Monday, September 6, 2010

বাংলাদেশ হুজুগে স্বাধীন হয়ছে!

একটি প্রজন্ম জন্মেছিল এই দেশে, যারা জন্মেই দেখেছিল, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংঘাতে বিপর্যস্ত তাদের জন্মভূমি। সেই প্রজন্মটা কেবল ছুটেছিল এক জাতীয়তাবোধ থেকে আরেক জাতীয়তা বোধের অনিবার্য রাস্তায়। এই উপমহাদেশে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নানা জাত ধর্ম বর্ণের সহাবস্থান। একই মাটির কোলে, একই গ্রামে যুগ যুগ ধরে বেঁচেছে হিন্দু মুসলিম। একই ভূখন্ডের সীমারেখায় একিভূত হয়ে থেকেছে, বাঙ্গালী, গুজরাটি, তামিল, পাঞ্জাবী... আরো অনেকে। কি ছিল তাদের পরিচয়, ভারতীয়! তিন পুরুষ আগ পর্যন্ত, এই পরিচয় নিয়েই পৃথিবীতে এসেছিল আমার পূর্বপ্রজন্ম, মাটিতে মিশেও গেছে সেই পরিচয় নিয়েই। আমার দাদা, দেখেছে বৃটিশ শাসন, দেখেছে পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতা ভূখন্ড, দেখেছে বাংলাদেশ। তারকালে জন্মালে হয়ত আমিও হয়ে যেতাম আমার জাতীয়তাবোধ নিয়ে দ্বিধান্বিত। কি তবে তার জাতীয়তা বোধ? জন্মেছিল বৃটিশরাজের শাসনের অধীন ভারতীয় হিসেবে। যৌবনে দেখেছিল, বৃটিশের গ্রন্থি ছেদনে উন্মত্ত স্ব-জাতি গোষ্ঠীকে। মাঝে এলো পরজীবির মত এক উটকো শাষকদলের পেষন। সবশেষে এলো বাংলাদেশ, যে দেশের মানচিত্র আর পতাকার অধিকার অর্জন করে আনল তারই সন্তান এবং তার সহযোদ্ধারা। হ্যাঁ, আমি সেই যোদ্ধার গর্বিত সন্তান।


বলছি আমার বাবার কথা, বোধ সৃষ্টির পর থেকেই যে দেখেছে জন্মভূমির রাজনৈতিক আর সামাজিক সঙ্কট। সেইসময় পৃথিবীর কাছে তার পরিচয় ছিল, পাকিস্তান ভূখন্ডের নাগরিক তথা পাকিস্তানী। এ এমন এক পরিচয়, যে পরিচয়কে স্বীকৃতি দিতে চাই না তার মন। মানতে পারেনা পূর্ব-পাকিস্তানে পাকিস্তানীদের অন্যায় শাষন। নিজেকে আর ঐ দূরবর্তী পশ্চিম পাকিস্তানের অচেনা ভিন্নভাষী মানুষগুলোকে কোনভাবেই এক জাতিভুক্ত বলে ভাবতে পারে না কিছুতেই। এ এক চরম আত্মপরিচয়ের সঙ্কট। তার উপর মানবতাকে পায়ে পায়ে পিষে নির্মমভাবে শোষন করে চলেছে পশ্চিম পাকিস্থানীরা। উত্তাল পূর্ব পাকিস্তান। পয়ষট্টি, ছেষট্টি, উনসত্তুর, সত্তুর এই সবই দেখা স্কুল ছাত্রের নিজের চোখে। তারুণ্যের টগবগ রক্ত শরীরে। দেশ স্বাধীনের ডাক। ছুটে গেল ইন্ডিয়ান ক্যাম্পে প্রশিক্ষন নিতে। তারপর অস্ত্র হাতে ফিরে আসা আবার বাংলাদেশে। এই মাতৃভূমিকে যে মুক্ত করতে হবে। অবসরে রেডিওতে শোনা দেশের গানে  তাদের মনে যেন আগুন ছড়িয়ে যেতো। আর অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করত সেক্টর ৮ এর অধীনে কুষ্টিয়া অঞ্ছলে। মুক্তিযোদ্ধা দলের এক্সপ্লোসিভ একপার্ট ছিল সে। যেখানেই এক্সপ্লোসিভ সেট করা দরকার হত, ছুটে যেতে হত তাকে। গেরিলা যোদ্ধা এই দলের কখনোবা পাকিস্তানী আর্মির মুখোমুখিও পড়ে যেতে হত। এক বাড়িতে খাবার খেতে গিয়ে দেখে, বাড়ির মালিক পাকিস্তানী সেনবাহিনীর বাঙ্গালী সৈনিক। যুদ্ধের কারণে অস্ত্রসহ বাংলাদেশে পালিয়ে আসা। অথচ যুদ্ধ না করে সযত্নে অস্ত্রটাকে অলস করে রেখেছে। তারা তাকে অনুরোধ করেছিল, আপনি তো নিজে যুদ্ধ করছেনই না, অস্ত্রটা অন্তত আমাদের দেন। দেয়নি সে। তারাও আর সেই বাড়ির অন্ন গ্রহন না করে চলে আসে। যে মানুষটার প্রতি বিরক্তি চলে এসেছে, তার দেয়া খাবার গলা দিয়ে নামবে না ভেবে। এই আমার বাবার তারুণ্য।

  আমি স্বাধীন বাংলাদেশে জন্ম নেয়া এক অতি ভাগ্যবান শিশু, যে গর্ব করে বলতে পারে, তার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। তার বাবা যে অস্তিত্বের সঙ্কটে ভুগেছে, সেই সঙ্কটে তার সন্তানদের পড়তে দেয় নি। তাদের জন্য একটা অনন্য আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। আমাদের জন্য তার শ্রেষ্ঠ অবদান, উপহার বাংলাদেশের পতাকা। আমি গর্ব করে বলি, আমি বাংলাদেশী, মাতৃভাষা বাংলা আমার। আমি সেই শিশু, ছোট্ট বেলায় যখন চারপাশের আর দশটা বাচ্চা ভূত-প্রেতের, পরীর গল্প শুনে বড় হয়েছে, আমি তখন শুনেছি মুক্তিযুদ্ধের গল্প। বাবা খুব দারুন করে গল্প বলত, বলত , “এক ছিলো মুক্তিযোদ্ধা, সেই মুক্তিযোদ্ধা যখন কলেজে পড়ত, তখন দেশে বেধে গেল যুদ্ধ। তার মা তো তাকে কিছুইতেই যুদ্ধে যেতে দেবে না, ছেলে যদি আর ফিরে না আসে, ছেলে বাবা-মা কাউকে কিছু না বলে পালিয়ে চলে গেল যুদ্ধ করতে...” চলত তার গল্পের পর গল্প। আমি ঘুমিয়ে না পড়া পর্যন্ত, যতক্ষন জেগে থাকতাম, ততক্ষন মাঝে মাঝেই বলে উঠতাম, তারপর কি হল আব্বু? এইভাবে বাবার কোলে বসে যুদ্ধের গল্প শুনেই কেটেছে আমার অতিশৈশব, তারপর সেই একই গল্প শুনেছে আমার ছোট ভাই, আমি তখনও চুপ করে গিয়ে বাবার পাশে বসে থাকতাম, বহুবার শোনা সেই গল্পগুলো বারবার শুনেও যেন কিছুতেই আশ মিটতো না আমার। এইভাবেই ছোট্ট চারাগাছ থেকে ধীরে ধীরে বিশাল গাছের প্রকান্ড ডালপালার মত ছড়িয়ে গেছে আমার মধ্যে দেশাত্মবোধের সবকটা ডালপালা। এটা আমার কাছে কোন প্রক্রিয়া না, এক স্বতঃস্ফূর্ততা!

 এই আমিই আজ ঘুরে বেড়াই অনেক মানুষের মাঝে, অনেক মানুষেতে আমার পরিচয়। গড়ে উঠেছে এক নিজস্ব জগত। প্রতিদিন মনে হয়, আমার বাবা তো এই দেশের জন্য যুদ্ধ করেছে, আমি কি করেছি, কবে পারব বাবার মত কিছু করতে?... একটা অস্থিরতা আমাকে অশান্ত করে তোলে।

আমার ডায়রীর পুরনো কিছু লেখায় চোখ বুলাতে বুলাতে একটা লেখা আবার আমাকে সেই অস্থিরতায় ফেলে দিল। লেখাটি ১৮ই ডিসেম্বর, ২০০৬ এর। সেদিনের লেখাটি তুলে দিলাম এইখানে।

 ১৮ই ডিসেম্বর, ২০০৬। ব্যক্তিগত দিনলিপি।
যে মাটির বুকে ঘুমিয়ে আছে লক্ষ মুক্তিসেনা
সে মাটি আমার অঙ্গে মাখিয়ে দে না ...
 ১৫ই ডিসেম্বর, ২০০৬, রাতে এই গানটা গাইতে গাইতে আবেগ আপ্লুত হয়ে গিয়েছিল ক্লোজআপ ওয়ান এর মুহিন।  জানিনা, ওর চোখের জল কে কিভাবে নিয়েছিল, হয়ত কেউ ভেবেছিল, এটা দর্শককে বিমোহিত করার একটা কৌশল, আবার হয়ত কেউ  ওরই মত আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছিল, কিন্তু আমি এসব নিয়ে ভাবার মত কোনো অবসরই পাইনি। আমার সেই মুহূর্তটা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল আরেকটি  ভয়াবহ কথার আঘাতে!!!

আমি টেলিভিশন দেখি খুব কম, বলতে গেলে দেখিই না, সেদিন হাতে সময় ছিল, ভাবলাম যাই টিভি দেখি। হলের টিভি রুম, শেষের সারিতে একটা ফাঁকা চেয়ারে বসে পড়লাম, পাশে বসে ছিল কয়েকজন জুনিয়র মেয়ে, মুহিনের গান শেষ হতে না হতেই এক জুনিয়র বলে উঠল,  এসব কি? কান্না কাটির আর জায়গা পায় না?? বাংলাদেশ হুজুগে স্বাধীন হয়ছে... এর জন্য আবার কান্নাকাটি!

কথাটা শোনা মাত্র, আমার হৃদয়টা গুমরে উঠেছিল কষ্টে, যন্ত্রনায়। এই মেয়েটির পাশে বসে আছি,  ঘৃনায় নিজেকে অশুচি মনে হচ্ছিল, হয়ত এটা আমার আবেগের বাড়াবাড়ি ছিল। আমি মেয়েটির দিকে তাকালাম, মেয়েটিও আমার দিকে তাকাল, কিন্তু আমি ওকে কিছু বলতে পারছিলাম না, রুচিতে বাঁধছিল। আমি কাউকে বোঝাতে পারব না, আমার সেই মুহূর্তের অবস্থা। সব অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে আমার পক্ষে কথাটাকে হাল্কা ভাবে নেয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়।।

কোন মতে সেই রাতটা হলে কাঁটিয়েছি, রুমমেট জানতে চেয়েছিল, আপু কি হয়েছে, ক্রোধে কষ্টে কিছুই বলতে পারিনি। পরদিন বাসায় চলে আসলাম, আব্বু কে বলেছিলাম কথাটা, আব্বু বড় আক্ষেপ করে বলেছিল, এই হল বর্তমান প্রজন্ম! আমাদের দেশ প্রেম, সময়ের প্রয়োজন এইসবই ছিল হুজুগ? টগর ভাই(আব্বুর সহযোদ্ধা) এর আত্মত্যাগ  ছিল হুজুগ? টগর ভাই এর লাশ পাকিস্তানিরা চারতলা বিল্ডিং এর ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রেখেছিল, সাধারন মানুষকে কে দেখানোর জন্য, কি হতে পারে পাকিস্তান বিরোধীতার পরিনতি! উনার পরিবারের ওপর চালিয়েছিল অবর্ননীয় অত্যাচার, শেষ পর্যন্ত টগর ভাই এর বাবা জীবন বাঁচানোর তাগিদে অস্বীকার করেছিলেন সন্তান টগরকে, টগর তার ছেলে নয়! এসব ছিল হুজুগ? বলতে বলতে আব্বু উত্তেজিত হয়ে পড়ছিলেন, আব্বুর চোখে ছিল অপিরিসীম কস্ট, আব্বু উচ্চ রক্তচাপের রোগী, আমি আব্বুকে শান্ত করার জন্য চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু আব্বু শান্ত হতে পারছিলেন না কিছুতেই, আমার ভয় করতে শুরু করল, আব্বু বলে যাচ্ছিলেন, কতদিন অ্যাম্বুশ  এর মুখে পড়ে জীবন ফিরে পাওয়াই অবাক হয়েছি, নির্ভয়ে এক গ্লাস পানি খাওয়ার জন্য মাইল এর পর মাইল দৌড়েছি, কানের পাশ দিয়ে গুলি ছুটে গেছে, কতদিন পাকিস্তানিদের পিছু হটিয়ে দিয়ে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে  আনন্দে উল্লসিত হয়েছি! এইসব ছিল হুজুগ!

 আব্বুর কাছে এই গল্পগুলো বহুবার শুনেছি, তবু বারবার শুনতে চেয়েছি, আর প্রত্যেক বার অনুভব করেছি, কত কষ্টের বিনিময়ে আমরা এই দেশ পেয়েছি। একজন মুক্তিযোদ্ধার  মেয়ে হিসেবে গর্বে আমার হৃদয় ভরে যায়, মাঝে মাঝে আফসোস হয় , আমি কি আমার বাবার মত এ দেশকে কিছু দিতে পারব? কোনদিন কি পারব নিজেকে এমন ভাবে উসর্গ করতে? কোনদিন কি পারব এমনভাবে দেশকে ভালবাসতে!!! আমার বাবা আমার গর্ব, বাংলাদেশ আমার অহঙ্কার! আমি বাংলাদেশী, পুরোপুরি বাঙ্গালী এক মেয়ে, এটা বিশ্ববাসীর কাছে আমার গর্বিত পরিচয়, কষ্ট শুধু একটাই,  ভেবেছিলাম ১৯৭১ এর পর হয়ত আস্তে আস্তে এদেশ থেকে পাকিস্তানি দালাল গুলো নিঃশেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমার ধারনা ভুল, ওরা এই প্রজন্মের মাঝেও বিঃশ্বাসঘাতকতার বীজ ছড়িয়ে দিয়েছে! স্বাধীনতার ৩৬ বছর পরেও ওই কীট-পতঙ্গ গুলোর অস্তিত্ব আমাদের মেনে নিতে হচ্ছে!