০১
চারপাশে ঘন অরণ্য। এখান থেকে আড়াই মাইলের মধ্যে কোন মানুষের বসবাস নেই। একেবারেই নির্জন জায়গাটা। শব্দ বলতে পাখির কিচিরমিচির। আশে পাশের গাছে মাঝে মাঝে কিছু বানরের দেখা মেলে। কাঠবিড়ালির ও দেখা মিলেছে। মাত্র দুদিন হল এইখানে এসেছে অরিত্র। একটা ছোট টিলার উপর তার তাঁবুটা। একমাসের খোরাক নিয়েই এসেছে সাথে করে। আসার সময় পথে যে আদিবাসী বসতি চোখে পড়েছে, সেখান থেকেই খাবার পানি নিয়ে এসেছে। ফুরিয়ে গেলে আবার আনা যাবে। আড়াই মাইল, বেশী তো দূরে না। ধারে কাছেই নাকি একটা নদী আছে। ভীষন খরস্রোতা। আগামীকালই ঐটা দেখতে যাবে ঠিক করল সে। এখন বিকাল বেলা। সন্ধ্যা পর্যন্ত অরিত্র এখানে বসে থাকবে। তারপর আর তাবুর বাইরে থাকা ঠিক হবে না। বাঁশিটা বাজানোর জন্য ঠোঁটের কাছে তুলে নিল সে। একসময় সুরের মাঝে মগ্ন হয়ে গেল। এই মূহুর্তে তার বাশির সুর আর কিছু কিচিরমিচির ছাড়া কোন শব্দ নেই আসে পাশে। অবশ্য, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই কিচিরমিচির বেড়ে যাবে। এসবের জন্যই তো এখানে আসা। লোকালয়ের ব্যস্ততায় অস্থির হয়ে গেলে মাঝে মাঝেই এমন অজ্ঞাতবাস নেয় সে। এখানে কোন টেলিফোন নেটওয়ার্ক নেই। এইটা একদিক থেকে ভালো হয়েছে। না হয় মা দিনে কম করে হলেও দুইবার ফোন করত আর চলে আয়, চলে আয় বলে ঘ্যান ঘ্যান করত। অরিত্রের মায়ের ধারনা, তার ছেলেটা পাগল। তার বাবার চেয়েও বেশী পাগলাটে। সেও মাঝে মাঝে অদ্ভুত কিছু পাগলামি করে, কিন্তু ছেলেটার পাগলামি অতিরিক্ত। একটা বিয়ে দিয়ে দিতে পারলে পাগলামি কিছুটা কমলেও কমতে পারে। মায়ের টান তো বোঝেই না, মায়ের অস্থিরতাও বোঝে না। বউ যদি একটু দেখেশুনে রাখতে পারে। কিন্তু ছেলেটাই তো বোঝে না সে কথা। সে যে কি করবে এই ছন্নছাড়া ছেলেকে নিয়ে। অরিত্র মনে মনে হাসে। বাঁশি থামিয়ে দিয়েছে। এখন পাখিদের ফেরার সময়। ঐযে, তাদের কুচকাওয়াজ শুরু হয়ে গেছে। ভালো লাগায় চখ বন্ধ করে রেখেছে সে। হঠাৎ চমকে গেলো অরিত্র।
চারপাশে তো কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু মনে হল যে, জংগলের মধ্যে কারোর পায়ের শব্দ! তাহলে কি ভুল শুনলো সে? খুব বেশী দূরে হলে তো তার শুনতে পাওয়ার কথা না। হলে কাছেই হবে। কিন্তু কোথায় কে? কেউ তো নেই। ঐ তো আবার শোনা গেল। পূর্ব দিকে না? অরিত্র ঊঠল, দেখা দরকার। কেউ যদি তার নির্জনতা ভাঙ্গায় তাহলে মনে মনে বিরক্তই হবে সে, কালই তাবু গুটিয়ে ঢাকায় ফিরে যাবে। আস্তে আস্তে টিলা থেকে নেমে এল। টিলার উপরে কেউ নেই। নাহ, এখনো কাউকে দেখা যাচ্ছে না। সন্ধ্যাও তো নেমে আসছে।
০২
সকালে নদীটার খোঁজে গিয়েছিল। আসলেই ভীষন খরস্রোতা। এই নদীতে নামা ঠিক হবে না। নামলেও বেশী ভিতরের দিকে যাওয়া বিপদ জনক। ওইখানেই গোসল সেরে নিল। এসে থেকে এই সুযোগটা পায়নি সে। এখন স্বস্তি পাচ্ছে সে। বেশ খানিকটা ঘুরলো আজ। ক্লান্ত হয়ে বিকালের দিকে ফিরে এলো তাঁবুতে। কি করবে এখন? বই পড়বে নাকি গতকালের মত বাঁশি নিয়ে ধ্যানস্থ হয়ে যাবে। বাঁশিটাই নিল। হঠাৎ বাঁশি থামিয়ে দিল। আজো তার মনে হচ্ছে আশে পাশে কেউ আছে। ঐযে, গাছের আড়ালে একটু পোশাকের প্রান্ত দেখা যাচ্ছে না! আকাশি রঙের। তাড়াতাড়ি উঠেই দৌড়ে গেল সেদিকে। আরে, একটা মেয়েতো! দৌড়ে টিলার নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। নিচে নেমে দেখে কেউ নেই। আশ্চর্য! জলজ্যান্ত একটা মেয়ে এভাবে হাওয়া হয়ে গেল? বেশী তো দূরত্ব ছিল না। মাত্র কিছুক্ষণের জন্য না চোখের আড়াল হয়েছিল! আর সে এভাবে পালালোই বা কেন? না, ব্যাপারটা কি জানতে হবে। পালিয়ে গেলই বা কোথায়? কেমন রহস্য রহস্য লাগছে। সবচেয়ে বেশী অবাক লাগছে, এত দ্রুত চোখ ফাঁকি দিয়ে কিভাবে পালালো মেয়েটা। মুখটাই তো দেখতে পারলো না। কেবল পিঠ ছড়ানো রেশমী কাল চুল আর আকাশি রঙের স্কার্ট! এইখানে কাউকে এমন পোষাক পরা দেখতে পাওয়ার কথা না! কাল পুরোপুরি সতর্ক থাকতে হবে।
নিরাশ হয়ে তাবুতে ফিরে এল অরিত্র। কিন্তু উত্তেজনায় আর কিছুই করতে পারছে না সে। অনেক বই এনেছে আসার সময়। কাল রাতে যেটা পড়তে শুরু করেছিল, সেটাই হাতে নিল। কিছুই পড়া হচ্ছে না। মাথায় ঘুরছে, কি হল ব্যাপারটা? সে অশরীরী বিশ্বাস করে না, তারমত এতো লেখাপড়া জানা একটা আধুনিক ছেলের কাছে এটা কোনভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। আর যদি করতও, তবু এমন সাঁঝের বেলায়? রাত হলে না হয় আলাদা কথা ছিল। আরেকটা জিনিশ খেয়াল করেছে সে, দুইদিন এ ঠিক একি সময়ে ঘটল ব্যাপারটা। পায়ের শব্দ। প্রথম দিনও নিশ্চয় এই মেয়েটাই ছিল। কে সে? কোথায় থাকে? এখানে কেন আসে? কিভাবে আসে? হঠাৎ করেই পায়ের শব্দটা পাওয়া যায়। এখানে আসতে হলেও তো কোন না কোন পথে তাকে আসতে হয়। তাহলে তো হঠাৎ করে পায়ের শব্দ শুনতে পাওয়ার কথা না। তাকে জানতেই হবে ব্যাপারটা কি...
০৩
অরিত্র বসে আছে বাঁশি হাতে... আজ সে বাজাচ্ছে না। মন তো এখন অন্য খেয়ালে। অরিত্রের উত্তেজনা দেখে মনে হয় গাছ আর গাছের বানরগুলোও মজা পাচ্ছে। কিন্তু সেদিকে কি আজ তার খেয়াল আছে! তার যেন আজ মূহুর্ত কাটে না... সময় যাচ্ছে বড় ধীরে... অরিত্র শুধু একটু পর পর এদিক ওদিক তাকায়। একসময় তার মনে হয়, ঠিক তার পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে কেউ। যাকে সে এদিক ওদিক খুঁজছে, সে ঠিক তার পিছনে এসে দাঁড়িয়ে যাবে! ব্যাপারটা কেমন হাস্যকর হয়ে গেল না? তবু ধীরে ধীরে ঘুরল অরিত্র... চোখ এবার আসলেই ছানাবড়া! মেয়েটা সত্যি দাঁড়িয়ে আছে, শুধু দাঁড়িয়ে না, হাসছেও! চোখের তারায় কৌতুহল আর হাসি, দুটোই।
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কোন মতে অরিত্র জিজ্ঞেস করে, “কে আপনি?”
-“নক্ষত্র, তারা বলে ডাকতে পারেন।” অকম্পিত স্থির উত্তর।
-“ডাকতে পারি মানে? আসলে আপনি কে?”
মেয়েটা হাসে, “তারা।”
-“কোথা থেকে এসেছেন? কেন এসেছেন? কোথায় থাকেন? অনেক গুলো প্রশ্ন একসাথে করে ফেলল সে। অরিত্রের মস্তিস্কের উত্তাপ দেখে তারা এবার খিলখিল করে হেসে ফেলল।
তারপর বলল, “এখানেই থাকি, এখান থেকেই এসেছি, আমি একজন মানুষ এবং এই মুহুর্তে আপনার কাছেই এসেছি, কাল ও আমি আপনার কাছেই এসেছিলাম, কিন্তু দেখা দিতে চাই নি, তাই পালিয়ে গিয়েছিলাম”।
মেয়েটা এমন শান্ত কন্ঠে হাসতে হাসতে উত্তর দিচ্ছে, অরিত্রর নিজেকে বোকা বোকা লাগছে...
-“কেন এসেছেন আমার কাছে?”
এবার মেয়েটা কাছে এগিয়ে আসে, বাঁশির দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে শুধায়, “এটা কি?”
-“বাঁশি, আপনি চেনেন না!”
সে আরো বিভ্রান্ত হয়ে যায়, মেয়েটা এসে দাড়াবার আগে সবকিছু রহস্যময় লাগছিল, এখন দূর্বোধ্য লাগছে। তারা বুঝতে পারে ব্যাপারটা।
-“আমি বুঝতে পারছি, আপনি কি ভাবছেন। আসলে এমনটাই হওয়ার কথা। কিন্তু এতো ভেবে আসলে কোন লাভ নেই। আমার উপস্থিতি সম্পর্কে আমি যা জানি, তা যতক্ষন আমি আপনাকে না বলব, আপনি যা রহস্য ভাবছেন তার সমাধান করতে পারবেন না। আমি বাঁশির সুর শুনে থমকে গিয়েছিলাম, আপনার কাছ থেকেই এই সুরটা প্রথম শুনেছি। এজন্যেই আপনার কাছে আসা। নইলে আপনি আমাকে কোনভাবেই দেখতে পেতেন না, আমাকে শোনাবেন সুরটা?”
অরিত্র চোখ তুলে মেয়েটার দিকে তাকালো, শান্ত অথচ বুদ্ধিদীপ্ত ভঙ্গিমা, শ্যামলা মিষ্টি মেয়ে, বাঙ্গালী মেয়েদের সাথে অনেক মিল আছে, আবার অনেক মিল নেইও। কিন্তু ঠিক কোন অঞ্চলের সাথে মিল আছে, তাও বোঝা যাচ্ছে না। চোখদুটোতে কেমন সবুজাভ দীপ্তি আছে। বাঙ্গালী হলে এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। যত যাই কিছু হোক না কেন, মেয়েটা হাসে সুন্দর করে, তারচেয়েও বেশী সপ্রতিভ সে। বুঝল, তারা যা বলছে, তা হয়ত সত্যি। কিন্তু সে কি জানতে পারবে না, আসলে কি হচ্ছে? এটা ভাবতে ভাবতেই তারা বলে উঠল, “আমার যদি মনে হয়, আমার সম্পর্কে আপনি যা জানতে চান, তা আপনাকে বলা সম্ভব, আমি আপনাকে জানাবো”।
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল অরিত্রের ভিতর থেকে। গোয়েন্দাদের মত করে রহস্য বের করার উপায় যে তার নেই, এটুকু সে বুঝতে পারছে!
০৪
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে তারা বলে, “আমার যাবার সময় হয়ে এলো”।
উৎসুক চোখে তাকিয়ে থাকে অরিত্র।
“আপনি এভাবে তাকিয়ে থাকলে আমি যেতে পারবো না। আমি আবার আসবো”।
তারা হাসে। আবার আসবে শুনে অরিত্রও হাসে। আর তাকিয়ে থাকে না।
উপস্থিতিটুকু যেন আকাশে তারাবাজীর একবার ঝলসে উঠেই হারিয়ে যাওয়ার মত।
অরিত্রর নিজেকে বোকা বোকা লাগে।
০৫
তারা অরিত্রকে খুব বেশী বুঝে। কিছু বলার আগেই বুঝে যায় কি ভাবছে অরিত্র। অরিত্র অবাক হয়।
০৬
অরিত্র মনে মনে ভাবার চেষ্টা করে, নীল শাড়ি পড়লে কেমন লাগবে তারাকে? একটা অদ্ভুত অনুভূতি ছুঁয়ে যায় তাকে। কিন্তু তারা তো একটা জলজ্যান্ত রহস্য!
০৭
আজ পাঁচ দিন তারা আসে না বাঁশি শুনতে। অরিত্র অস্থির! অপেক্ষায় থাকে রোজ। তার যাওয়ার সময়ও তো ঘনিয়ে এলো। এভাবে বনে বাঁদারে আর কতদিন!
০৮
তারা এসেছে। খুব ভাল লাগতে থাকে অরিত্রর। মুখে বলে না সে কথা।
-“তারা, আমার নির্জনবাসের সময় প্রায় শেষ”।
-“শোনেন, আজ সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিব, যা জানতে চেয়েছিলেন”। অরিত্রের হৃদকম্পন বেড়ে গেছে।
-“আমি এখন, একবিংশ শতাব্দীতে আপনার পাশে বসে আছি। কিন্তু আমার জন্ম ৪৫৩২ সালে। আমি ঠিক এখানটাতেই থাকি। কিন্তু ছেচল্লিশ শতকে ঠিক এইখানটাতে কোন সবুজ নেই, কোন টিলা নেই। এখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা বিশাল অট্টালিকা, ওরই ২৩০ তলায় আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট। আমার ভাষায় আমার নাম সাওতা। আপনার ভাষায় এর অর্থ তারা। কিভাবে আমি এখানে আসি, সেটা কি আন্দাজ করতে পারছেন? আপনাদের সময়ে কিছু কল্পবিজ্ঞানী লেখক কল্পনায় এমন একসময় থেকে আরেক সময়ে যাওয়া আসার কথা ভেবেছিল। আমার জন্মের প্রায় পাঁচ শত বছর আগেই তা বাস্তব হয়ে গেছে।”
-“টাইম মেশিন!”
-“আমার হাত ঘড়িটা আসলে একটা টাইম মেশিন। ওটাতে যে যে সময় দেয়া হবে, সেই সময়েই এটা আমাদেরকে নিয়ে যাবে।”
-“কিন্তু কিভাবে সম্ভব হল?”
-“আমাদের যুগটা হল স্পেক্ট্রনিক যুগ। ইলেক্ট্রনিক যুগকে মানুষ অনেক আগেই পাড়ি দিয়ে ফেলেছে। আপনি যেহেতু সেসব কথা জানেন না, আপনাকে বলছি, পঁয়ত্রিশ শতকেই মানুষ ইলেক্ট্রনকে ভেঙ্গে ফেলেছিল, ইলেক্ট্রা আর স্পেক্ট্রা নামে দুইটা অংশে। ইলেক্ট্রা হল ইলেক্ট্রনের মূল ভর , আর স্পেক্ট্রা হল শক্তি। ইলেক্ট্রা এবং স্পেক্ট্রাকে একটা থেকে আরেকটাতে বদলে ফেলা যায়। প্রথম দিকে ব্যাপারটা বেশ কঠিন ছিল। কিন্তু একবার ইলেক্ট্রনকে ভেঙ্গে ফেলার পরই এটা হয়ে গিয়েছিল একটা চার্জবিহীন ভর। একে দিনের পর দিন আর ক্ষুদ্র অংশে ভাঙ্গা সম্ভব হয়েছে। যত ক্ষুদ্র করা সম্ভব হয়েছে, তত বেশী বেগ অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। এভাবেই একসময় মানুষ পদার্থে আলোর সমান গতি দিতে সক্ষম হয়। তার পর একেও অতিক্রম করে ফেলে একসময়। আর তাতেই সম্ভব হয়েছে এই বিদঘুটে যন্ত্র টাইম মেশিন আবিস্কার।”
-“বিদঘুটে কেন?”
-এটার কারণেই আমি জেনেছি, আগের পৃথিবী কত সুন্দর ছিল আর ভবিষ্যতের পৃথিবী কত অসুন্দর। আমরা এখন দেশদেশান্তরে, গ্রহ গ্রহান্তরে না, সময় সময়ান্তরে ভ্রমন করি। আমাদের কোন আলাদা দেশ নেই আপনাদের মত। সবাই মিলে একটা পৃথিবীতে বাস করি। আর প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে প্রযুক্তির অভিশাপের বিরুদ্ধে কাজ করি। কিন্তু আমরা কেউই কখনও অতীতে এসে বাস করি না। কারন আমার সময়ের জন্য যা প্রযুক্তির সুবিধা ঠিক দুই শতক আগে সেই সুবিধা যদি মানুষ পেত, তাহলে পৃথিবীটা আর দ্রুত নষ্ট হয়ে যেত। হয়ত, আমার জন্ম পর্যন্তই পৃথিবী বেঁচে থাকত। এই আমি স্ব্য়ং, একবিংশ শতাব্দীর জন্য একটা অভিশাপ। আজকের আগ পর্যন্ত ছিলাম না। আজ আমি যখন আপনাকে আমার সব রহস্য জানিয়ে দিচ্ছি তখন থেকে অভিশাপ হয়ে গেলাম। আমি যা বলছি, তা আপনাদের চিন্তার স্বাভাবিকতার জন্য ক্ষতিকর।”
“আমার কর্মক্ষেত্র আসলে উনপঞ্চাশ শতকে, আপনারা যেমন একদেশের মানুষ বিপদে পড়লে, প্রয়োজনে আরেকদেশ থেকে গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতেন, তেমনি, আমরা উনপঞ্চাশ শতকের ভগ্নাবশেষ থেকে কিছু মৃতপ্রায় মানুষকে বাঁচাতে চেষ্টা করছি। কিন্তু আমাকে আমার সময়ই পয়তাল্লিশ শতকে গিয়ে এখন নীরবে পর্যবেক্ষন করা ছাড়া আর কোন কাজ করার অনুমতি দেবে না। এটা আমাদের নীতি বিরোধী”।
-“তাহলে আপনি আসলেন কি করে এখানে?”
-“আমিতো সময়ান্তরে ঘুরি অতীত থেকে শেখার জন্য। পৃথিবীটা কে আরেকটু বেশীদিন বাঁচানোর জন্য আমাদের শিখতেই হবে। কিন্তু আপনাকে এসব বলার কথা ছিল না আমার। আমি আমার নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে বলছি।”
-“তাহলে কেন বললেন?”
তারা চুপ করি তাকিয়ে থাকে অরিত্রের দিকে। “আমি জেনে গেছি, আপনি কি ভাবছিলেন। আমার মস্তিস্কে একটা ব্রেইন ফ্রিকয়েন্সি ট্রান্সলেটর বসানো আছে। যুগযুগান্তরের এতো ভাষা আয়ত্ত করা তো সম্ভব না, তাই আমরা ওইটা ব্যাবহার করি অন্য যুগের মানুষের চিন্তা বোঝার জন্য। এটাকে বলতে পারেন থট রিডার। সরাসরি প্রত্যেকটা অনুভূতির কারণে যে ব্রেইন ফ্রিকয়েন্সি তৈরী হয় মস্তিস্কে, তাই বিশ্লেষন করে। আমি যে আপনার সাথে আপনার ভাষায় কথা বলছি, আসলে ওই যন্ত্রটা যেমন আপনার চিন্তাকে জানিয়ে দিচ্ছে আমাকে, তেমনি আমার চিন্তাকে আপনার ভাষায় অনুবাদও করে দিচ্ছে। ”
অরিত্র কি বলবে বুঝে পায় না। ও ভাবে, “তারা সব জানে। তারা কি পারেনা, ওর সময় ছেড়ে আমার সময়ে এসে থাকতে?”
এই ভাবনার উত্তর তারা দিয়ে দেয়। “না পারিনা। আমার সময়, নীতি, পেশা কিছুই আমাকে একবিংশ শতাব্দী তে আসার অনুমতি দেয় না। এমন কি, আমি আপনাকেও আমার সময়ে নিয়ে যেতে পারি না।”
ছোট্ট করে শুধায় অরিত্র, “কেন?”
-“ঐ কুৎসিত পৃথিবীতে আপনি বাঁচতে পারবেন না। আপনার বাঁশির সুর ও আর বাজবে না”। তারার দু চোখ ছলছল করছে। তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ায় তারা। বলে, “আসি।”
তারপর, এই প্রথমবারের মত, অরিত্রের সামনেই টাইম মেশিনে সময় ঠিক করে ঊধাও হয়ে যায় সে। আর অরিত্র... নিশ্চুপ বসে থাকে।
০৯
তারার কথা মনে পড়ে অরিত্রের, সবসময় মনে পড়ে। রাতের আকাশে দিকে তাকিয়ে থাকে অরিত্র। মনে হয়, তারাগুলো যেন তারা হয়ে হাতছানি দিয়ে ডাকছে তাকে। নাকি সেই তারাকে ডাকছে! ছেচল্লিশ শতক আসলেই তার কাছে অভিশাপ। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করে অরিত্রর।