মাউথ অরগানটার সুর আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায়। আশেপাশে কোন বাড়িতে অজানা কেউ বুঝি বাজাচ্ছিল, হয়ত সে অজানা নয়, কিন্তু কে সে জানে না নির্জনা। জানার কোন ইচ্ছাও কাজ করেনা, সুরস্রষ্টা নয়, সুরটা তাকে ছুঁয়ে গেল। মনে হচ্ছিল সুরটা বুঝি তারই জন্য, কখনও ঝর্ণার মত উচ্ছল, উচ্ছলতার শেষে এক নির্জনা সে, রাতির মত শান্ত, নিকষ অন্ধকার সেখানে... সেই গভীর অন্ধকারের মাঝে আনন্দ আছে না কষ্ট আছে, উচ্ছল ঝর্ণার চোখে এখন জোৎস্না নাকি আরেকটি ঝর্ণা, কেউ দেখতে পায় না তা। মাস ছয়েক আগেও নির্জনার যখন ঘুম আসতো না, তখন চারপাশে নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে একটা বাঁশির সুর বেজে উঠতো... সেই বাঁশিওলা বুঝি চলে গেছে অন্য কোথাও, অনেকদিন শোনেনা সেই বাঁশির সুর। যখন হলে থাকতো সে, জানালার পিছনে ছিল অনেকগুলো আম-কাঁঠালের গাছ, তাতে রাজ্যের পাখিরা ভর করে ছিল, মাঝরাতে মাঝে মাঝে সব পাখি একসাথে ডেকে উঠতো, ঘুম ভেঙ্গে যেতো নির্জনার। কিছুক্ষন চুপ করে বসে থাকতো, তারপর বারান্দায় গিয়ে রেলিং এর উপর পা দুটো তুলে আকাশের দিকে চেয়ে থাকতো। কখনও সেখানে বিস্তৃত ছেড়া ছেড়া মেঘ, প্যাঁজা তুলোর মত ভেসে বেড়াচ্ছে, কখনো বা আকাশ ভরা তারা।
গতকাল রাতে অরণ্যকে লেখা একটা পুরোনো চিঠি হঠাৎ খুলে ফেলেছিল সে... তারপর বসে বসে সেই চিঠি পড়তে লাগলো... নির্জনার মনে হতে লাগলো... এমন স্রোতের মত ভাষায় সে চিঠি লিখতো! কি সুন্দর কথাগুলো! কত স্বপ্ন... কত আত্মবিশ্বাস চিঠিতে! কত শক্তিশালী কথা, “খুব সম্ভবত আমি আমার স্বপ্নের ব্যাপারে আপনার চেয়েও বেশী উন্মাদ।” এইভাবে কি এখন আর নির্জনা বলতে পারে? নিজেকে প্রশ্ন করে সে... ভিতর থেকে উত্তর আসে না... মনের ভিতরে যে লু্কানো মনটা তার সাথে কথা বলত, সে হারিয়ে গেছে। বাইরের কেউ না... হারিয়ে গেছে ভিতরের কিছু একটা অথবা সেই মনটা এখন বধির হয়ে গেছে। কোন প্রশ্ন তাকে আর আলোড়িত করে না। কি ছিল স্বপ্নগুলো, চিঠি পড়ে বুঝার চেষ্টা করে নির্জনা। একটা দেশ, সেই দেশটার জন্য এতোদিনেও কিছু করতে না পারার যন্ত্রনা, একটা পতাকা কে উর্ধে তুলে ধরার স্বপ্ন,একজন অরণ্য, অরণ্যের স্বপ্নগুলো আপন করে নেয়া, সেই স্বপ্নগুলোর জন্য যেকোন কিছু করতে চাওয়ার মত মানসিক দৃঢ়তা!
আজ নির্জনার মনে হচ্ছে, ঐ চিঠিটা তার লেখা না, এক দুঃসাহসী মেয়ের লেখা! সেই মেয়েটাকে আজ এখন এই নির্জন দুপুরে আরেকবার দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে...
সেই অরণ্য, যার স্বপ্নের পাশে থাকার সবটুকু চেষ্টা করেও একদিন নির্জনার মনে হয়েছিল, সে পারেনি... সে পারেনা, নিজেকে সেদিন খুব ব্যর্থ একজন মানুষ মনে হয়েছিল তার। আজ অনেক দিন পর সে জেনেছে, সে স্বপ্নের চোখেও স্বপ্ন আঁকতে পেরেছিল। আজ তার চোখে জল, অরণ্যের জন্য নয়, মনের মাঝে লুকিয়ে থাকা মনটার জন্য, সাহসী মেয়েটার স্বাপ্নিক চোখের জন্য।
অরণ্য তার কানে ফিসফিসিয়ে বলেছে, নির্জন অরণ্যের নির্জনতা ভেঙ্গে প্রানের সুর লহরীর কথা। নির্জনা মনে মনে বলে, আমার চোখ দুটোকে ক্যানভাস ভেবে তাতে ইচ্ছেমত স্বপ্ন একে দাও। কিভাবে স্বপ্ন দেখতে হয়... এবার আমাকে তাই শেখাও। ছোট্টোবেলায় যেমনি করে ঘুড়ি উড়াতে আর ভাবতে, আমার ঘুড়িটা একদিন সবচেয়ে উঁচুতে উঠবে, নাহয় এবার সেই স্বপ্নটাই দেখতে শেখাও।
চপলা নির্জনা ভাবে, একদিন পৃথিবীটা অরণ্যময় হয়ে উঠবে। ঘন মেঘের আড়ালে একটুখানি আলোর আভা। সমস্ত পৃথিবীতে সে এবার অরণ্যের বীজ বুনে দেবে...
ফেব্রুয়ারী ৩, ২০১০।