Monday, March 28, 2011

এবার তোরা মানুষ হ!

বছর ছয়েক আগে পড়েছিলাম, বাণী বসুর লেখা “মৈত্রেয় জাতক”। একবার নয়, একাধিক বার, বারবার পড়েছি। কেন? সেখানে এক ঐতিহাসিক সময়ের উন্মেষ, একটি ধর্মের উন্মেষ, একটি দর্শনের উন্মেষ, কয়েকটি ব্যক্তিত্বের উন্মেষ… শিল্পের উন্মেষ, স্থাপত্যের উন্মেষ আর সবশেষে একটি মানবিক বিপ্লবের উন্মেষ। আর এই সবকিছুর সাথেই সমান্তরালে চলেছে নারীর জীবনের স্বরূপ। আড়াই হাজার বছর আগে, যীশুর জন্মের আগে, মুহাম্মদের জন্মের আগে, বুদ্ধকালীন সময়ের চলচিত্র। নাগরিক জীবনের বাইরের চিত্র… গভীর জঙ্গলে বাস করে একদল মানুষ, কৃষ্ণবর্ণের শরীর, নগ্ন নরনারী। নাগরিকেরা তাদের মানুষ ভাবে না, তারা নিষাদ! বন্য ফল-মূল আর পশুর মাংশ তাদের আহার… রাতের বেলায় দ্রিম দ্রিম বাদ্যের শব্দ, রগগা নামের নিষাদ রমনীর বন্য হরিণীর মত প্রণয়ীর কাছে ছুটে চলা… এইসব মিলে যেন অদ্ভুত এক জগত! পোষাক নামের আচ্ছাদন যেমন তাদের স্পর্শ করেনি, তেমনি তাদের মনও সরল, অনাচ্ছাদিত। বনফুলের সাজের মতই তারা প্রকৃতির বুকের অলংকার!

জঙ্গলের বাইরে আছে নগর, সেখানে আছে যুদ্ধ, চক্রবর্তী রাজা হবার বাসনা, ক্ষত্রিয়ের অস্ত্রের ঝংকার, ব্রাহ্মণের মন্ত্র, শূদ্রের জীবন, শ্রেষ্ঠীর জয়জয়াকার! আর তারই মাঝে বুদ্ধের উদ্ভব… নব ধর্মের দীক্ষা নিয়ে। বৌদ্ধ ধর্ম গৃহীরও, বৌদ্ধ ধর্ম সন্যাসীরও। বুদ্ধ সবার… তিনি দার্শনিক, বোধিপ্রাপ্ত। তাকে দেখলেই ভাবের সৃষ্টি হয়। ঈশ্বর নেই তবে অষ্টমার্গ, পঞ্চমার্গ… এইসব আছে তার অনুসারীদের জন্য। আছে বিহার, আছে ভিক্ষান্নজীবি ভিক্ষুর দল। সাধে কি বলে, উপমহাদেশের মাটিতে আধ্যত্মিকতার বীজ পোতা। এইখানে শিক্ষা নেই, তবে আধ্যাত্মিকতা ঠিকই আছে। আধ্যাত্মিক হবার জন্য এইখানে অক্ষর জ্ঞানেরও প্রয়োজন হয়না।

এইসবের মাঝে কোথায় নারী? অন্তঃপুরে, অন্দর মহলে। বাইরে বেরুতে তাদের অবগুন্ঠন লাগে না হয়তো, তবে বাঁচার অধিকার নেই কোনভাবেই। জন্ম, রূপ, যৌবন, জীবন… সবই পুরুষের জন্য। খাও, ঘুমাও, সন্তানের জন্ম দাও, গৃহপতির সেবা কর … এইটুকুই অস্তিত্ব তার। এর বাইরে যাবার দুটমাত্র পথ খোলা, অতিসুন্দরী, গুনবতী নারী হবে গণভোগ্যা গণিকা আর সংসার ত্যাগী নারী হবে ভিক্ষুনী! যে পিতা পুরুষের লালসার থাবা থেকে কন্যাকে রক্ষা করার উপায় খুঁজে পান না, তিনি কন্যাকে পাঠান বাধ্য সন্যাসব্রতে… সে হয় মহান ভিক্ষুনী। ভিক্ষুনীর জীবন বেঁছে না নিলে হয়ত তার ঠাঁই মিলত গণিকালয়ে। সেখানে রাজ্য তার কোষাগারের অর্থব্যয় করে তাকে গড়ে তুলত গণসেবায়, তাতে রাজ্যের বানিজ্য শক্তিশালী হয় বটে। সে হয়ে উঠত রূপে মোহময়ী, শিল্পে শিল্পিত। সে গানের পাখি, নাচের ছন্দ, আঁকিয়ের রংতুলি, কবির কাব্য সবকিছু। সে স্বাধীন, সে স্বতন্ত্র, রাজপ্রাসাদের অন্তঃপুরের নারীদের চেয়ে তার জীবন অনন্য। সে হাসে গোলাপের মত, সে চৌষট্টি কলায় সুশিক্ষিতা! শিল্প সাধারনের জন্য নয়, শিল্পে অধিকার কেবল তাদের। সাথে আছে কিছু ব্যক্তিত্ব্যহীন রাজগুনগ্রাহী কবির দল। শিল্প সত্যিই এখানে রমনীয়!
আর নয় “মৈত্রেয় জাতক” এর কথা, বইটা থেকে নিলাম কেবল সেইসমাজের ছবিটা। “মৈত্রেয় জাতক” এর কথা আরো লিখতে হলে লিখতাম রাজা বিম্বিসারের কথা, গূঢ় পুরুষ অথবা তক্ষশিলার স্নাতক কূটনীতিবিদ চণকের কথা, বিদুষী নটী জিতসোমার কথা কিংবা বৌদ্ধ ইতিহাসের সুপরিচিত নাম বিশাখার কথা। আমি লিখছি নারীর কথা, শিল্পের কথা, অতীত বাস্তবতার কথা আর শুধাবো বর্তমানের কথা।

কোথায় সভ্যতা? অসভ্য নিষাদদের মাঝেও তো নারীর স্বাধীনতা ছিল, ছিল বনময় চপলা হরিণীর মত ঘুরে বেড়াবার স্বাধীনতা, শিকার করা পশুর মাংস ভক্ষনের উৎসবে নেচে গেয়ে আনন্দে মেতে ওঠার স্বাধীনতা। সেটুকুই কি দিয়েছে আমাদের সভ্যতা? রাজপথে নির্ভয়ে চলার স্বাধীনতা কি আমরা দিয়েছি তাকে? স্বাধীনতা হরণেই কি সভ্যতার মাহাত্ম্য? বুদ্ধ নারীকে সন্যাসব্রতে গ্রহন করে দিয়েছিলেন পালিয়ে বাঁচার অধিকারটুকু। জীবনের অধিকারই যেখানে নেই, অ্যাধাত্মিক মুক্তি সেখানে পালিয়ে বাঁচার পথ ছাড়া আর কিইবা দিতে পারে? নারীর নিজের ঘর নেই, তার হাতে পায়ে সংসারের শিকল বাঁধতে না পারলে একালেও বাবা-মায়ের সম্মানটুকুও তো থাকে না। আজো নারী শ্বাস নেয় অন্তঃপুরে, তার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন ভালবাসাও নয়, কেবল সন্তান জন্মদানে। আবেগ বা ভালবাসার মত মানবিক ব্যাপারগুলোকে সমাজ শেখেনি আজও মূল্য দিতে। বহুগামিতার মত ব্যাপারগুলো সামাজিক নৈতিকতার চোখ এড়িয়ে যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, কিন্তু অবগুন্ঠিত স্ত্রীর বাধ্যসেবার দাবীতে ছাড় দিতে কেউই রাজি না। শিশুকাল থেকেই কন্যাকেও গড়ে তোলা হয়, নারী মানেই পতিভক্ত, সুকন্যা, সুগৃহিণী, সুমাতা। কিন্তু যে পাত্রে কন্যাদান করে নিশ্চিন্ত হতে চান বাবা-মা, তাকে জীবনসংগী হিসেবে গ্রহণ করতে সে চায় কিনা, সে প্রশ্ন করতে ভুলে যেতেও আপত্তি নেই আমাদের সভ্যসমাজের। ব্যাপারটা শুধু একতরফাভাবে মেয়েদের ক্ষেত্রেই সত্যি না, সত্যি অনেক ছেলের ক্ষেত্রেও… বিয়ের মত ব্যাপারটা গুরুজনের পছন্দে করলেই হবে, জীবন যাদের তাদের কিসের এতো মাথা ব্যথা? গুরুজনেরা যা করেন তা তো ভালোর জন্যই করেন, তাই না? বিয়ে তো বিয়েই, পাত্র-পাত্রী তপেশ-মিলি না মহেশ-মিলি, ব্যাপার না সেটা। সন্তানের জন্য সংগী বাছাই করে দেবার গুরু দ্বায়িত্ব গুরুজনেরা নিয়েই খুশি, এর সাথে জড়িত অজস্র পারিবারিক-সামাজিক অস্থিরতার খবর রাখার দ্বায়িত্ব তাদের না। বিয়েটা ইচ্ছাই হচ্ছে না অনিচ্ছাই, কন্যা কিশোরী না বালিকা এইসব কোন ব্যাপারই না। প্রশ্ন শেষপর্যন্ত একটাই, এইভাবে বেধে দেয়া যুগলেরা কজন হয়ে ওঠে সুখ-দুঃখ-আনন্দ-ভালোবাসার সংগী নাকি কেবলই যৌনসংগী? যে কিশোরী বুঝতেই পারেনি, তাকে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়েছে, ১২ হাত লম্বা লাল টুকটুকে শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে স্কুলের বই ছেড়ে, কানামাছি ছেড়ে এখন তাকে সংসারে পা রাখতে হবে, তাকে হতে হবে আরেকটা জীবনের সংগী, এই অবিশ্বাস্য বাস্তবতায় মানবতা কতখানি? মানুষ কি এইভাবে হাজার হাজার বছর ধরে ভালবাসা-মায়া মমতার বদলে করে যাবে কেবল সামাজিক প্রথা আর যৌনতার পূজা?
আমরা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্যকলা শিখি, নাট্যতত্ত্ব পড়ি, কিন্তু নারীকে আজো নাচানো হয়। গণিকালয়ের বন্দীশালা থেকে শিল্প মুক্তি পেলেও নারী মুক্তি পায়নি পুরুষের লালসার বৃত্ত থেকে। রাস্তার পাশের বিলবোর্ড থেকে ঘর পর্যন্ত, নারী সর্বত্রই রমনীয়। নাচের মঞ্চে নারীকেই চাই, নারী তো অপ্সরী! নৃত্য শিল্প কিনা এ বিচার পরে, নারী যে রূপসী, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। বিজ্ঞাপনে নারীকেই চাই, নারী যে পণ্যের উপমা। অবগুন্ঠনের আড়ালেও নারীর রূপ যৌবনেরই খেলা। যে নারী আজ পিতৃগৃহে, পতিগৃহে বা ঘরের বাইরে নাচতে রাজি না হবে, তার জন্য আজ ভিক্ষুণীর জীবনের পথটুকুও খোলা নেই। যে খাদ্যে স্বাদ আছে, তা না চেখে নষ্ট করা যায়? তাই কি হয় নাকি? মেয়েমানুষ বলে কথা! এই মেয়েমানুষেরাই বা কতটুকু চায় মানুষ হতে? জীবন যে আরো অনেক অনেক সম্ভাবনার পথ, সে কি কোনদিন তাকে জানতে দেয়া হয়? আমাদের ইতিহাসে বেগম রোকেয়া আছে, তিনি কি এখন নারী সংগ্রামের অর্জন নাকি পুরুষ শাষিত সমাজের অমানবিকতার অভিযোগ-মুক্তিতে ব্যবহৃত যুক্তির হাতিয়ার?

আড়াই হাজার বছর কেন, তারও আগেও পুরুষমানুষ পুরুষমানুষই ছিল, মেয়েমানুষ মেয়েমানুষই ছিল, মানব সমাজ আসলে এমনই শ্বাপদের জঙ্গল। মেয়েমানুষ বলে যারা আজ তাচ্ছিল্যের পাত্র, বৈষম্যের শিকার, তারা কতটা ঘৃণাভরে পুরুষের দিকে আঙ্গুল তুলছে, সে পুরুষেরা বুঝলে এটাও বুঝতো, “নারী” ও “পুরুষ”, মানব প্রজাতির দুইটি ভিন্ন লিংগ নির্দেশক শব্দ নয়, মানব মর্যাদাচ্যুত দুইটি তুচ্ছার্থে ব্যবহৃত শব্দ! এইসব তুচ্ছার্থে ব্যবহৃত লিঙ্গবাচক শব্দের অবমাননা থেকে মানবতা মুক্তি পাবে কবে?

প্রকাশঃ মুক্তমনা, ২৩ জানুয়ারি, ২০১১ 


Sunday, March 27, 2011

কেউ জানেনি

আমি কষ্ট দিতে জানি;
অনেকের চেয়ে বেশী তীব্র স্বরে;
স্বরের সে তীব্রতার পিছনে,
এক সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে,
কেউ তা জানেনি।


সবাই নির্দ্বিধায় বলে আমি ক্ষ্যাপাটে জেদী,
অনেকের মাঝে এক আগুনে পাখি;
আমি কেবল উচ্চারণ করতে জানি, ভালোবাসি।


কেউ জানেনি, আমার সব অহংকারের মাঝে তুমি।


Saturday, March 26, 2011

ফিনিক্স পাখির রহস্য!

আমার জীবনের একটা অতিলৌকিক গল্প এতোদিন লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল। আমার উজ্জ্বল কৈশোরে, সে বেলায় আমার বোঝার সাধ্য ছিল না, কি ঘটেছিল আসলে। আমি আজ তাই লিখতে বসলাম, গল্প লিখতে নয়, ক্ষুদ্র আত্মকথা নয়, কেবল রহস্যময় একটা ঘটনাকে লিপিবদ্ধ করে রাখতে। 

আমার শৈশব কৈশোর ছিল অসাধারণ সুন্দর। বাবা মায়ের প্রথম সন্তান, তাই স্নেহে মমতায় ভালোবাসায় কোন কমতি ছিল না। একটুকরো স্বপ্নের মত সাজিয়ে বড় করেছিল আমাকে। কিন্তু যেকারণেই হোক আমার মানসিকতা অন্য দশটা বাচ্চার মত বাড়েনি। আমার শৈশবে কেটেছে লজ্জাবতীর পাতা ছূঁয়ে, ঘাষফুল কুড়িয়ে এবং পৃথিবীর মানুষগুলোকে কিছুটা পাশ কাটিয়ে। আমি স্কুলের বইয়ের অক্ষরগুলো আগে ভাগেই শিখেছি, পাতাঝরার দৃশ্য বা কচি পাতা গাছে আসার মুহূর্ত গুলো মনের ভেতরে গেঁথে নিতে খুব জলদি শিখেছি... কিন্তু আমার চারপাশের মানুষগুলোকে চিনিনি। এক্কেবারে সাদাখাতার মত শৈশব আমার যেখানে পেন্সিলের একটা আঁচড়ও নেই, আলোর মত দিন আমার, যেখানে আঁধারের লেশমাত্র নেই। সেই সাদাখাতার দিনলিপিতে একবার একটা স্বপ্ন জন্ম নিল, বড় কোন স্বপ্ন না, ক্যাডেট কলেজে পড়ার স্বপ্ন। স্কুলের পড়া ভালো লাগে না, তারচেয়ে কঠিন অঙ্ক করতে ভালো লাগে, সাধারণ জ্ঞানের বই পড়তে ভাল লাগে তা নয়, তবে কে বেশী পারে, জিকোর সাথে সেই প্রতিদ্বন্দীতায় নামতে ভালো লাগে। অবশেষে পরীক্ষা দিলেম ভর্তির জন্য, লিখিত মৌখিক, স্বাস্থ্যপরীক্ষা সব কিছু দিয়ে আমি প্রায় নিশ্চিন্ত ছিলাম, আর কদিন পরেই আমি ক্যাডেট কলেজে পড়তে চলে যাচ্ছি। সেইসময় জানলাম, ক্যাডেট কলেজের মত মামুলি একটা স্কুলের ভর্তি পরীক্ষাতেও যোগ্য হলেই হয় না, সহপ্রার্থীদের অনৈতিক বাবা মায়ের সাথেও লড়তে হয়। এবং আমি তাদের সামনে দাঁড়াতে পারিনি। আমি তো ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, বাবাকে দিয়ে ভর্তির সুপারিশের নয়। আমার ১২ বছরের মনটার উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গিয়েছিল সেদিন। মানুষটা আমি ছোট্ট ছিলেম, স্বপ্নটাও ছোট্টই ছিল... কিন্তু ছোট্ট মনে স্বপ্নভঙ্গের আঘাত মোটেও ছোট ছিল না। কান্না সামলাতে পারতাম না। পৃথিবীটা যে আমার নিজস্ব জগতের মত সুন্দর নয়, সেই আমি প্রথম জেনেছি। কিন্তু অসুন্দর পৃথিবীকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারিনি।  সেই বিষাদ লাগা দিনে, একরাতে স্বপ্ন দেখলাম, কোন এক দৈব কন্ঠস্বরের, কে যেনো মোহময় কন্ঠে আমায় বলে গিয়েছিল, কেবল চারটি লাইন। আমার ঘুম ভাঙ্গে সেই চারটি লাইন মাথায় নিয়ে, মাকে বলি, বাবাকে বলি... তারাও অবাক হয়, এইটুকুনি মেয়ের স্বপ্নে এসব কথা এলো কি করে, তাদের চোখে বিস্ময়, মনে সন্দেহ, তাদের ঈশ্বর আমাকে জীবনের নির্দেশনা দিতে শুরু করেছে কিনা। আমার বাবা মায়ের ঈশ্বর তখন আমারো ঈশ্বর, কিন্তু তবুও ঐ বয়সে আমার বোঝার সাধ্য ছিল না, ঈশ্বরের নির্দেশনা মানে কি। আমি নিজেকে নিয়ে কিছুটা রহস্যের মাঝেই চলে গিয়েছিলাম, নির্দেশনা হোক আর যাই হোক, কথাগুলো যেনো ভুলে না যাই, তাই আমি আমার স্কুলের সবকটা খাতার প্রথম পাতায় লিখে রেখেছিলাম...

দেহ পবিত্র,
মন পবিত্র, 
আত্মা পবিত্র, 
চারপাশ পবিত্র।

আমার আত্মা স্বত্তার গড়নে এই বাক্য চারটে সবসয়ম আমাকে বলেছে, আমায় কি করতে হবে, আর কি করতে হবে না। আমার স্বত্তার ভিত্তিভূমি যেন এই বাক্যগুলো। আমি আজ অব্দি এই মন্ত্র মনে রেখেছি। আজ অব্দি আমার জীবন কখনো এই মন্ত্রকে ছেড়ে যায় নি। 

যতকাল আমার ঈশ্বর ছিল, ততকাল, সাড়ে ১২ বছর বয়সে এই মন্ত্র পাওয়া আমার জন্য একটা বিস্ময় ছিল, আমার বাবা মায়ের মত আমারও সন্দেহ ছিল, এ কি ঈশ্বরের নির্দেশনা! আজ আমার ঈশ্বর নেই, আমি আজ জানি, ঐ কন্ঠস্বর ছিল আমারই অন্তর্গত কন্ঠস্বর। ঈশ্বরকে আমি ছেড়ে গেছি, ঈশ্বরও আমাকে ছেড়ে গেছে, কিন্তু আমার অন্তর্গত কন্ঠস্বর আমারই রয়ে গেছে। আমি এখনও মাঝে মাঝে মন্ত্রের মত উচ্চারণ করি, 

"দেহ পবিত্র, মন পবিত্র, আত্মা পবিত্র, চারপাশ পবিত্র।"



Friday, March 25, 2011

আমি অপেক্ষায় আছি অরণ্যানী

অরণ্যানী, আমি অপেক্ষায় আছি,
তোমার সাথে দেখা হবে;
ইট পাথুরে মানুষগুলো ছেড়ে,
সমস্ত চেতনায় সবুজের আলিঙ্গনে,
কিছু শিশিরের অধর চুমে,
অজানার ভয়ে ভয়ে...
অথবা বাঘের সাথে পরিচয়ের শিহরণে।


আমি অপেক্ষায় আছি অরণ্যানী,
তোমার সাথে দেখা হবে।
ধূলি ভরা হলুদ পাতার জীবন ছেড়ে,
সজীব প্রানের গহীনে।


যদি বল তুমি আসবে, 
আমি লেগে যাবো 
অশ্লীল সভ্যতার ধবংসে।
তোমার দেহের ফাঁকে ফাঁকে,
পাখির বাসায় সুখের ঘুমে আমৃত্যু হারাতে।



Thursday, March 24, 2011

দেবতা

মনের অন্তর্লীনে ঝড় অন্ধকার কালো;
ঘুরে দাড়াবার সময় থাকতে থাকতে 
তাই ঘুরে দাড়ানোই ভালো।
অকারণে বয়ে যাওয়া কিছু কষ্ট;
ফেলে দিয়ে হাসতে না পারো, ভালবাসতে তো পারো।


যে মুঠোয় শিকল ভাঙ্গার সাহস,
অলংকারের মত সুতীব্র প্রতিরোধ,
সে হাত বাঁধবার সব আয়োজন বৃথা।


তোমাদের স্বত্তা অথবা স্রষ্টা দিয়েছে অহংকারের বাসনা।
হারিয়েছ তাই হৃদয়বৃত্তির তপসা।
আমি দেব কেবল গভীরতা;
মনের মন্দিরে দেব মানবতা।


আমি কেঁদেছি তোমার নীরবতায়,
হেসেছি তোমার সরলতায়,
ভালবাসি তোমারই ভালবাসায়,
সেই তো আমার হৃদয়দেবতা।
অসীমের মত মুক্ত স্বত্তা, 
মনের তন্ত্রীতে সুরে সুরে বাঁধা।



Tuesday, March 22, 2011

সামাজিক সময়ের বদান্যতা

নির্জনতা,
অস্থির দিশেহারা পাখিরা,
কিংবা বিসর্জনের যন্ত্রণা,
এই সব সামাজিক সময়ের বদান্যতা।

বসন্তখেলার কচি পাতায়
তোমার মুখের মুখরতা,
আমার শাড়ির আঁচল জুড়ে
তোমার হাতের অতীত ছোঁয়া।
তারপর সব ভুলে যাওয়া,
অথবা ভুলে থাকা।

বারে বারে
হয়ত হবে কণ্ঠ শোনা,
হয়ত হবে চোখের দেখা,
মনে মনে বিষাদ নেশা,
কেবল তোমার জন্য হাসব না।





১২ই ফেব্রুয়ারি ২০১১

স্বরলিপি

পায়রার ডানায় গল্প লিখি।

গল্পের মাঝে মাঝে...
কয়েকটা বাক্য ফাঁকা রাখি।
ঐখানে কোন কথা নেই, 
আছে কিছু নীরব অনুভূতি।
যেদিন আমার গল্প নিয়ে,
পায়রা যাবে তোমার কাছে,
সেদিন আর আমার গল্প লেখা হবে না ।

সেদিন লিখব গানের স্বরলিপি।

Monday, March 21, 2011

যদি সইতে পারো জলন্ত অগ্নিকে

আমি নির্জনতা ভালবাসি, তবে অন্ধকারকে নয়।
অন্ধকারের জন্য খুলেছি আমার বিরুদ্ধ দুয়ার,
তাকে আমার ছায়া মাড়ালেও সরে দাঁড়াতে হয়;
দেখি অপসৃয়মান আঁধার।


এসো প্রখর সূর্যালোকে,
আমার সাথে কথা কইতে,
অথবা আমার সাথে লড়তে।


আমার আকাশ ভরা আলো;
রাত্তিরেও থাকে নক্ষত্র,
যা বলবার আলোয় দাঁড়িয়ে বলো।


কথা বল আমার চোখে চোখ রেখে;
যদি তোমার ছায়া না কাঁপে,
যদি সইতে পারো জলন্ত অগ্নিকে।


Sunday, March 20, 2011

অভিমানের আমন্ত্রণ


তোমার বুকেই লিখেছি আমার বুকের সব কবিতা;
আমার চোখেই দেখো তোমার দুঃসাহসের ছবিটা।




Saturday, March 19, 2011

ঈশ্বরের অভিমান

মাঝে মাঝে আধ একটা ঈশ্বর আমদানীর প্রয়োজন বোধ করি।
যার দিক থেকে আমি চাইলেও অবিশ্বাসে মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারবো না।
তোমাদের ঈশ্বরের চোখে আমি বড় নিষ্ঠুর;
অবজ্ঞায় ছুড়ে ফেলেছি বলে।


একটা অপিরিসীম বাংলাদেশ,
জীবন নামের একটা মিশন,
অথবা মানবতার জয়স্নান,
এসব কখনো আমাকে নিঃসঙ্গ হতে দেয়না।
তবু মাঝে মাঝে প্রার্থণা সংগীতের বড় প্রয়োজন বোধ করি।


জীববৈজ্ঞানিক ব্যবচ্ছেদের মত ঈশ্বরতত্ত্বের ব্যবচ্ছেদে
তোমাদের ঈশ্বর আমার উপর অভিমান করেছেন।
আমার তাচ্ছিল্যের হাসিতে তার অভিমান হয়েছে বটে,
তবে ঈশ্বরের সেবকেরা ক্লান্ত হয়নি তাতে।


এখন আমার প্রার্থণার বেলা,
পারলে কেউ আমার পূজার বেদীতে একটা ঈশ্বর রেখে যাও।

অসমীকরণ

আমাকে নিয়ে অযথায় চিন্তিত তুমি;
আগের মত করে আদুরে গলায় বলব না,
এতো চিন্তা কর কেন বলত?
আজ বলব, চিন্তা করোনা, ভয় পেয়না,
যখন অসমাধানের সমীকরণটাই বুঝে গেছি,
তখন আর নতুন সমীকরণ খুঁজে কি লাভ বল?

এইমাত্র ঘুমের ঘোরে আবার বিভীষিকা এসেছিল,
আমাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিতে,
কুমীরের মত চেহারা নিয়ে,
ভাঙ্গা ঘুমে বুঝলেম, মাথায় ভীষন যন্ত্রণা।
কি লাভ বল, আমাকে নিয়ে শুধু শুধু ভেবে।

অথচ ঘুমুতে গিয়েছিলাম, দুচোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে,
বর্ষার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে।
ঘুমুতে গিয়েছিলাম দুষ্টুমীর হাসি হাসতে হাসতে।
জেগেছি আবার, স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নের সেইসব মরচে ধরা অসমীকরণে।


পৃথিবী তোমার জন্যে...

একটা ঝকঝকে নীল আকাশ তলে আমার বসবাস।
পায়ের নীচে শুধুই আমার কচি সবুজ ঘাষ।
বুকের মধ্যে লেগে আছে তোমার হাসির রোদ,
তাতে হলই নাহয় বন্দীশালার একটুখানি ক্রোধ।


আমি তোমায় দেখি ভালোবাসার স্নিগ্ধ চোখে;
পৃথিবী ভরেছি কেবল আমার সরলতম আবেশে;
আমি চেয়েছি কেবল সত্যের স্বাধীনতা;
তাই বাধাও আমায় দিল না বাধা।


একটি মানবজন্মে,
একটি ধরণীর জন্যে,
রইল কেবল একটিই সাধনা;
বিশুদ্ধতার সাহসী দৃপ্ততা।

বিপ্লব


তোমাদের সভ্যতা আমি ঝোলায় পুরে বিকিয়ে দিয়েছি।
ভালবাসার দামে, স্বাধীনতার নামে।


Monday, March 14, 2011

অবিশ্বাসের ঘরবসতি

আবুল হাসানের প্রেমে পড়া দোষের কিছু নয়।
তার সাথে আমার বিশ্বাসের কোন লেনদেন নেই।
আবুল হাসানের প্রেমে পড়া দোষের কিছু নয়।

আমার নির্জন মনে আবুল হাসানের কবিতার
আগ্রাসী হাত দেখেও আমি চমকে উঠিনা।
তবে অবিশ্বস্ত প্রণয়প্রার্থীর মুখখানি মনে হলেও আতঙ্কিত হয়ে উঠি।
আলোকিত মধ্যদুপুরেও সে মনে হয় অন্ধকারের আগ্রাসন।

কবিতা সমগ্রের পাতা উল্টাতে উল্টাতে আমার নির্জন স্বাক্ষরটুকু ছাড়া
আর প্রণয়ীর জন্য বলতে ইচ্ছা করে, "এখন প্রেমিক নেই, যারা আছে তারা সব পশুর আকৃতি"।

আবুল হাসানের প্রেমে পড়া দোষের কিছু নয়।
তার সাথে আমার বিশ্বাসের কোন লেনদেন নেই।
সেই তো, দিনরাত আমায় বলে যাচ্ছে,
"ঝিনুক নীরবে সহো
ঝিনুক নীরবে সহো, ঝিনুক নীরবে সহে যাও
ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুঁজে মুক্তা ফলাও!"

Sunday, March 13, 2011

যুদ্ধ ও শান্তি

শান্তি চেয়েছি...
বিড়ালের মত গুটিশুটি মেরে 
নিরাপদে ঘুমোবার জন্য নয়,
যুদ্ধটা লড়ে যাবার জন্যে।


শান্তি চেয়েছি...
যুদ্ধ জয়ের জন্য নয়,
যুদ্ধটা লড়ে যাবার জন্যে।


শান্তি চেয়েছি...
তলস্তয়ের মত যুদ্ধক্লান্তির ক্ষয়ে ক্ষয়ে,
 নয় শান্তির শেষ মদে,
একটি স্বপ্নকে বাঁচাবো বলে।


শান্তি চেয়েছি...
আত্মার স্থিরতায়,
জীবন্ত চঞ্চলতায়,
সহাস্যে।

Friday, March 11, 2011

গুচ্ছ গুচ্ছ কবিতা

এক এক গুচ্ছ কবিতা লিখেছি মনে,
গুচ্ছ গুচ্ছ কবিতা।
নিজেকে মনে হয় সেই আঙ্গুরলতা;
ধারণ করেছি টক মিষ্টি কাব্যসুধা।

মাঝে মাঝে নিজেকেই মনে হয় আপাদমস্তক কবিতা।

সূর্যের রঙ কি লাল?
কত লাল?
লাজরাঙ্গা কুমারীর মত?
নাকি সূর্যের বুকে আমার বুকের রক্ত ঢেলেছি?
তাই বুঝি আমার কবিতা গুলো টকটকে লাল।
আর একটুখানি টক-মিষ্টি-ঝাল।

Friday, March 4, 2011

জীবন বাজি

জীবনবাজি...
মানবিক সত্যের জন্য।
ধর্মের ধূলিস্যাতে,
বিভেদের টুটি চেঁপে।


যে ভালবাসার কথা বলি আমি শতকণ্ঠে,
লড়াইটা তার জন্যে।
অন্ধকারের মাঝে আলোর উদ্ভাসে।

চিৎকার করে বলি তোমার নামে

আমার জানালার বাইরে ছোট্ট একটা পৃথিবী আছে,
আমি তা ঘুরেও দেখিনা।
আমার জানালা বন্ধ সেই কবে থেকে...


আমার চোখ ঘন কৃষ্ণ, দৃষ্টি ধূসর।
বাগানবিলাসের বাহারী রঙ দেখিনা অনেকদিন।


আমি নিথর,
শব্দ আমাকে বিচলিত করে না।


জীবন আমাকে প্রণাম করে,
ভয় পায় চলে যেতে।
মৃত্যুর যত ভয় আমার স্বপ্নের অভিশাপে।


আমি অমর।
কেবল একবার ভালবেসে।

Thursday, March 3, 2011

প্রজ্ঞা

বাবা, ঐটা কি?
-মন্দির
মন্দিরে কি হয়?
-ঐখানে ঠাকুর আছে, লোকে ঠাকুরকে পূজো দেয়।
পূজো কি বাবা?
বাবা চিন্তায় পড়ে যায়, এইটুকু মেয়েকে কি করে বোঝাবে, পূজো কি!

সেদিন অহনা বোঝেনি, পূজো কি। মা পরে শিখিয়েছে, ঠাকুর কি, কিভাবে পূজো দিতে হয়। মায়ের সাথে আয়োজনে কত্ত বসেছে সে। মা তো খুশি, ঠাকুর খুশি হোক না হোক!

অনেক বেলা গড়াল। অহনা কাউকে শুধায় না, পূজো কি? একদিন ঠাকুরকেই শুধিয়েছিল, তোমাকে কেন পূজো করব? ঠাকুর চুপ!

 মন্দির তার হৃদয়ে, সেখানে চিরকাল তার মাথা উঁচুই থাকবে।

বহিরাগত

সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট! এই নিদারুন সত্যটা মনে হলেই একটা হতাশাজনক অনুভূতির মুখোমুখি পড়ে যায় অরনী। একটা ভয়ঙ্কর তিতকূটে স্বাদে ভরে যায় সমস্ত মন। ছাব্বিশটা বছরেও একবারও অরনীর মনে হয়নি, সে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার যোগ্য। মনে মনে খুব বেশী হিংসে হয় রাসেলকে। সেই ছোট্টবেলায় বন্ধুটা তাকে ফেলে চলে গেলো পরপারে, তার ছোট্টমনে একটা ধাক্কা দিয়ে। সেদিন রাসেল সাঁকো থেকে পড়ে গিয়ে পরপারের টিকেটটা হাতে নিয়ে চলে না গিয়ে অরনীকেও তো দিয়ে যেতে পারতো সেটা। রাসেল বেঁচে থাকলে কি সে অরনীর মত বেঁচে থাকার অযোগ্য হত? মনে হয় না। সেই থেকেই কি বিষন্ন অরনী? কি করে জানবে সে অথবা আমরা। সাড়ে চার বছরের শিশুর মনে খেলার সাথীর মৃত্যু কতটা বিষন্নতার জন্ম দিতে পারে, তার তো কোন লেখাজোখা নেই। অরনীতো সেই বয়সেই এক বিষন্ন শিশুর রূপ নিয়ে আনমনে পথ চলতে শুরু করেছে... অনেকটা জন্মাবার কালেই মরে যাবার মত করে। এটা কি যথেষ্ট অবাক হবার মতই ব্যাপার না, সেই ছেলেবেলাতেই অরনীর আর কোন বন্ধু ছিল বলে তার মনে পড়ে না! কি করে কেঁটেছিল শৈশব?

ঝাপসা ঝাপসা মনে পড়ে ভাস্করের কথা। ক্লাসের ফার্স্ট বয় ছিল। স্কুলের নিয়ম ছিল পাশাপাশি চেয়ারে দুটো ছেলে বা দুটো মেয়ে বসতে পারবে না। তাহলে ক্লাসে বেশী হৈচৈ হয়। টিচার সামলাতে পারে না। যার যেখানে বসার জায়গা নির্দিষ্ট করে দেয়া হবে, তাকে সেখানেই বসতে হবে, অন্য কোথাও না। অরনীর মত চুপচাপ শান্তশিষ্ট মেয়েটাকে বসতে হত ভাস্করের পাশে। ফার্স্টবয়কে বিরক্ত করতেও ভয় লাগতো অরনীর। পাশাপাশি বসেও কখনো তেমন কথা বলেনি অরনী ভাস্করের সাথে। বলত না ভাস্করও। কেবল মনে আছে, ভাস্করের হাতে ওর তুলোনায় বড় একটা ক্যাসিওর ডিজিটাল ঘড়ি ছিল, আর টিচার ক্লাসওয়ার্ক করতে দিলে সবার আগে ভাস্কর লেখা শেষ করে চুপচাপ বসে থাকতো। অরনীর তাতেও অস্বস্তি লাগতো। ইস, ভাস্করের লেখা শেষ, আর আমি লিখতেই পারছি না।

পরের টার্মেই কার সাথে যে অরনীর নতুন বসার জায়গা ঠিক করে দেয়া হল। ছেলেটা নাম মনে নেই তার। মনে আছে ওর বাড়ি ছিলো বরিশাল। খুব মজা করে কথা বলত ছেলেটা। আর ওর আবেশে আবেশে চুপচাপ অরনীও কেমন যেন হয়ে উঠল কথাপোকা! ক্লাসে কারা এতো কথা বলে? আবার অরনীকে উঠিয়ে এনে বসিয়ে দিল ভাস্করের পাশে। একেতো অরনীর টিফিনবেলা কাঁটে ঘাসফুলের সাথে কথা বলে, তারউপর আবার টিচারটা কি বুদ্ধি করে বন্ধ করে দিল কথা। সাথে আছে একটা খ্যাতি, লক্ষী মেয়ে অরনী! একটুও দুষ্টুমী করেনা।

দুষ্টু কৌশিকের সাথে বন্ধুত্বটা হয়ত হয়েই যেতো, অরনীর বাবার বদলিটা না হয়ে গেলে। কৌশিক খুব মজা পেতো অরনীর অন্যমনস্কতায়। হয়ত কৌশিক অনেকক্ষন ধরে অন্যদের দেখিয়ে দেখিয়ে অরনীর পাশে পাশে হাঁটছে, অরনী টেরই পায়নি। কিংবা কখন অরনীর খাতা নিয়ে গেছে, অরনী জানেও না। নয় বছরের মেয়ের এতো কি নীরবতা। সহপাঠিরা তাই নিয়ে হাসবে না তো কি? এখনো তার মনে পড়ে কাশ্মীরের অরনীর উদাসী মুহূর্তের ধ্যান ভাঙ্গিয়ে হেসে গড়াগড়ি খাওয়ার কথা!

এরপর যখন অরনীকে কো-এডুকেশন থেকে গার্লি গার্লি পরিবেশে এনে ফেলা হল, সেই সময় থেকে অরনী আর স্কুলের কথা মনেই করতে চায় না। আগে সে কারোর সাথে তেমন কথা না বললেও, চারপাশে কেবল গার্লি গার্লি টক ঝালে এমন দম বন্ধ হয়ে আসতো না। নিঃশ্বাস নেবার মত কিছু অক্সিজেন ছিল তার, এখন পুরোটাই ভরে গেছে কার্বন ডাই অক্সাইডে। আর বাঁচেনি অরনীর শৈশব কৈশোর কিছুই! তখন থেকেই অযোগ্যতার আত্মগ্লানিতে ভরে গেছে জীবন। শৈশব কৈশোরের অপমৃত্যুই হয়ত অরনীকে মুক্তি দেয় নি শৈশব থেকে। তাই ছাব্বিশ বছরের শিশুটা আজ বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়েও বড় বড় মানুষগুলোর মাঝে দম বন্ধ করে থাকে। তার ইচ্ছা করে মধ্যরাতের ঢাকা শহরটাকে পায়ে হেঁটে চষে ফেলতে। ইচ্ছা করে ঘন অরণ্যে পাখির ডাকে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে অনন্তকাল বসে থাকতে। ইচ্ছে করে গোধূলী বেলার রংটাকে হাতের অঞ্জলিতে বন্দী করে রাখতে। ভুলে যেতে ইচ্ছে করে, তার ঘরে ফেরার নোটিশ ঝুলছে, সেলফোনটাকে ছুড়ে ফেলে দিলেও জবাবদিহি করতে হবে।

অরনীর একটা বর্ষা দরকার, যে বর্ষায় কচি পাতার মত স্নান করে সে সূর্যের দিকে চেয়ে শিশুর মত হাসতে পারবে। বেঁচে থাকার যোগ্য না হতে পারলে অন্তত হাসতে হাসতে বিলীন হয়ে যেতে পারবে!