আমার জীবনের একটা অতিলৌকিক গল্প এতোদিন লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল। আমার উজ্জ্বল কৈশোরে, সে বেলায় আমার বোঝার সাধ্য ছিল না, কি ঘটেছিল আসলে। আমি আজ তাই লিখতে বসলাম, গল্প লিখতে নয়, ক্ষুদ্র আত্মকথা নয়, কেবল রহস্যময় একটা ঘটনাকে লিপিবদ্ধ করে রাখতে।
আমার শৈশব কৈশোর ছিল অসাধারণ সুন্দর। বাবা মায়ের প্রথম সন্তান, তাই স্নেহে মমতায় ভালোবাসায় কোন কমতি ছিল না। একটুকরো স্বপ্নের মত সাজিয়ে বড় করেছিল আমাকে। কিন্তু যেকারণেই হোক আমার মানসিকতা অন্য দশটা বাচ্চার মত বাড়েনি। আমার শৈশবে কেটেছে লজ্জাবতীর পাতা ছূঁয়ে, ঘাষফুল কুড়িয়ে এবং পৃথিবীর মানুষগুলোকে কিছুটা পাশ কাটিয়ে। আমি স্কুলের বইয়ের অক্ষরগুলো আগে ভাগেই শিখেছি, পাতাঝরার দৃশ্য বা কচি পাতা গাছে আসার মুহূর্ত গুলো মনের ভেতরে গেঁথে নিতে খুব জলদি শিখেছি... কিন্তু আমার চারপাশের মানুষগুলোকে চিনিনি। এক্কেবারে সাদাখাতার মত শৈশব আমার যেখানে পেন্সিলের একটা আঁচড়ও নেই, আলোর মত দিন আমার, যেখানে আঁধারের লেশমাত্র নেই। সেই সাদাখাতার দিনলিপিতে একবার একটা স্বপ্ন জন্ম নিল, বড় কোন স্বপ্ন না, ক্যাডেট কলেজে পড়ার স্বপ্ন। স্কুলের পড়া ভালো লাগে না, তারচেয়ে কঠিন অঙ্ক করতে ভালো লাগে, সাধারণ জ্ঞানের বই পড়তে ভাল লাগে তা নয়, তবে কে বেশী পারে, জিকোর সাথে সেই প্রতিদ্বন্দীতায় নামতে ভালো লাগে। অবশেষে পরীক্ষা দিলেম ভর্তির জন্য, লিখিত মৌখিক, স্বাস্থ্যপরীক্ষা সব কিছু দিয়ে আমি প্রায় নিশ্চিন্ত ছিলাম, আর কদিন পরেই আমি ক্যাডেট কলেজে পড়তে চলে যাচ্ছি। সেইসময় জানলাম, ক্যাডেট কলেজের মত মামুলি একটা স্কুলের ভর্তি পরীক্ষাতেও যোগ্য হলেই হয় না, সহপ্রার্থীদের অনৈতিক বাবা মায়ের সাথেও লড়তে হয়। এবং আমি তাদের সামনে দাঁড়াতে পারিনি। আমি তো ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, বাবাকে দিয়ে ভর্তির সুপারিশের নয়। আমার ১২ বছরের মনটার উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গিয়েছিল সেদিন। মানুষটা আমি ছোট্ট ছিলেম, স্বপ্নটাও ছোট্টই ছিল... কিন্তু ছোট্ট মনে স্বপ্নভঙ্গের আঘাত মোটেও ছোট ছিল না। কান্না সামলাতে পারতাম না। পৃথিবীটা যে আমার নিজস্ব জগতের মত সুন্দর নয়, সেই আমি প্রথম জেনেছি। কিন্তু অসুন্দর পৃথিবীকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারিনি। সেই বিষাদ লাগা দিনে, একরাতে স্বপ্ন দেখলাম, কোন এক দৈব কন্ঠস্বরের, কে যেনো মোহময় কন্ঠে আমায় বলে গিয়েছিল, কেবল চারটি লাইন। আমার ঘুম ভাঙ্গে সেই চারটি লাইন মাথায় নিয়ে, মাকে বলি, বাবাকে বলি... তারাও অবাক হয়, এইটুকুনি মেয়ের স্বপ্নে এসব কথা এলো কি করে, তাদের চোখে বিস্ময়, মনে সন্দেহ, তাদের ঈশ্বর আমাকে জীবনের নির্দেশনা দিতে শুরু করেছে কিনা। আমার বাবা মায়ের ঈশ্বর তখন আমারো ঈশ্বর, কিন্তু তবুও ঐ বয়সে আমার বোঝার সাধ্য ছিল না, ঈশ্বরের নির্দেশনা মানে কি। আমি নিজেকে নিয়ে কিছুটা রহস্যের মাঝেই চলে গিয়েছিলাম, নির্দেশনা হোক আর যাই হোক, কথাগুলো যেনো ভুলে না যাই, তাই আমি আমার স্কুলের সবকটা খাতার প্রথম পাতায় লিখে রেখেছিলাম...
দেহ পবিত্র,
মন পবিত্র,
আত্মা পবিত্র,
চারপাশ পবিত্র।
আমার আত্মা স্বত্তার গড়নে এই বাক্য চারটে সবসয়ম আমাকে বলেছে, আমায় কি করতে হবে, আর কি করতে হবে না। আমার স্বত্তার ভিত্তিভূমি যেন এই বাক্যগুলো। আমি আজ অব্দি এই মন্ত্র মনে রেখেছি। আজ অব্দি আমার জীবন কখনো এই মন্ত্রকে ছেড়ে যায় নি।
যতকাল আমার ঈশ্বর ছিল, ততকাল, সাড়ে ১২ বছর বয়সে এই মন্ত্র পাওয়া আমার জন্য একটা বিস্ময় ছিল, আমার বাবা মায়ের মত আমারও সন্দেহ ছিল, এ কি ঈশ্বরের নির্দেশনা! আজ আমার ঈশ্বর নেই, আমি আজ জানি, ঐ কন্ঠস্বর ছিল আমারই অন্তর্গত কন্ঠস্বর। ঈশ্বরকে আমি ছেড়ে গেছি, ঈশ্বরও আমাকে ছেড়ে গেছে, কিন্তু আমার অন্তর্গত কন্ঠস্বর আমারই রয়ে গেছে। আমি এখনও মাঝে মাঝে মন্ত্রের মত উচ্চারণ করি,
"দেহ পবিত্র, মন পবিত্র, আত্মা পবিত্র, চারপাশ পবিত্র।"