Friday, August 3, 2012

নীলকণ্ঠের চিঠি (৩রা আগস্ট, ২০১২)

প্রিয় অরুণাভ,

গতকাল রাত থেকে আমি সময় খুঁজছিলাম, কখন যে তোমার সাথে কথা বলার সময় পাবো তাই ভাবছিলাম বারেবারে, অবশেষে সময়টা পেলাম আমি। আসলে তো আমি সবসময়েই মনে মনে কথা বলতে থাকি। নিজের মধ্যে যখন কথোপকথন চালাতে থাকি, তখন আজকাল তোমার নামটা মনে করতে হয় না, অরুণাভ নামটা আপনাতেই চলে আসে। আমি বলতে থাকি, তুমি যেন শুনতে থাকো। আমার সাথে ঘুরতে থাকা আমার ছায়াটাই যে আমার এতো চমৎকার, এতোটা নির্ভরযোগ্য বন্ধু হয়ে যাবে, ভেবেছিলাম বুঝি!  আমি সেই ছোট্টবেলা থেকেই একটু অদ্ভুত রকমের, শহুরে ছেলেমেয়েদের মত বড় হয়েছি ইট-পাথরের বন্দী পটভূমিতে। আগের চিঠিতেই তোমাকে জানিয়েছিলাম, আমার চারপাশের সমাজ থেকে, জগৎ থেকে কিভাবে আমার মনোজগতটা একটু একটু করে আলাদা হয়ে গেছে। সেখানেই শেষ নয়, আমার মনের ভেতরে গড়ে উঠেছে একটা অন্যরকম সুন্দর জগৎ, যেখানে জ্ঞানের পিপাসা আছে, মানুষের মনকে অনুধাবন করার শক্তি আছে, জগতে যতই কালো থাকুক অন্ধকার থাকুক, আমার মনজগতে সুন্দরের ছড়াছড়ি! আমার সত্যকে সত্য বলা সাহস আছে, মিথ্যেকে মিথ্যে বলার সাহসও আছে। আমাদের বাংলাদেশের রক্ষনশীল তথাকথিত সভ্য - আসলে অসভ্য- যে সমাজে মানবিকতার বিকাশের চেয়ে ধর্মের নামে মানবিকতার গলা টিপে হত্যা করা হয়, রক্ষণশীলতার নামে মেয়েদের ঘরের মাঝে বন্দী করে রাখা হয়, পোষাকের নামে বোরকা নামের বস্তায় মেয়েদের বেঁধে ফেলা হয়, চাপা থাকা কামের নগ্ন অগ্নুৎপাতে প্রতিদিন পত্রিকায় ধর্ষনের খবর বেরোয়, লাশে লাশের রক্তের হোলি খেলা হয়, শিক্ষা মননকে আলোকিত করার বদলে সার্টিফিকেট আকারে বিক্রয় হয়, শিশু/কিশোরেরা/তরুণদের মন-ইচ্ছা-জীবন যাপনের স্বাধীনতা গুরুজনকে সম্মানের নামে বাবা মা নামের নিষ্ঠুর জল্লাদের হাতে খুন হয়, যে সমাজে যেকোন ধরণের বিকাশকে অবরুদ্ধ করা হয় সেই সমাজের চেয়ে অসভ্য জান্তব সমাজ পৃথিবীতে আর কিছুই হতে পারে না। মানুষ ভিন্ন অন্য প্রাণীদের সমাজ মানব সমাজের চেয়ে সভ্য। কিছু মানুষ বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে প্রযুক্তি গড়েছে,  মানব সমাজ উন্নতি করেছে, কিন্তু মানবতা অর্জন করতে পারেনি, সভ্যতা অর্জন করতে পারেনি। এই সমস্ত অসুন্দর গুলো বাইরের পৃথিবীতে থাকলেও আমার পৃথিবীতে নেই অরুণাভ। আমার পৃথিবীতে আছে মমতা, মানুষের জন্য ভালবাসা। এ এক অনন্য সুন্দর পৃথিবী অরুণাভ। আমি গড়ে নিয়েছি একে। তুমি ভেবে দেখো, এই যে আমি তোমার সাথে এমনি করে কথা বলছি, এইভাবে কথা বলার কথা এই পৃথিবীর ৯৯.৯৯৯৯৯৯% মানুষ বা তারচেয়েও বেশী মানুষ ভাবতেই পারে না। আমাকে ওরা পাগল বলবে, আমি জানি। কিন্তু কি আসে যায় বল, আমি নিজেকে কলুষিত করে ওদের একজন হতে চাইনা। হতে পারে এটা আমার একটা ফ্যান্টাসীর জগত, হ্যাঁ কেউ বোঝে না এই জগতটা, আমি কাউকে বোঝার জন্য বলবও না, এই জগত নিয়ে যদি একজন মানুষ, এই আমি পৃথিবীতে মানুষের মত বেঁচে থাকি- সে তো অনেক!  

তোমাকে আজ একটা মজার কথা বলি। আমি যখন সদ্য এস.এস.সি পরীক্ষা শেষ করেছি, তখন আমার মায়ের মাঝে একটা অদ্ভুত রকমের পরিবর্তন এলো। তার দুইবছর আগে, আমি যখন নবম শ্রেণীতে পড়ি, তখন উচ্চতর গণিত পড়ার ব্যাপারে আমার মা একরকম ঘোর আপত্তি তুলেছিল। কারণটা ছিল এমন, আমার ছোট কাকু মাসুম সপ্তম শ্রেণীতে থাকা অবস্থায় আমাদের বাসায় থেকে পড়ালেখা করেছে। ছোট কাকু গণিতের কথা শুনলেই ভয় পেত। ম্রেটিক পরীক্ষা পর্যন্ত বাধ্যতামূলক ভাবে যেটুকু গণিত করতে হয়েছে তারচেয়ে বেশী কোনদিন করেনি। আমার আম্মুর ভাষায়, সে গণিত করত অনেকটা মুখস্থ করে। গণিত জিনিসটাকে সে এতোটাই ভয় পেতো যে বুঝতে না পারলে বোঝার চেষ্টা না করে সোজা মুখস্থ করে কাজ খতম। পরীক্ষায় কেবল মাথা থেকে নামিয়ে বসিয়ে দিতো। সে যেহেতু অন্য সব ভাইয়ের চেয়ে ভালোভাবে পড়ালেখা করার সুযোগটা পেয়েছে, তার জীবনে আকাংখাটাও ছিল তেমনই। ডাক্তার হতে চেয়েছিল সে। হয়েছে। ডাক্তার হতে তো আর গণিত লাগে না। খাটাখাটুনির জোরে ভালোভাবেই মেডিক্যাল কলেজে চান্স পেয়ে গিয়েছিল। তো আমার মা তো গ্রামের মেয়ে, গায়ের স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করার পর আর তার পক্ষে পড়ালেখা করা সম্ভব হয়নি। ততদিনে আমি কোলে এসে গিয়েছি। আমার কাকুর মত সেও গণিত কি জিনিস চেখে দেখেনি এবং ভয়টা বোধ করি মাসুম কাকুর চেয়ে বেশীই পেত। গণিত না পড়েই যখন কাকু ডাক্তার হয়ে গেল, তখন আমার মায়ের মনেও স্বপ্ন, আমিও ডাক্তার হব। তাই আমাকে কাকুর মত নিতে হবে জীববিজ্ঞান। মন দিয়ে জীববিজ্ঞান পড়তে হবে। আমার মা পড়ালেখা বলতে মুখস্থ করাকেই বুঝে, বোঝেনা আত্মস্থ করা বা গাণিতিক সমীকরণ সমাধান করা। তাই আমি যখন উচ্চতর গণিত নিতে চাইলাম, তখন আমার মা বসল বেঁকে, না কিছুতেই নিতে দেবে না। ডাক্তার হতে গণিত লাগে না, গণিত নিলে আমার রেজাল্ট যদি খারাপ হয়, যদি আমি জীববিজ্ঞান কম পড়ে গণিত বেশী পড়ি! এইসব ভয়ে রীতিমত আমাকে গণিত না নেয়ার জন্য মানসিক চাপ শুরু করল। আমি তো নেবই, বললেই হল নাকি! শেষে মধ্যস্থতা হল, বায়োলজি আবশ্যিক বিষয়, আর গণিত ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে নিতে দেবে। কিন্তু আমি যে কি ঘাড় ত্যাড়া। আমি গণিতই নেব আবশ্যিক বিষয় হিসেবে, তখনকার জীববিজ্ঞান বই দেখলে আমার গায়ে জ্বর আসতো। একটুও বোঝার কিছু নেই, খালি পাতার পর পাতা মুখস্থ কর, আমি এতো চাপ নিতে পারবো না বাবা। আমি ঠিক করে ফেলেছি ফাইনালি রেজিস্টার করার আগে গণিত আবশ্যিক করে দেব। মা উপায়ন্তর না দেখে আমার কাকাদের শরণাপন্ন হল, তারাও সবাই আমার মায়ের সাথে সুর মেলায়, আমার বাবা ছাড়া। আমার বাবা তো খুব খুশি আমার সিদ্ধান্তে। বাকি ছিল কেবল মাসরুর কাকা, যে আমাদের পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে শিক্ষিত বলে সবাই মনে করত। তো কাক যেদিন আমাদের বাসায় এলো, মা তাকে গিয়ে অভিযোগ জানালেন। ফল হল হিতে বিপরীত, কাকু নিজে ত ইঞ্জিনিয়ার সে বলে নিতে চাচ্ছে নিক না, জীববিজ্ঞান ঐচ্ছিক নিলেও মেডিকেলে ভর্তি হতে কোন সমস্যা হবে না। আমার মায়ের চোখমুখ গেল কাল হয়ে, আর আমার খুশি দেখে কে! কোনভাবেই আমাকে থামাতে না পেরে শেষে বলল, আচ্ছা ঠিক আছে, তোমার যেটা ইচ্ছা হয় সেটাই কর, তবে আমাকে একটা কথা দিতে হবে, জীববিজ্ঞানে ভালো করতে হবে, ঐচ্ছিক নিচ্ছ বলে ঐটা কম পড়া যাবে না। আমি অতশত না ভেবে বলে দিলাম আচ্ছা। সেও আর কিছু বলতে পারল না। আমি মোটামুটি ভালোই রেজাল্ট করতাম সব বিষয়ে যদিও জীববিজ্ঞানে তখন একটুও আগ্রহ পেতাম না, তবুও খারাপ করিনি কখনও। সেইদিনের কথা মনে হলে এখনও আমার বুক আনন্দে ভরে যায়, সেইদিন, সেইদিনই আমি বুঝেছিলাম, আমার ইচ্ছাশক্তি কতখানি। যমের মত যে মা আমার মনের উপর ইচ্ছেমত হুকুম চালাত, সেই মা আমার ইচ্ছাশক্তির কাছে হেরে গিয়েছিল। তখন তো বটেই, এরও অনেকদিন পর্যন্ত, বলতে গেলে আমি কোরিয়াতে চলে আসার আগ পর্যন্ত, আমার মা আমার জীবনের কোন সিদ্ধান্ত আমাকে স্বাধীন ভাবে নিতে দেয়নি। সে নিজে বেশী দূর পড়ালেখা করেনি অথচ আমার পড়ালেখার উপর জোর করে তার  সব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চেয়েছে। তবে আমিও কোনদিন হার মানিনি। অবাক হবার মত ব্যাপার হল, এস.এস.সি. তে যিনি এতোটা বাধা দিয়েছিলেন গণিত নেয়ার ব্যাপারে, সেই কিনা এইচ.এস.সি সময় আমি যাতে গণিতে পিছিয়ে না পড়ি, সেজন্য অন্য সব বিষয় বাদ দিয়ে আমার গণিতের শিক্ষক ঠিক করে ফেললেন, এমনকি আমার একাদশ শ্রেণীর ক্লাস শুরু হবার দুইমাস আগে!

মা কেন, যেই হোক না, কাউকে আমার জীবনের রাশ টেনে ধরার সুযোগটা দেয়নি। পাগলা ঘোড়ার সেইসব মানুষগুলোকে, যারা আমায় বাধা দিয়েছিল, আমার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, তাদের সব্বাইকে পিছনে ফেলে আমি আমার পথ বেছে নিয়েছি। নিজের জন্য আমার এখন আনন্দ হয় অরুণাভ, যেই বন্দী পরিবেশে আমি বড় হয়েছি সেই বন্দিত্বের শিকল আমি গুড়িয়ে দিতে পেরেছি বলে। খুব বড় বড় কিছু করিনি, আমার অর্জনগুলো খুব খুব সামান্য, কিন্তু আমি বিন্দু বিন্দু করেই সিন্ধু ছিনিয়ে নিয়েছি, আমার জীবন সিন্ধুর একটি বিন্ধুও কেউ আমার কাছ থেকে আর কেড়ে নিতে পারবে না, আমি আর কখনই কেড়ে নিতে দেব না অরুণাভ। আমার এই জয়ের সাথী যে তুমিও, তাই শুভেচ্ছা তোমাকেও। আমার মন খুশি খুশি হয়ে গেছে অরুণাভ। :)

ভালোকথা, তুমি কি জানো, কেন আমি তোমাকে এই গল্পটা বললাম? ঐযে আমার গণিতের শিক্ষক, তার রেজিস্টার খাতার একদিন একটা নাম দেখেছিলাম, নামটি ছিল শিশির। এতো ভালো লেগেছিল নামটা তখন, সেইসময় আমি যখন একা একা কথা বলতাম, তখন আমি তোমার নাম দিয়ে ফেলেছিলাম শিশির। যদিও আমি তখন বুঝতাম না, আমি কেন বারবার আনমনে কথা বলতে গেলে শিশির নামটা বলি! এখন বুঝি, আজকের অরুণাভ, গত-সপ্তাহে যাকে শর্মিলি বলে ডেকেছিলাম, সেই ছিল শিশির। কি, জানলে তো তোমার আদ্যিকালের নামটা? :)


-নীলকণ্ঠ
০৩/০৮/২০১২