Thursday, March 3, 2011

প্রজ্ঞা

বাবা, ঐটা কি?
-মন্দির
মন্দিরে কি হয়?
-ঐখানে ঠাকুর আছে, লোকে ঠাকুরকে পূজো দেয়।
পূজো কি বাবা?
বাবা চিন্তায় পড়ে যায়, এইটুকু মেয়েকে কি করে বোঝাবে, পূজো কি!

সেদিন অহনা বোঝেনি, পূজো কি। মা পরে শিখিয়েছে, ঠাকুর কি, কিভাবে পূজো দিতে হয়। মায়ের সাথে আয়োজনে কত্ত বসেছে সে। মা তো খুশি, ঠাকুর খুশি হোক না হোক!

অনেক বেলা গড়াল। অহনা কাউকে শুধায় না, পূজো কি? একদিন ঠাকুরকেই শুধিয়েছিল, তোমাকে কেন পূজো করব? ঠাকুর চুপ!

 মন্দির তার হৃদয়ে, সেখানে চিরকাল তার মাথা উঁচুই থাকবে।

বহিরাগত

সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট! এই নিদারুন সত্যটা মনে হলেই একটা হতাশাজনক অনুভূতির মুখোমুখি পড়ে যায় অরনী। একটা ভয়ঙ্কর তিতকূটে স্বাদে ভরে যায় সমস্ত মন। ছাব্বিশটা বছরেও একবারও অরনীর মনে হয়নি, সে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার যোগ্য। মনে মনে খুব বেশী হিংসে হয় রাসেলকে। সেই ছোট্টবেলায় বন্ধুটা তাকে ফেলে চলে গেলো পরপারে, তার ছোট্টমনে একটা ধাক্কা দিয়ে। সেদিন রাসেল সাঁকো থেকে পড়ে গিয়ে পরপারের টিকেটটা হাতে নিয়ে চলে না গিয়ে অরনীকেও তো দিয়ে যেতে পারতো সেটা। রাসেল বেঁচে থাকলে কি সে অরনীর মত বেঁচে থাকার অযোগ্য হত? মনে হয় না। সেই থেকেই কি বিষন্ন অরনী? কি করে জানবে সে অথবা আমরা। সাড়ে চার বছরের শিশুর মনে খেলার সাথীর মৃত্যু কতটা বিষন্নতার জন্ম দিতে পারে, তার তো কোন লেখাজোখা নেই। অরনীতো সেই বয়সেই এক বিষন্ন শিশুর রূপ নিয়ে আনমনে পথ চলতে শুরু করেছে... অনেকটা জন্মাবার কালেই মরে যাবার মত করে। এটা কি যথেষ্ট অবাক হবার মতই ব্যাপার না, সেই ছেলেবেলাতেই অরনীর আর কোন বন্ধু ছিল বলে তার মনে পড়ে না! কি করে কেঁটেছিল শৈশব?

ঝাপসা ঝাপসা মনে পড়ে ভাস্করের কথা। ক্লাসের ফার্স্ট বয় ছিল। স্কুলের নিয়ম ছিল পাশাপাশি চেয়ারে দুটো ছেলে বা দুটো মেয়ে বসতে পারবে না। তাহলে ক্লাসে বেশী হৈচৈ হয়। টিচার সামলাতে পারে না। যার যেখানে বসার জায়গা নির্দিষ্ট করে দেয়া হবে, তাকে সেখানেই বসতে হবে, অন্য কোথাও না। অরনীর মত চুপচাপ শান্তশিষ্ট মেয়েটাকে বসতে হত ভাস্করের পাশে। ফার্স্টবয়কে বিরক্ত করতেও ভয় লাগতো অরনীর। পাশাপাশি বসেও কখনো তেমন কথা বলেনি অরনী ভাস্করের সাথে। বলত না ভাস্করও। কেবল মনে আছে, ভাস্করের হাতে ওর তুলোনায় বড় একটা ক্যাসিওর ডিজিটাল ঘড়ি ছিল, আর টিচার ক্লাসওয়ার্ক করতে দিলে সবার আগে ভাস্কর লেখা শেষ করে চুপচাপ বসে থাকতো। অরনীর তাতেও অস্বস্তি লাগতো। ইস, ভাস্করের লেখা শেষ, আর আমি লিখতেই পারছি না।

পরের টার্মেই কার সাথে যে অরনীর নতুন বসার জায়গা ঠিক করে দেয়া হল। ছেলেটা নাম মনে নেই তার। মনে আছে ওর বাড়ি ছিলো বরিশাল। খুব মজা করে কথা বলত ছেলেটা। আর ওর আবেশে আবেশে চুপচাপ অরনীও কেমন যেন হয়ে উঠল কথাপোকা! ক্লাসে কারা এতো কথা বলে? আবার অরনীকে উঠিয়ে এনে বসিয়ে দিল ভাস্করের পাশে। একেতো অরনীর টিফিনবেলা কাঁটে ঘাসফুলের সাথে কথা বলে, তারউপর আবার টিচারটা কি বুদ্ধি করে বন্ধ করে দিল কথা। সাথে আছে একটা খ্যাতি, লক্ষী মেয়ে অরনী! একটুও দুষ্টুমী করেনা।

দুষ্টু কৌশিকের সাথে বন্ধুত্বটা হয়ত হয়েই যেতো, অরনীর বাবার বদলিটা না হয়ে গেলে। কৌশিক খুব মজা পেতো অরনীর অন্যমনস্কতায়। হয়ত কৌশিক অনেকক্ষন ধরে অন্যদের দেখিয়ে দেখিয়ে অরনীর পাশে পাশে হাঁটছে, অরনী টেরই পায়নি। কিংবা কখন অরনীর খাতা নিয়ে গেছে, অরনী জানেও না। নয় বছরের মেয়ের এতো কি নীরবতা। সহপাঠিরা তাই নিয়ে হাসবে না তো কি? এখনো তার মনে পড়ে কাশ্মীরের অরনীর উদাসী মুহূর্তের ধ্যান ভাঙ্গিয়ে হেসে গড়াগড়ি খাওয়ার কথা!

এরপর যখন অরনীকে কো-এডুকেশন থেকে গার্লি গার্লি পরিবেশে এনে ফেলা হল, সেই সময় থেকে অরনী আর স্কুলের কথা মনেই করতে চায় না। আগে সে কারোর সাথে তেমন কথা না বললেও, চারপাশে কেবল গার্লি গার্লি টক ঝালে এমন দম বন্ধ হয়ে আসতো না। নিঃশ্বাস নেবার মত কিছু অক্সিজেন ছিল তার, এখন পুরোটাই ভরে গেছে কার্বন ডাই অক্সাইডে। আর বাঁচেনি অরনীর শৈশব কৈশোর কিছুই! তখন থেকেই অযোগ্যতার আত্মগ্লানিতে ভরে গেছে জীবন। শৈশব কৈশোরের অপমৃত্যুই হয়ত অরনীকে মুক্তি দেয় নি শৈশব থেকে। তাই ছাব্বিশ বছরের শিশুটা আজ বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়েও বড় বড় মানুষগুলোর মাঝে দম বন্ধ করে থাকে। তার ইচ্ছা করে মধ্যরাতের ঢাকা শহরটাকে পায়ে হেঁটে চষে ফেলতে। ইচ্ছা করে ঘন অরণ্যে পাখির ডাকে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে অনন্তকাল বসে থাকতে। ইচ্ছে করে গোধূলী বেলার রংটাকে হাতের অঞ্জলিতে বন্দী করে রাখতে। ভুলে যেতে ইচ্ছে করে, তার ঘরে ফেরার নোটিশ ঝুলছে, সেলফোনটাকে ছুড়ে ফেলে দিলেও জবাবদিহি করতে হবে।

অরনীর একটা বর্ষা দরকার, যে বর্ষায় কচি পাতার মত স্নান করে সে সূর্যের দিকে চেয়ে শিশুর মত হাসতে পারবে। বেঁচে থাকার যোগ্য না হতে পারলে অন্তত হাসতে হাসতে বিলীন হয়ে যেতে পারবে!