায় ছিল শুধুই জলফড়িং এর ছোটাছুটি! তার মাঝেও একটা কথা চোখে পড়েছিল... ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের সামনে লেখা ছিল... “সাহস অনেক কিছু বদলে দেয়।”

ঘরে ফিরে খুব ক্লান্ত... ঘুমিয়ে পড়েছিলাম... ঘুম ভাঙলো মেসেজ আসার শব্দে... মেসেজ পাঠিয়েছে আমারই বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছরের ছোট এক ভাই... “আপু, কিছু ভালো লাগে না। মন খারাপ।”...
মাথার ব্যথাটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল... জলফড়িং এর ছোটাছুটি!