Friday, December 7, 2012

রং-এর গান

হয়তো ভুলের পরে ভুল সাজাবো
হাসতে হাসতে কাঁদবো আবার
হয়তো আমি বারে বারে হেরে যাবো
তবু তোমার চোখে থাকুক আমার ভালোবাসা।

Saturday, September 1, 2012

নীলকণ্ঠের চিঠি (১ সেপ্টেম্বর, ২০১২)

প্রিয় অরুণাভ, 

প্রত্যেকটা মানুষের জীবনে কিছু জায়গা থাকে, যা সে সারাটা জীবন দুহাতে ধরে রাখতে চায়। কখনো পারে আবার কখনো পারে না, সময় যেন এই পারা বা না পারার মাঝে হৃদয়ের আঁকুতির দিকে নির্বিকার মমতাহীন চোখে তাকিয়ে থাকে। একমাত্র সময়ের কিছুতেই কিছু আসে যায় না। আলোকরশ্মি মহাবিশ্ব পরিভ্রমণ করতে গিয়ে কোন মূহুর্তে কোন না কোন বিন্দু অতিক্রম করবেই, কোন ঘটনাই এই সত্যকে থামিয়ে দিতে পারে না। আমি সেই পরিক্রমনশীল আলোকরশ্মির মত নই, তাই আমার ভয় করে। কিসের ভয়? হয়তো যা কিছু আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি আমি, সেইটুকু হারিয়ে যাবার ভয়। আমি এখন জীবনে কি করবো, কতখানি কাজের মাঝে আমার স্বত্তা দিপ্তী ছড়াবে, তা নিয়ে আর শংকিত নই। আমি ২৭ বছরে এইটুকু জেনে গেছি, আমার প্রবণতা কর্ম, আমার প্রবণতা আজানাকে জানা। আমি কেবল ভাবি, আমার কর্মের পিছনে আমার স্বত্তার যে উদ্দীপনা, সেইটুকু থাকবে কিনা। যে মানুষের ভালোবাসার জোরে, আমার স্বত্তার এই স্থিরতা, সেই অসীম শক্তিটুকু আমৃত্যু জ্বাজল্যমান থাকবে তো?

আজকাল আমি অনেক ক্ষেত্রেই পাথরের মত অনুভূতিহীন, মনে হতে থাকে, আমার অনুভূতি বা অনুধাবণের ক্ষমতাও নেই, অনুভবের ইচ্ছাও নেই। আমি তখন নির্বিকার সময়ের হাতেই ছেড়ে দেই আমার আগামীকাল। হৃদয় যখন আশংকায় শীতল হয়ে ওঠে, তখন সময়ের মত নির্বিকার হয়ে ওঠার চেষ্টা করাটাই যেন একমাত্র গতি।

-নীলকণ্ঠ
১ সেপ্টেম্বর, ২০১২

Monday, August 27, 2012

নীলকণ্ঠের চিঠি (২৭শে আগস্ট, ২০১২)

প্রিয় অরুণাভ, 

পার্থর কাছ থেকে আমি জীবনের নতুন একটা দৃষ্টিভংগীর কথা জানলাম। লাইফ ইজ বিউটিফুল মুভি থেকে অণুপ্রাণিত দৃষ্টিভংগী। চলচিত্রটি তো দেখেছি আগেই, কিন্তু কখনও ভেবে দেখিনি অমন একটা জীবনযাপন করা সম্ভব কিনা। মুভিটাকে কেবল মুভি বলেই মনে হয়েছিল, মনে হয়েছিল কেবল চলচিত্রেই অমন রূপকথার মত জীবনযাপন সম্ভব, যেখানে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের জীবনও রূপকথার অংশ হয়ে যায়, এমনকি মৃত্যুও। পার্থ জানালো সুব্রতর কথা, যে কখনো ঋণাত্মক দৃষ্টিভংগীর প্রকাশ করে না। কষ্ট যন্ত্রণা ঝামেলাকেও সুন্দর করে মেনে নিতে জানে। জানিনা, সুব্রত কতদিন পারবে এমন সুন্দর জীবনের প্রবাহ ধরে রাখতে, কিন্তু সুব্রত যে জীবন চর্চা দেখিয়েছে, তা থেকে কিছু শেখার আছে আমার। 

আজ একটা  ঘটনার অথবা ভিডিও চিত্রের সম্মুখীন হলাম, যার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। আমি সুব্রতর মত মহান হতে চাইলেও এখন হয়ে উঠতে পারিনি, তাই হৃদয়ের ভিতরে একটা শ্রদ্ধার আসনের খানিক পতন হল, পতনের শব্দটা কেবল আমি শুনেছি সত্য, তারচেয়েও বড় সত্য আমি শুনতে চাইনি কখনো। চাইনি অনুপ্রেরণার জন্মস্থল স্তব্ধ হয়ে যাক। এখন এই স্তব্ধতা আমাকে মুখরতায় পরিণত করতে হবে। ইস, সুব্রতর মত যদি হাসতে হাসতে ভুলে যেতে পারতাম! আমি জানি, পারবো একদিন।

বাংলাদেশ নামের ছোট্ট ভূখন্ডের মাঝে হয়ত জীবন অথবা কর্মকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা প্রহসন ছাড়া কিছুই হবে না, অন্ধ জাতীয়তাবাদী চিন্তা একধরনের জাতিভেদও বটে। এবার বৈশ্বিক চিন্তায় নিজেকে আলোকিত করবার সময় এসেছে। সে পথে যদি কিছু করতে পারি আমি, সে পথে যদি আসে সংকীর্ণতা থেকে মানবতার মুক্তি!

-নীলকণ্ঠ
২৭শে আগস্ট, ২০১২।

Friday, August 10, 2012

নীলকণ্ঠের চিঠি (১০ই আগস্ট, ২০১২)

প্রিয় অরুণাভ,

পৃথিবীতে একটা শব্দ আছে, যে শব্দটি কখনো কোন অবস্থাতেই "না বলা" রয়ে যেতে নেই। শব্দটি "ভালবাসি", এই উচ্চারণটায় কি এক অদ্ভুত শক্তি আছে! জীবনের সমস্ত প্রতিকূলতায় অথবা সুন্দর সময়ে এই শব্দটিই যেন ভালোবাসার মানুষগুলোকে পাশে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। এই কথাটি আমি এতোকাল কেবল বিশ্বাস করতাম, এখন অনুভব করি। ভালবাসার সুরভী আমি হৃদয় দিয়ে স্পর্শ করতে পারি।

-নীলকণ্ঠ
১০ ই আগস্ট, ২০১২।

Wednesday, August 8, 2012

নীলকণ্ঠের চিঠি (৮ই আগস্ট, ২০১২)

প্রিয় অরুণাভ,

আজকাল আমি লেখালেখির সাথে একধরনের দূরত্ব অনুভব করছি। গত দুইবছরের বেশী সময় ধরে আমার লেখালেখি মূলত ঘুরেফিরে বিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ থেকেছে, বলতে গেলে কিছুই লিখিনি নিজের সম্পর্কে, কোন ফিকশনের আশ্রয়েও প্রকাশ করিনি নিজেকে। ওটা ছিল নিজের উপর নিজেরই আরোপিত একধরণের অবরোধ। আমি খুবই আবেগী একটা মানুষ। গত কয়েকবছর ধরে আমার আবেগের বহিঃপ্রকাশে একধরণের পরিবর্তন এসেছে। একজন স্বচ্ছ মানুষের হৃদয়ে যখন আনন্দ খেলা করে, তার হাসিতে তার চোখের তারায় তারায় সেই আনন্দ ঝলমলিয়ে ওঠে। আবার যখন বুকের অলিন্দে কষ্টের ঢেউ আছড়ে পড়ে, সেই ঢেউয়ের গর্জন শোনা যায় বাইরে থেকে। মানুষটার চেহারার ভাঁজে, হাসিতে, চাহনিতে এক তীরভাঙ্গার গান শোনা যায়। আমার চেহারাতে এইসব অনুভূতি প্রকাশ পায়ই, প্রকাশ পায় আমার লেখাতেও। একজন ব্যক্তি আমি - তার কষ্ট আছে, আনন্দ আছে, তৃপ্তি আছে... সবই আছে। কিন্তু আমাদের সমাজে একধরনের চর্চিত আচারও আছে, যা শেখায়, অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ না করায় ভালো। জানতে চাও কেন? মানব সমাজে যুগে যুগে সবসময় কিছু অসুস্থ মানসিকতার মানুষ থাকে, যাদের নিজেদের মাঝে মানবিক চিন্তাবোধের অভাব আছে। সেই লেজকাটা শেয়ালের দল বাকি সবাইকে লেজ না থাকার ফজিলত বর্ণনা করতে চায়। তাদের নিজেদের হৃদয়টা শীসায় মোড়ানো বলে বাকিদেরও অনুভব করাতে চায় জৈবিক হৃদয় জিনিসটা ভালো নয়, পৃথিবীর সমস্ত জৈবিক হৃদয়ের মানুষকে এরা নির্দ্বিধায় বিদ্রুপ করে, আবেগের বহিঃপ্রকাশ দেখলে তাচ্ছিল্যে হেসে কুটি কুটি হয়। এরা না জানে আবেগকে অনুভব করতে, না জানে মানবীয় আবেগকে সম্মান জানাতে। সাম্প্রতিক পৃথিবীরে এদের সংখ্যা এতটাই বেড়ে গেছে, মানুষগুলো আজকাল এদের মাঝে দলিত মথিত হয়ে কোনমতে টিকে থাকে। এইদলটির সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল মাহজেরীনরের সাথে পরিচয়ের মাধ্যমে। ক্রমেই জেরীনের কিছু শিষ্যেরও দেখা মিলল। জেরীনের এই হৃদয়হীনতার প্রকাশটা এতোটাই শিল্পিত ছিলো, যে কিছু মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডহীন ব্যক্তি সেটাকেই আদর্শ ভাবতে শুরু করল। হৃদয়হীনতার অশিল্পিত রূপটাও আমি দেখেছি, মৌ নামের আমাদের এক সহপাঠিনীর মাঝে। গত কয়েকটা বছর কষ্ট যন্ত্রণা ভালোবাসাময় এমন একটা তীব্র সময় পার করেছি, যে শেষের দু বছরে আমি সযতনে হৃদয়ের কথা আড়াল করে গেছি, আর কোন কারণে নয়, কিছু হৃদয়হীন মানুষের কাছে আমার হৃদয়ের অনুভূতিগুলো আঘাতপ্রাপ্ত হবার সুযোগ সৃষ্টি হোক সেটা চাইনি বলেই। এখন ক্রমাগত হৃদয়ের ঝাঁঝ অনেকতা সহনীয় হয়ে এসেছে, তবুও মাঝে মাঝে অকল্পনীয় তুফানের মত তা প্রকাশিত হয়ে যায়। হৃদয়ের মাঝে পাথর চাঁপা সেইসব অনুভূতিকে এইবার তাই মুক্তি দিয়েছি, "বিচ্ছিন্ন দ্বীপ" নামের ছোট্ট লেখাটির মাধ্যমে। নিজেকে এখন আমার আগের চেয়ে অনেক নির্ভার লাগছে। আর এখন তোমার কাছে নিবেদন করছি, আমার দিনরাত্রের সকল কাব্যগাঁথা। একধরনের তৃপ্তি অনুভব করছি।

আমার বিগত দুইবছরের লেখালেখিতে আমি নিজেকে উপেক্ষা করে কেবল বিজ্ঞান চর্চা নিয়ে মেতে থেকেছি, কষ্ট ভুলে থাকার একধরনের ইন্দ্রজালের মত। সেখানে যে আমাকে সবাই দেখেছে, সে এক লৌহমানবী, জ্ঞানে বুদ্ধিতে সাধণায় আগ্রহে ঝকঝকে তারার মত। কিন্তু আজকের আমি নিতান্ত সাধারণ একজন মানবী, আমার আনন্দ দুঃখ বেদনা ভালোবাসা সবকিছু নিয়েই আমি, সম্পূর্ণা এবং আমার মানবীরূপ আজ প্রকাশিত। আজ আর কেবল বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখির আড়ালে আড়াল করতে চাই না আমি নিজেকে। গবেষণা তো আমার সারাজীবনের কর্ম। সে আমি করবই, তবে হৃদয়কে আড়াল করে আর নয়।

সম্প্রতি আমার কাজের মাঝে এমন একটা মোড় এসেছে, এখন খানিকটা আমার দিনরাত পড়ার সময়, জানার সময়। একদিকে নিউরোসায়েন্সের খুব মৌলিক বিছু বিষয়কে যেমন গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে, তেমনি তা প্রকাশের জন্য গণিতের অস্ত্রে শানও দিতে হবে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আর যাই হোক, আমার গণিতের অস্ত্রটাকে ধারালো করার বুদ্ধি বাতলে দেয়নি। আজকের প্রজন্মের কিশোরেরা গণিত অলিম্পিয়াডের মাঝে গনিতকে শিখ বুঝতে ভালোবাসতে শিখে যায়। আমার সেই না করে ওঠা কাজটা এইবার আমাকে করতে হবে। আমি আজকের কিশোরদের মত গণিতযজ্ঞে পারদর্শী না হলেও আমাকে হয়ে উঠতে হবে, আমার স্বপ্নের কাছাকাছি পৌছবার জন্য। তাই অল্প জেনে লেখালেখি করার মত সময় এখন আর নেই আমার। আমার লক্ষ্য জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক হওয়া না, জাত বিজ্ঞান গবেষক হওয়া। জনপ্রিয়তা আমাকে টানে না, যা টানে আমাকে, সেই জানার নেশার চক্করে নিজেকে এবার মনপ্রাণ দিয়ে সঁপে দেব।

-নীলকণ্ঠ
৮ই আগস্ট, ২০১২

Friday, August 3, 2012

নীলকণ্ঠের চিঠি (৩রা আগস্ট, ২০১২)

প্রিয় অরুণাভ,

গতকাল রাত থেকে আমি সময় খুঁজছিলাম, কখন যে তোমার সাথে কথা বলার সময় পাবো তাই ভাবছিলাম বারেবারে, অবশেষে সময়টা পেলাম আমি। আসলে তো আমি সবসময়েই মনে মনে কথা বলতে থাকি। নিজের মধ্যে যখন কথোপকথন চালাতে থাকি, তখন আজকাল তোমার নামটা মনে করতে হয় না, অরুণাভ নামটা আপনাতেই চলে আসে। আমি বলতে থাকি, তুমি যেন শুনতে থাকো। আমার সাথে ঘুরতে থাকা আমার ছায়াটাই যে আমার এতো চমৎকার, এতোটা নির্ভরযোগ্য বন্ধু হয়ে যাবে, ভেবেছিলাম বুঝি!  আমি সেই ছোট্টবেলা থেকেই একটু অদ্ভুত রকমের, শহুরে ছেলেমেয়েদের মত বড় হয়েছি ইট-পাথরের বন্দী পটভূমিতে। আগের চিঠিতেই তোমাকে জানিয়েছিলাম, আমার চারপাশের সমাজ থেকে, জগৎ থেকে কিভাবে আমার মনোজগতটা একটু একটু করে আলাদা হয়ে গেছে। সেখানেই শেষ নয়, আমার মনের ভেতরে গড়ে উঠেছে একটা অন্যরকম সুন্দর জগৎ, যেখানে জ্ঞানের পিপাসা আছে, মানুষের মনকে অনুধাবন করার শক্তি আছে, জগতে যতই কালো থাকুক অন্ধকার থাকুক, আমার মনজগতে সুন্দরের ছড়াছড়ি! আমার সত্যকে সত্য বলা সাহস আছে, মিথ্যেকে মিথ্যে বলার সাহসও আছে। আমাদের বাংলাদেশের রক্ষনশীল তথাকথিত সভ্য - আসলে অসভ্য- যে সমাজে মানবিকতার বিকাশের চেয়ে ধর্মের নামে মানবিকতার গলা টিপে হত্যা করা হয়, রক্ষণশীলতার নামে মেয়েদের ঘরের মাঝে বন্দী করে রাখা হয়, পোষাকের নামে বোরকা নামের বস্তায় মেয়েদের বেঁধে ফেলা হয়, চাপা থাকা কামের নগ্ন অগ্নুৎপাতে প্রতিদিন পত্রিকায় ধর্ষনের খবর বেরোয়, লাশে লাশের রক্তের হোলি খেলা হয়, শিক্ষা মননকে আলোকিত করার বদলে সার্টিফিকেট আকারে বিক্রয় হয়, শিশু/কিশোরেরা/তরুণদের মন-ইচ্ছা-জীবন যাপনের স্বাধীনতা গুরুজনকে সম্মানের নামে বাবা মা নামের নিষ্ঠুর জল্লাদের হাতে খুন হয়, যে সমাজে যেকোন ধরণের বিকাশকে অবরুদ্ধ করা হয় সেই সমাজের চেয়ে অসভ্য জান্তব সমাজ পৃথিবীতে আর কিছুই হতে পারে না। মানুষ ভিন্ন অন্য প্রাণীদের সমাজ মানব সমাজের চেয়ে সভ্য। কিছু মানুষ বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে প্রযুক্তি গড়েছে,  মানব সমাজ উন্নতি করেছে, কিন্তু মানবতা অর্জন করতে পারেনি, সভ্যতা অর্জন করতে পারেনি। এই সমস্ত অসুন্দর গুলো বাইরের পৃথিবীতে থাকলেও আমার পৃথিবীতে নেই অরুণাভ। আমার পৃথিবীতে আছে মমতা, মানুষের জন্য ভালবাসা। এ এক অনন্য সুন্দর পৃথিবী অরুণাভ। আমি গড়ে নিয়েছি একে। তুমি ভেবে দেখো, এই যে আমি তোমার সাথে এমনি করে কথা বলছি, এইভাবে কথা বলার কথা এই পৃথিবীর ৯৯.৯৯৯৯৯৯% মানুষ বা তারচেয়েও বেশী মানুষ ভাবতেই পারে না। আমাকে ওরা পাগল বলবে, আমি জানি। কিন্তু কি আসে যায় বল, আমি নিজেকে কলুষিত করে ওদের একজন হতে চাইনা। হতে পারে এটা আমার একটা ফ্যান্টাসীর জগত, হ্যাঁ কেউ বোঝে না এই জগতটা, আমি কাউকে বোঝার জন্য বলবও না, এই জগত নিয়ে যদি একজন মানুষ, এই আমি পৃথিবীতে মানুষের মত বেঁচে থাকি- সে তো অনেক!  

তোমাকে আজ একটা মজার কথা বলি। আমি যখন সদ্য এস.এস.সি পরীক্ষা শেষ করেছি, তখন আমার মায়ের মাঝে একটা অদ্ভুত রকমের পরিবর্তন এলো। তার দুইবছর আগে, আমি যখন নবম শ্রেণীতে পড়ি, তখন উচ্চতর গণিত পড়ার ব্যাপারে আমার মা একরকম ঘোর আপত্তি তুলেছিল। কারণটা ছিল এমন, আমার ছোট কাকু মাসুম সপ্তম শ্রেণীতে থাকা অবস্থায় আমাদের বাসায় থেকে পড়ালেখা করেছে। ছোট কাকু গণিতের কথা শুনলেই ভয় পেত। ম্রেটিক পরীক্ষা পর্যন্ত বাধ্যতামূলক ভাবে যেটুকু গণিত করতে হয়েছে তারচেয়ে বেশী কোনদিন করেনি। আমার আম্মুর ভাষায়, সে গণিত করত অনেকটা মুখস্থ করে। গণিত জিনিসটাকে সে এতোটাই ভয় পেতো যে বুঝতে না পারলে বোঝার চেষ্টা না করে সোজা মুখস্থ করে কাজ খতম। পরীক্ষায় কেবল মাথা থেকে নামিয়ে বসিয়ে দিতো। সে যেহেতু অন্য সব ভাইয়ের চেয়ে ভালোভাবে পড়ালেখা করার সুযোগটা পেয়েছে, তার জীবনে আকাংখাটাও ছিল তেমনই। ডাক্তার হতে চেয়েছিল সে। হয়েছে। ডাক্তার হতে তো আর গণিত লাগে না। খাটাখাটুনির জোরে ভালোভাবেই মেডিক্যাল কলেজে চান্স পেয়ে গিয়েছিল। তো আমার মা তো গ্রামের মেয়ে, গায়ের স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করার পর আর তার পক্ষে পড়ালেখা করা সম্ভব হয়নি। ততদিনে আমি কোলে এসে গিয়েছি। আমার কাকুর মত সেও গণিত কি জিনিস চেখে দেখেনি এবং ভয়টা বোধ করি মাসুম কাকুর চেয়ে বেশীই পেত। গণিত না পড়েই যখন কাকু ডাক্তার হয়ে গেল, তখন আমার মায়ের মনেও স্বপ্ন, আমিও ডাক্তার হব। তাই আমাকে কাকুর মত নিতে হবে জীববিজ্ঞান। মন দিয়ে জীববিজ্ঞান পড়তে হবে। আমার মা পড়ালেখা বলতে মুখস্থ করাকেই বুঝে, বোঝেনা আত্মস্থ করা বা গাণিতিক সমীকরণ সমাধান করা। তাই আমি যখন উচ্চতর গণিত নিতে চাইলাম, তখন আমার মা বসল বেঁকে, না কিছুতেই নিতে দেবে না। ডাক্তার হতে গণিত লাগে না, গণিত নিলে আমার রেজাল্ট যদি খারাপ হয়, যদি আমি জীববিজ্ঞান কম পড়ে গণিত বেশী পড়ি! এইসব ভয়ে রীতিমত আমাকে গণিত না নেয়ার জন্য মানসিক চাপ শুরু করল। আমি তো নেবই, বললেই হল নাকি! শেষে মধ্যস্থতা হল, বায়োলজি আবশ্যিক বিষয়, আর গণিত ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে নিতে দেবে। কিন্তু আমি যে কি ঘাড় ত্যাড়া। আমি গণিতই নেব আবশ্যিক বিষয় হিসেবে, তখনকার জীববিজ্ঞান বই দেখলে আমার গায়ে জ্বর আসতো। একটুও বোঝার কিছু নেই, খালি পাতার পর পাতা মুখস্থ কর, আমি এতো চাপ নিতে পারবো না বাবা। আমি ঠিক করে ফেলেছি ফাইনালি রেজিস্টার করার আগে গণিত আবশ্যিক করে দেব। মা উপায়ন্তর না দেখে আমার কাকাদের শরণাপন্ন হল, তারাও সবাই আমার মায়ের সাথে সুর মেলায়, আমার বাবা ছাড়া। আমার বাবা তো খুব খুশি আমার সিদ্ধান্তে। বাকি ছিল কেবল মাসরুর কাকা, যে আমাদের পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে শিক্ষিত বলে সবাই মনে করত। তো কাক যেদিন আমাদের বাসায় এলো, মা তাকে গিয়ে অভিযোগ জানালেন। ফল হল হিতে বিপরীত, কাকু নিজে ত ইঞ্জিনিয়ার সে বলে নিতে চাচ্ছে নিক না, জীববিজ্ঞান ঐচ্ছিক নিলেও মেডিকেলে ভর্তি হতে কোন সমস্যা হবে না। আমার মায়ের চোখমুখ গেল কাল হয়ে, আর আমার খুশি দেখে কে! কোনভাবেই আমাকে থামাতে না পেরে শেষে বলল, আচ্ছা ঠিক আছে, তোমার যেটা ইচ্ছা হয় সেটাই কর, তবে আমাকে একটা কথা দিতে হবে, জীববিজ্ঞানে ভালো করতে হবে, ঐচ্ছিক নিচ্ছ বলে ঐটা কম পড়া যাবে না। আমি অতশত না ভেবে বলে দিলাম আচ্ছা। সেও আর কিছু বলতে পারল না। আমি মোটামুটি ভালোই রেজাল্ট করতাম সব বিষয়ে যদিও জীববিজ্ঞানে তখন একটুও আগ্রহ পেতাম না, তবুও খারাপ করিনি কখনও। সেইদিনের কথা মনে হলে এখনও আমার বুক আনন্দে ভরে যায়, সেইদিন, সেইদিনই আমি বুঝেছিলাম, আমার ইচ্ছাশক্তি কতখানি। যমের মত যে মা আমার মনের উপর ইচ্ছেমত হুকুম চালাত, সেই মা আমার ইচ্ছাশক্তির কাছে হেরে গিয়েছিল। তখন তো বটেই, এরও অনেকদিন পর্যন্ত, বলতে গেলে আমি কোরিয়াতে চলে আসার আগ পর্যন্ত, আমার মা আমার জীবনের কোন সিদ্ধান্ত আমাকে স্বাধীন ভাবে নিতে দেয়নি। সে নিজে বেশী দূর পড়ালেখা করেনি অথচ আমার পড়ালেখার উপর জোর করে তার  সব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চেয়েছে। তবে আমিও কোনদিন হার মানিনি। অবাক হবার মত ব্যাপার হল, এস.এস.সি. তে যিনি এতোটা বাধা দিয়েছিলেন গণিত নেয়ার ব্যাপারে, সেই কিনা এইচ.এস.সি সময় আমি যাতে গণিতে পিছিয়ে না পড়ি, সেজন্য অন্য সব বিষয় বাদ দিয়ে আমার গণিতের শিক্ষক ঠিক করে ফেললেন, এমনকি আমার একাদশ শ্রেণীর ক্লাস শুরু হবার দুইমাস আগে!

মা কেন, যেই হোক না, কাউকে আমার জীবনের রাশ টেনে ধরার সুযোগটা দেয়নি। পাগলা ঘোড়ার সেইসব মানুষগুলোকে, যারা আমায় বাধা দিয়েছিল, আমার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, তাদের সব্বাইকে পিছনে ফেলে আমি আমার পথ বেছে নিয়েছি। নিজের জন্য আমার এখন আনন্দ হয় অরুণাভ, যেই বন্দী পরিবেশে আমি বড় হয়েছি সেই বন্দিত্বের শিকল আমি গুড়িয়ে দিতে পেরেছি বলে। খুব বড় বড় কিছু করিনি, আমার অর্জনগুলো খুব খুব সামান্য, কিন্তু আমি বিন্দু বিন্দু করেই সিন্ধু ছিনিয়ে নিয়েছি, আমার জীবন সিন্ধুর একটি বিন্ধুও কেউ আমার কাছ থেকে আর কেড়ে নিতে পারবে না, আমি আর কখনই কেড়ে নিতে দেব না অরুণাভ। আমার এই জয়ের সাথী যে তুমিও, তাই শুভেচ্ছা তোমাকেও। আমার মন খুশি খুশি হয়ে গেছে অরুণাভ। :)

ভালোকথা, তুমি কি জানো, কেন আমি তোমাকে এই গল্পটা বললাম? ঐযে আমার গণিতের শিক্ষক, তার রেজিস্টার খাতার একদিন একটা নাম দেখেছিলাম, নামটি ছিল শিশির। এতো ভালো লেগেছিল নামটা তখন, সেইসময় আমি যখন একা একা কথা বলতাম, তখন আমি তোমার নাম দিয়ে ফেলেছিলাম শিশির। যদিও আমি তখন বুঝতাম না, আমি কেন বারবার আনমনে কথা বলতে গেলে শিশির নামটা বলি! এখন বুঝি, আজকের অরুণাভ, গত-সপ্তাহে যাকে শর্মিলি বলে ডেকেছিলাম, সেই ছিল শিশির। কি, জানলে তো তোমার আদ্যিকালের নামটা? :)


-নীলকণ্ঠ
০৩/০৮/২০১২

Wednesday, July 25, 2012

নীলকণ্ঠের চিঠি (২৫শে জুলাই, ২০১২)

অরুণাভ,

তুমি এমন একজন মানব চরিত্র, যার জন্ম আমার মনোভূমে, কিভাবে তার জন্ম হয়েছিল ঠিক আমি বলতে পারবো না। এসো, আমরা দুজনে মিলে তোমার জন্মের ইতিহাস খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। তখন আমি এক স্কুল পড়ুয়া বালিকা ছিলাম, যার হৃদয়ের উন্মেষ হতে চলেছে একটু একটু করে। আমার মনে পড়ে, আমার হৃদয়ের উন্মেষটা যে সময়কালে হয়েছিল, সেই সময়টাকে বলা চলে আমার কৈশোর বেলা। আমি হয়ত তখন পড়ি সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণীতে। সদ্য পেরিয়েছি আমার শৈশব। কি অবাক হচ্ছ? একজন নারী বলছে তার শৈশব পেরুতে লেগে গেছে বারোটি-তেরটি বছর! হ্যাঁ, ঠিক তাই। শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে উপনীত হবার নির্দিষ্ট কোন বয়স নেই, এই রূপান্তরটি ঘটে একজন মানুষের মনের ভিতরে, তার মানসিক বিকাশের সাথে সাথে। আমাদের বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা  খুব অল্প বয়সেই ভাবতে শুরু করে তারা বড় হয়ে গেছে। আমি যখন ক্লাস সিক্স কি সেভেনে পড়তাম, তখন আমি বাদে আমার ক্লাসে আর একটি মেয়েও ছিল না, যে নিজেকে শিশু ভাবতো। তাদের তখনকার ভাবখানা ছিল তারা যথেষ্ট পরিমাণে মানসিক ভাবে পরিপক্ব, বড় হয়ে গিয়েছে তার, তাছাড়া এখনো যারা মানসিকভাবে পরিপক্বতা অর্জন করে নাই, তারা হাসির পাত্র। বুঝতেই পারছ অরুণাভ, আমি ছিলাম সেই ব্যক্তি, যে তখনো শিশুসুলভ আচরণের কারণে সমবয়সী বালিকাদের কাছে ছিল হাসির পাত্র। আমি তখন পুতুল খেলাতাম না ঠিক, তবে আমার সহপাঠিনীদের কথা, মনোভাব, চিন্তার দৌড় এসব আমি বুঝতে পারতাম না। আমি তখন সত্যকার অর্থেই একটি শিশু ছিলাম, মেয়ে হয়ে উঠিনি। আমার মাঝে কোন লিঙ্গ প্রভেদ গত বোধ ছিল না। আমি যে স্কুলটিতে পড়তাম, সেই স্কুলে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত ছেলে-মেয়েরা একসাথে পড়ত। পঞ্চম শ্রেণী থেকে ছেলেরা ভর্তি হত অন্য একটি ছেলেদের স্কুলে। তাই পঞ্চম শ্রেণী থেকে আমার কোন সহপাঠী ছিল না, ছিল কেবল সহপাঠিনী। সেই সময় থেকেই আমি কেমন একটা নতুন পরিবেশের মধ্যে পড়ে গেলাম, য পরিবেশে ঠিক খাপ খাওয়াতে পারছিলাম না আমি। আমার কাছে সহপাঠিনী ডরথী আর সহপাঠী মুশফিকের মাঝে কোন প্রভেদ ছিল না। ওরা দুজনেই যখন আমার সাথে পড়ত, তখন ওরাও পরস্পরকে প্রভেদ করত কিনা আমার জানা নেই, তবে বউচি খেলায় যে ছেলে আর মেয়েদের দল আলাদা হত মনে আছে সে কথা। এমনকি বউচি খেলা থেকে ক্লাসরুমে ফিরে এসে যে ক্লাসের মেয়েরা আমাকে বলেছিল মুশফিকের সাথে মুনার প্রেম, সেও আমার কাছে ভিনগ্রহের কোন কথা মনে হত। আমি বোকার মত বলতাম, এর মানে কি? প্রেম কিভাবে হয়? আমার এসব বোকার মত প্রশ্ন শুনে আমার চারপাশের ইঁচড়ে পাকা বালিকাদের দল যে হো হো করে হেসে ফেলত, খুব মনে আছে তা। আমি বোকা থেকে আরও বোকা হয়ে যেতাম। এখন এসব কথা মনে পড়লে আমার ঠোটে মুচকি হাসি খেলে যায়, আমার জন্য নয়, আমার সহপাঠী ইঁচড়ে পাকা বালক বালিকাদের জন্য, আমি নাহয় বোকা ছিলাম, কিন্তু ওরা আমার চেয়েও বোকা ছিল। আমি জানতাম, প্রেম কাকে বলে, আমি বুঝি না, কিন্তু ওরাও যে বোঝে না, সেটাও ওরা তখন বুঝত না। দশ বছর বয়সে বুঝতাম না, এখনও ছাই বুঝি আমি!

আমার সহপাঠীরা অন্য স্কুলে ভর্তি হবার পর থেকে সহপাঠিনীরা আরও অন্যরকম হয়ে গেল। তাদের চোখে মুখে চাপা কৌতুক আর কৌতূহল! তারা ছেলেদের ব্যাপারে যেমন আগ্রহী, তেমনি আগ্রহী  মেয়েদের ব্যাপারে। একটা পরিষ্কার লাইন টেনে ছেলে আর মেয়েদের আলাদা করে ফেলেছে। এইযে মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন, আমার তখনো সেই পরিবর্তন ঘটেনি। বয়সের তুলনায়, চারপাশের কিশোরীদের তুলনায় আমার অপরিপক্বতা আমাকে অসস্ত্বিতে ফেলে দিতো। একধরণের অচেনা সংকোচে আমি ওদের থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছিলাম। তখন আমি সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি, অথচ পিরিয়ড কি, তা জানিনা। এটা শুনে আমার ক্লাসের একটি মেয়েও আমাকে বিশ্বাস করেনি। ওরা ভেবেছিল, আমি জানি,অথচ না জানার ভান করছি। যাই হোক, যদিও বিশ্বাস করেনি কেউ যে আমি জানিনা, কিন্তু তবুও আমাকে বিপাশা বলেছিল, মেয়েদের প্রতিমাসে একবার করে রক্তপাত হয়, এটাকে পিরিয়ড বলে। তখন পরিচ্ছন্ন থাকার জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করতে হয়। তোমার যখন হবে, তখন তুমি আরও ভালো করে বুঝতে পারবে। এসব ব্যাপার আমাকে মা শিখিয়েছে, আমাদের সাথে পরা অধিকাংশ মেয়েকেই তাদের মা বা বড় বোন শিখিয়ে দেয়। তুমি তোমার আম্মুকে জিজ্ঞেস কর, আন্টি তোমাকে বুঝিয়ে দেবে। আমি বিপাশাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এটা কি কোন অসুখ? রক্তপাত কেন হয়? বিপাশা আমাকে বলেছিল, না অসুখ নয়, একটা স্বাভাবিক ব্যাপার, প্রত্যেকটা মেয়ের এটা হয়। এইসময় মেয়েদের শরীর বদলে যায়। সেই প্রথম আমি মেয়েদের শারীরবৃত্তীয় চক্র সম্পর্কে তত্ত্বীয় জ্ঞান পেয়েছিলাম, বাস্তবে বুঝেছি তারও বেশ কিছুটা পড়ে। এখন বুঝি, আমি আমার সহপাঠিনীদের চেয়ে কেবল মানসিক ভাবে  অপরিপক্ব ছিলাম না, শারীরিক ভাবেও ছিলাম, আমার মনো-দৈহিক পরিবর্তনগুলো খানিকটা ধীরে হয়েছে।

এই মনো-দৈহিক ব্যবধানটা আমি বাস্তবে আর কোনদিনই অতক্রম করতে পারিনি। আমার যখন শৈশব পেরিয়ে কৈশোর এলো, চিন্তায় মননে কিছুটা পরিপক্বতা, স্থিরতা এলো, তখন আমি আগ্রহী হয়ে উঠেছি চারপাশের অনেক অজানাকে জানতে। তখন থেকেই আমার সাহিত্য পাঠ শুরু হল। আগেই বলেছি, আমি আমার সহপাঠীদের সাথে ব্যবধানটা অতিক্রম করতে পারিনি, তাই আমার কোন বন্ধুও ছিল না, যার সাথে চিন্তা ভাবনার আদান প্রদান আমি করতে পারি। তাই বড় হয়ে উঠতে থাকলাম একা একাই, চুপচাপ বসে বসে অন্যদের দেখি, বুঝতে চেষ্টা করি আর প্রচুর বই পড়ি। আমার এই পাঠভ্যাসটা আমাকে শানিত করে তোলে, আমি ভিতরে ভিতরে একজন ভিন্ন মানুষ হয়ে উঠতে থাকি। সেই সাথে আগের চেয়ে ভালো রেজাল্টও করতে শুরু করি। তাই আমার সম্পর্কে ক্রমাগত অন্যদের ধারনা হয়ে উঠতে থাকে, পড়ুয়া ছাত্রী, আগ্রহের শেষ নেই, একটু পাগলাটে এবং অপরিপক্ব। বন্ধুদের আড্ডায় যেহেতু আমার সময় কাটেনা, তাই আমি মেতে উঠি আবৃত্তি, বিতর্ক অথবা কুইজ প্রতিযোগিতায়। জ্ঞান বিজ্ঞানের বদ্ধ জানালাটা খুলে যায় আমার চোখের সামনে। এই ভিন্ন-ধারার একাকী কৈশোরটাই আমাকে টেনে নিয়ে যায় বুদ্ধির চর্চার জগতে। সাথে ছিল আমার বাবা, যে কিনা তার জানা যেকোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করতো তার কিশোরী মেয়েটির সাথে। আমি কখনই বলবো না, আমার বাবা মহাজ্ঞানী, অনেক কিছু জানেন। তবে আমার বাবা যেটুকু জানতেন, সেটুকুই উদার হস্তে শিখিয়েছেন আমাকে। তার সবচেয়ে বড় অবদান, আমাকে চিন্তা করে শেখানো। তিনি এমন করে আমার সাথে আলোচনা করতেন, যে আমার চিন্তা না করে উপায় ছিল না। এভাবেই পার করেছি আমি আমার কিশোর-বেলা।

এইবার কিঞ্চিত প্রসঙ্গে ফিরি, বুঝতে চেষ্টা করছিলাম, কিভাবে আমার মাঝে জন্ম হল তোমার। আমি যে আমার কিশোর-বেলায় অনেক বই পড়তাম, সে কেবল পাতার পর পাতা উলটে নয়, প্রত্যেকটা অক্ষরের সাথে মিশে গিয়ে। আমি যখনই যা কিছু পড়তাম, সেইসব কিছুর সাথে আমার একটা আত্মিক যোগাযোগ গড়ে উঠত। আমি গ্রহণ করতাম, যা কিছু গ্রহণযোগ্য। আমি মনে মনে ভাবতাম, আমি আসলে কেমন মানুষকে খুঁজি? আমি আমার বন্ধু হিসেবে চাইবো এমন মানুষকে, যার সাথে আমি কথা কইতে পারবো, আলোচনা করতে পারবো। যে আমার মত, আমার মত স্বপ্ন দেখে, চিন্তা করে, অবশ্যই সৎ এবং সাহসী, হৃদয়ে যা কিছু আছে, তা সাহসের সাথে প্রকাশ করতে পারো, ভিতরে এবং বাহিরে আদ্যোপান্ত একই মানুষ। এমনি করেই আমি আমার মনের মধ্যে গড়ে ফেলেছিলাম আমারই এক প্রতিবিম্ব। কিন্তু আমি এটা বুঝতাম না, এমনকি কখনও ভাবতামও না, এ আমার কল্পনা, বাস্তব পৃথিবীতে তার কোন অস্তিত্ব নেই।  এই অনুধাবনটা আসতে আমার কত বছর বয়সে পৌছুতে হয়েছে? ছাব্বিশ/সাতাশ বছর। তুমি সেই প্রতিবিম্ব অরুণাভ, যাকে আমি ভেবেছিলাম, বাস্তব। যাকে আমি আরোপ করতে চেয়েছিলাম রক্ত মাংসের মানুষের দেহে। আমি মানুষ সৃষ্টি করতে পারিনা অরুণাভ, পারলে হয়তো, একটি মানব দেহ তৈরি করে তাতে তোমায় আরোপ করে নিতাম। তাই তুমি রয়ে গেছ আমারই চিন্তায়, আমারই কল্পনায়। এইতো কিছুক্ষণ আগে তোমার নাম দিয়েছি অরুণাভ। গতকাল থেকেই তোমার একটা নাম খুঁজছিলাম আমি, মনের মত নাম পাচ্ছিলাম না। আজ পেয়েছি, তবে নিশ্চিত করে বলতে পারিনা, আই তোমাকে আর কোন নামে ডাকবো না। গতকালই তোমাকে ডেকেছিলাম শর্মিলী বলে। নামটা আমার তেমন বেশী পছন্দ হয়নি। আজ যখন মাথায় অরুণাভ নামটা এলো, তখনই ঠিক করে ফেললাম, আমার কল্পলোকের প্রতিবিম্বটির নাম হবে অরুণাভ!

-নীলকণ্ঠ
২৫শে জুলাই, ২০১২।

Wednesday, July 18, 2012

অপরাজিত অপরাজেয় - সত্যজিতের কীর্তি!

সত্যজিৎ রায়ে সাথে আমার পরিচয় তার লেখা রহস্যোপন্যাসে। এমনই ছিল সে মুগ্ধতা, সে বিভোরতা, ফেলুদা হয়ে উঠেছিল এক চরিত্র- যে বাস্তব নাকি কল্পনা, ভাবার সময় পাইনি আমি। প্রথম হাতে নিয়েছিলাম বাদশাহি আংটি। এরপর কতদিন কেটেছে ফেলুদার সাথে এখন আর মনে করে উঠতে পারিনা। সেই স্কুল-বেলার গল্প! ফেলুদাতে এমন ভাবে মজে গিয়েছিলাম, যে এর লেখককে আর মনেই পড়ত না আমার। এইদিক থেকে সত্যজিৎ আমার কাছে আসলেই আলাদা। রবীন্দ্রনাথের যে কোন সৃষ্টিতে হাত দিলে সৃষ্টির চেয়ে বেশী মনোযোগ পায় স্রষ্টা। কারণ চারপাশে যাদের দেখি সবাই রবীন্দ্রনাথ পড়ে, সব্বাই। রবীন্দ্রনাথ না পড়া, মূর্খতার শামিল। তাই আমিও পড়ি। বুদ্ধি হবার আগ থেকে বাসায় টেপ রেকর্ডারে রবীন্দ্রসংগীত বেজে বেজে এমন অবস্থা ছিল, গান মানেই বুঝতাম রবীন্দ্রসংগীত। তা নাহয় ধরলাম রবীন্দ্রনাথের কাহিনী আলাদা, সে নোবেলজয়ী, উপমহাদেশের সাহিত্য বলতে সবার আগে তার নাম উচ্চারণ হয়। কিন্তু বাকিদের বেলায়? নজরুলেও তো তাই। বেগম রোকেয়া, শামসুর রাহমান, হালের হুমায়ুন আহমেদ, মুহাম্মদ জাফর ইকবাল প্রমুখের যত লেখা পড়েছি, সে ঐ নাম দেখেই পড়েছি। ব্যতিক্রম দেখি একমাত্র সত্যজিতে। সত্যজিৎ রায়ের নাম দেখে আজো আমার পড়া হয়নি কিছুই, তবে যা পড়েছি পড়া হয়ে গেছে। সত্যজিতের সৃষ্টি কর্ম হাতে এসে গেছে, পড়া হয়ে গেছে, সত্যজিতের নাম দেখে হাতে নিতে হয়নি আমার। তার প্রত্যেকটা সৃষ্টি যখনই হাতে নিয়েছি, কি মায়া মন্ত্রবলে এক্কেবারে তাতে মিশে গেছি! বইয়ের ফ্ল্যাপ দেখার সময়টা হয়নি আর। একজন লেখক তখনই সত্যিকার অর্থে সার্থক হয়ে উঠে, যখন তার সৃষ্টি দিয়ে ভুলিয়ে দিতে পারে স্রষ্টাকে, তার সৃষ্টিই এতো বেশী জীবন্ত, বাকি সব তার পাশে নগণ্য। ফেলুদা এমন জীবন্ত হয়ে মনে ভাসে, মনেই পড়ে না, ফেলুদার কারিগর যে সত্যজিৎ রায়। এতো গেলো আমার কথা, আমার বোনের রোজ রাতে মাথার কাছে ফেলুদা সমগ্র না থাকলে ঘুম হয় না। ও ফেলুদা পড়তে পড়তে একটা সময় ঘুমিয়ে পড়বে, তারপর আমি ওর বালিশের পাশ থেকে সরিয়ে নেব বইটা, এই ছিল রোজকার ঘটনা। বহুবার পড়া একেকটা গল্প, তবু যেন আমার বইপোকা বোনটার আশ মিটে না।

ব্যক্তি সত্যজিৎ রায়কে তেমন একটা জানাই হয়নি আমার ইতিপূর্বে। এবার অনেকটা এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ হাতে নিলেম "অপুর পাঁচালি"- সত্যজিৎ রায়ের জীবন চরিত। অপুর পাঁচালি হাতে নিয়ে গোগ্রাসে গিলেছি... সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে এর আগেও একটা বই পড়েছি, সেসব পড়া থেকে সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে যে চিত্রটা মনে মধ্যে গাঁথা ছিল, একজন প্রাণপূর্ণ কর্মোচ্ছল মানুষ। এবারেই প্রথম বুঝলাম আমার ধারনাটা কতখানি সত্য ছিল। সত্যজিৎ রায়- এমন একজন কর্মী মানসের নাম, যার জীবন চরিতের পরতে পরতে কর্মের গল্প। সত্যজিৎ রায়ের কাজ দেখলে মনে হয়, প্যাশন ডিকশনারির পাতায় বর্ণিত কোন বিমূর্ত শব্দ নয়, প্যাশন ছুঁয়ে দেখা যায়, আঙ্গুল দিয়ে সত্যিকার অর্থে স্পর্শ করা যায়। সত্যজিৎ রায় তার জীবন-জুড়ে যত কর্মের মাঝে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন, তার মাধ্যমেই মূর্ত হয়ে উঠেছে কাজের প্রতি তার গভীর ভালোবাসাটা। জীবনটাকে কতটা উচ্ছলতা, কতটা কর্ম, কতটা উত্তেজনায় ভরিয়ে দেয়া যেতে পারে, তার একটা ধারনা পাওয়া যেতে পারে অপুর পাঁচালি বইটা থেকে। তার জীবনের শেষ সময়ে লেখা "অপুর পাঁচালি" প্রমাণ করে, সত্যজিৎ একটি চির-তরুণ মানসের নাম।

বইটির শুরুতেই সত্যজিৎ রায়ের স্ত্রীর লেখা মুখবন্ধ, সত্যজিতের নয়। আগ্রহ নিয়ে পড়লাম, সত্যজিতের আত্মচরিতে কেন বিজয়া রায়ের লেখা মুখবন্ধ! পড়ে যা বুঝলাম, তার সার কথা হল, সত্যজিৎ রায় তার প্রত্যেকটা লেখা শেষ করে যাকে সবার আগে পড়তে দিতেন, তিনি বিজয়া রায়। সত্যজিৎ এবং বিজয়ার আগ্রহ, মানসিকতা বাঁধা ছিল একই সুতোয়। বিজয়া খুব ভালোভাবে পরিচিত ছিলেন সত্যজিতের কাজের সাথে, কাজের ছন্দটা সাথে মিশিয়ে দিতে পারতেন নিজেকে অনায়াসে। সত্যজিৎ যখন "অপু" -এর প্রথম ড্রাফটটা শেষ করলেন, তখন অন্য সববারের মত এইবারে দিলেন না স্ত্রীর হাতে তুলে ভুল চুক দেখিয়ে দেবার জন্য, বরং ডুবে গেলেন আরেক কাজে। বিজয়া যখন জানতে চেয়েছিলেন, তখন বিজয়াকে বলেছিলেন, এখন নয়, "অপু"-তে কিছু ঘষামাজার কাজ বাকি আছে, শেষ হলেই তিনি বিজয়াকে পড়তে দেবেন। এই-ঘটনার তিনমাসের মাথায় সত্যজিৎ প্রথমে হাসপাতালে, অতঃপর ইহলোক ছেড়ে গেলেন। এরই মাঝে "অপু"র ঘষামাজা শেষ করে ফাইনাল ড্রাফট তৈরি করেছিলেন। কিন্তু সত্যজিতের মৃত্যুর পর তার ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পাওয়া যায়নি "অপু"র ফাইনাল ড্রাফটটি। চুরি গেছে ফাইনাল ড্রাফটটি, রয়ে গেছে প্রথমটি। সত্যজিতের ছেলে সন্দীপ তাই এনে দিলেন মায়ের হাতে, আর বললেন, মা, তুমি ছাড়া আর কেউ নেই এইখান থেকে কিছু উদ্ধার করে। বিজয়া খাতা খুলে দেখেন, অজস্র কাটাকুটিতে ভরা সে খাতা, কিচ্ছু বোঝা যায় না। আসলেই কারোর সাধ্য নেই ঐ কাটাকুটি ভরা খাতার মর্ম উদ্ধার করার। বিজয়া প্রথম বার দেখে বন্ধ করে দিলেন, এরপর আবার দেখলেন, তারপর আবার, তৃতীয়বারে যেন মনে হল, কিছু বুঝতে পারছেন। এইভাবেই "অপুর পাঁচালি" উদ্ধার করা গেল সত্যজিতের মৃত্যুর পরে। বিজয়ার বর আফসোস রয়ে গেলো, ফাইনাল ড্রাফটে নিশ্চয় সত্যজিৎ আরও অনেক পরিমার্জন করেছিলেন, সেগুলো আর জানা হল না। পড়তে বসে বুঝেছি, বিজয়া তার জীবন সঙ্গী সত্যজিতের সাথে কতটা একাত্ম হলে এমন নিপুণ ভাবে উদ্ধার করে আনতে পারেন "অপুর পাঁচালি", যা বিজয়ার মাঝে মৃত্যু শোক ভুলিয়ে এনেছিল সত্যজিতের বয়ানে সত্যজিৎকে তুলে ধরার প্রচেষ্টা।

সত্যজিতের আত্মচরিতের শুরুতেই উঠে এসেছে এক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সমৃদ্ধ পরিবারের কথা। সত্যজিৎ রায়ের দাদা উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর বহুমুখী প্রতিভার চিত্রকল্প। উপেন্দ্রকিশোর একাধারে সংগীতজ্ঞ, আঁকিয়ে, ছাপা-শিল্পের প্রবর্তক, শিশুসাহিত্যের পথিকৃৎ। এই মানুষটি তার অজস্র সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাবার পাশাপাশি পরিবর্তন আনেন উপমহাদেশের প্রিন্টিং প্রযুক্তিতে। সেই সময়ের, ১৮৮৫ সালের ভারতে যে ছাপা-শিল্পের প্রচলন ছিল ভারতে, তাতে তিনি সন্তুষ্ট না হয়ে নিজ খরচার বিলাত থেকে আমদানি করেন চাপার আধুনিক যন্ত্রপাতি, এবং হাফটোন ব্লক প্রিন্টিং নিয়ে নিজে লিপ্ত হন গবেষণায়। সেইসাথে পত্তন করেন নিজেদের ছাপাখানা ইউ রায় এন্ড সন্স। সেখান থেকেই পরবর্তীকালে প্রকাশ হত শিশুতোষ পত্রিকা "সন্দেশ" যার জন্য লেখালেখির কাজ তো তিনি করেনই, সাথে সন্দেশের অলংকরণের কাজও তিনি নিজের কাঁধেই তুলে নেন। ছাপা-শিল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই বোধ হয় উপেন্দ্রকিশোর তার মেঝো-ছেলে এবং পরবর্তীকালের প্রখ্যাত ছন্দের যাদুকর ছড়াকার সুকুমার রায়কে পাঠান বিলেতে ছাপা-শিল্পে শিক্ষা গ্রহণ করতে। তার বিলাত থাকাকালীন সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিলাতে বেড়াতে যান এবং সুকুমার রায়ের লেখা একটি ইংরেজি প্রবন্ধের মাধ্যমের ইংরেজ সমাজ পরিচিত হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তার সৃষ্টি কর্মের সাথে (তথ্যসূত্র: সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় সুকুমার রায়কে নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র )। যাই হোক, তিনি বিলাত থেকে ফিরে এসে নিজেদের ছাপাখানা দেখাশোনা, নতুন পদ্ধতিতে হাফটোন ব্লক প্রিন্টিং-এর প্রচলনের পাশাপাশি নানাবিধ ছড়া সৃষ্টিতে নিয়োজিত হন। আবোল তাবোল, হ-য-ব-র-ল, পাগলা দাশু ইত্যাদি তার সেই সময়ের কাজ। এইসব সৃষ্টিকর্ম তাকেও জনপ্রিয় করে তোলে শিশুসাহিত্যিক হিসেবে। মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে মারা যান এই এই প্রতিভাবান ছড়াকার, রেখে যান তিন বছর বয়সী একমাত্র সন্তান সত্যজিতকে। সত্যজিৎ বড় হন তার মামার আশ্রয়ে। সে জীবনে তাদের অর্থকষ্ট ছিল ভালোই। সত্যজিতের মা সংসারের কিছু বাড়তি আয়ের জন্য কলকাতার একটি লেডিস ক্লাবে সূচীকর্ম শিখাতেন। কিন্তু এমন বিরূপ অবস্থাতেও আমি বলব সত্যজিতের মা ওঠা সুকুমার রায়ের স্ত্রী সুপ্রভা দেবী ছিলেন উদার মনের মানবী। সত্যজিৎ যখন পরিবারের অর্থকষ্টের কথা মাথায় রেখে বিএ পাশের পরেই চাকরীতে ঢোকার কথা চিন্তা করছিলেন, তখন সুপ্রভা দেবীই ওসব চিন্তা ছাড়িয়ে তাকে শান্তিনিকেতন ছবি আঁকা শিখতে পাঠান।

সত্যজিতের ঝোঁক ছিল প্রফেশনাল আর্টে। তিনি যখন শান্তিনিকেতনে গেলেন, সেইখানে তার ছবি আঁকার কারণে মাঝে মাঝে শান্তিনিকেতনের বাইরের গ্রামে গিয়ে ছবি আঁকতে হত। শহুরে পরিবেশে বড় হওয়া সত্যজিতের কাছে গ্রাম তার অপার সৌন্দর্য নিয়ে ধরা দেয় এই প্রথম। কিন্তু এইখানে এসেই তিনি অনুধাবন করেন, তার জীবনের মূল আগ্রহ, চলচিত্র থেকে যেন তিনি বঞ্চিত হচ্ছেন। কলেজে পড়বার সময়েই তার ঝোঁক চলে যায় চলৎচিত্র নির্মাণের কৌশলের দিকে। তখনও ভাবেননি তিনি কোনদিন চলচিত্রকার হবেন, কিন্তু ঝোঁকটা তিনি বুঝতে পারতেন। আরেকটা ব্যাপারে তিনি অস্বস্তিতে ভুগতেন, বাহিরে যখন বিশ্বযুদ্ধ, তখন শান্তিনিকেতনের ভিতরে যেন শুনশান নিরিবিলি পরিবেশ। জগতের উত্তাল সময়, যুদ্ধের উত্তাপ, মানবের স্বাভাবিক জীবন-চিত্র কিছুই যেন শান্তিনিকেতনের পরিবেশে ছাপ ফেলে না। সেই একই ভাবে তারা নিরিবিলি ছবি আঁকছেন, একইভাবে সন্ধ্যায় নাটকের আয়োজন হচ্ছে, একইভাবে শিল্প চর্চা হচ্ছে, এ যেন শিল্পের জগতে গিয়ে বাস্তব পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। যেদিন কলকাতায় জাপানীরা বোমা বর্ষণ করে, সেদিন  সত্যজিৎ আড়াই-বছরের মাথায় ছবি আঁকার পাঠ অসমাপ্ত রেখে শান্তিনিকেতন ছাড়েন। সেইদিন তিনি কলকাতার কোন এক প্রেক্ষাগৃহে বসে মনে তৃষ্ণা মিটিয়ে চলচ্চিত্র দেখেন। কেমন এক অসাধারণ তৃপ্তির পরশ যেন তার মনের মধ্যে বয়ে যায় সেই সময়ে।

শান্তিনিকেতন ছাড়ার সময় তিনি তার শিক্ষকে বলে এসেছিলেন, তিনি প্রফেশনাল আর্টে আগ্রহী, তাই ছেড়ে যাচ্ছেন শান্তি নিকেতন। তাই যথারীতি তার মাথায় ঘুরতে থাকে নতুন কিছুর চিন্তা। এইসময় আমরা দেখি, মানে আসলে তার আত্মচরিতের বর্ণনায় আমার মনে যে চিত্রকল্পটি ভেসে ওঠে, সেটি হল, সত্যজিৎ যেন কোন কিছুতে কোন তাড়া নেই এমন ভঙ্গিমায় প্রতিদিন খবরের কাগজ খুলে দেখতে থাকেন কাগজের বিজ্ঞাপন গুলো। আর কি যেন ভাবতে থাকেন, কি যেন খোঁজেন তাতে। তার লেখা বর্ণনায় আমরা পেয়েও যাই সেই উত্তর। তার মনে হতে থাকে, কিছু কিছু বিজ্ঞাপন আলাদা হলেও তাতে কেমন একটা যোগসূত্র পেয়ে যান। খোঁজ নিয়ে দেখেন, সেই বিজ্ঞাপন গুলো একই কোম্পানির তৈরি করা। একই শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় কেমন একটা প্যাটার্ন খুঁজে পান। এরপরই, শান্তিনিকেতন থেকে আসার চার মাসের মাথায় বিজ্ঞাপনী সংস্থা কিমারে যোগদান করেন তিনি। সত্যজিতের চলৎচিত্রকার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করার আগে তিনি এই কিমারেই চালিয়ে গেছেন তার কর্মযজ্ঞ। একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার আর্ট ডিরেক্টর থেকে চলৎচিত্রকার হিসেবে আত্মপ্রকাশের পিছনে তার এইখানে কাজের সময়ে মানুষদের সাহচর্য তাকে যথেষ্টই সাহায্য করেছিল। পথের পাঁচালির পুরো শুটিং তিনি বিভিন্ন সময়ে কিমারের কাজ থেকে ছুটি নিয়ে নিয়ে করেছিলেন। পথের পাঁচালির সাফল্যই তাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় তার স্বপ্নের জীবনে, তার এই যাত্রাটা আমার দৃষ্টিতে স্বপ্ন যাত্রা। কিভাবে একজন মানুষ স্বপ্নের পথে হাঁটতে পারে, তার উদাহরণ সত্যজিতের স্বপ্ন-যাত্রা!

চলচ্চিত্রকার সত্যজিতের জন্ম বোধ করি চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শক হিসেবে। সংগীত আর চলচ্চিত্রে তার অনুরাগ ছিল, চারপাশের সাধারণ মানুষের মতই। আগ্রহ ছিল অভিনেতা অভিনেত্রীর অভিনয়ে। কিন্তু কলেজে ওঠার পরই তার মনোযোগ ঘুরে যায় চলচ্চিত্রের তাত্ত্বিক দিকে, তাঁর ভাষার তার চোখের সামনে খুলে যেতে থাকে নতুন এক আশ্চর্য জগত, এই রূপকথার সোনার কথাটি যেন বুলিয়ে গেলো সেই সময়ে পড়া পুডভকিনের দুখানা বই, বই দুটির নাম উল্লেখ করেন নি তিনি অপুর পাঁচালিতে। তবে তিনি উল্লেখ করেন সাইট এন্ড সাউন্ড নামে একখানে পত্রিকার, যার গ্রাহক হয়েছিলেন তিনি। ক্রমেই পরিচিত হতে শুরু করেন ফিল্ম মেকিং-এর কৌশলের সাথে। তিনি চলচ্চিত্র দেখতে শুরু করেন নতুন এক দৃষ্টি ভঙ্গী থেকে, কোথায় পরিচালক অ্যাকশন বলেছে, কোথায় কাট করেছে, এইসব যেন তার চোখে ভেসে উঠতে থাকে। এবার তার নায়ক হয়ে ওঠে পর্দার পিছনের মানুষটি যার পরিচালনা ধারণ করা হয়ে দৃশ্যগুলি। এভাবেই জন্ম নিয়েছিল পরিচালক সত্যজিৎ।  তার এর রূপান্তরের কথা যখন পড়ি, উচ্ছ্বাস জাগে, কিন্তু আমি নিজে খুব সাধারণ একজন দর্শক বলে, যে চলচ্চিত্র দেখে সময় কাটাতে, গল্পের লোভে, আবেগের লোভে, সেই আমি তো ঠিক বুঝতে পারিনা, কেমন ছিল সত্যজিতের উচ্ছ্বাসটা।

সত্যজিৎ তরুণ বয়সে প্রথম যে চিত্রনাট্য লিখেছিলেন, সেটি রবিঠাকুরের ঘরে বাইরে উপন্যাসকে উপজীব্য করে, কিন্তু প্রযোজকের সাথে চিত্রনাট্য পরিবর্তন সম্পর্কে মনোমালিন্য হওয়াতে সেই ছবি তখন আর নির্মাণ করা হয়নি। কিন্তু উনিশশো তিরাশি সালের দিকে ঠিকই তিনি নির্মাণ করেন "ঘরে বাইরে" তখন একবার দীর্ঘদিন আগে লেখা চিত্রনাট্যটাতে চোখও বুলান, আর অনুভব করেন, সেদিন ঘরে বাইরে যদি নির্মাণ হত, তবে সত্যজিতের কোনদিন পরিচালক হয়ে ওঠা হত না, সবকটা পাপড়ি মেলে বিকশিত হবার আগেই তিনি ঝরে যেতেন অসম্ভব রকমের কাঁচা কাজের জন্য।

পরিচালক সত্যজিৎ যখন আত্মপ্রকাশ করেন তখন তিনি তার প্রথম ছবি, "পথের পাঁচালি"তেই সমগ্র বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছিলেন তার মেধার কথা। শুরুটা কেমন যেন নিরস ধরণের। কিমারে কাজ করতে গিয়ে তার পরিচয় হয় ডি. কে. গুপ্তা নামে এক ভদ্রলোকের সাথে, যিনি কিমারে কাজের পাশাপাশি চালু করেছিলেন সিগনেট প্রেস নামে একটি বইপ্রকাশের প্রতিষ্ঠানও। এই প্রতিষ্ঠান যেসব বই বের হত, সেসবের অনেকগুলোর প্রচ্ছদ অংকন করতেন সত্যজিৎ রায়। একবার ডি.কে গুপ্তা ঠিক করলেন পথের পাঁচালীর সংক্ষেপণ করে কিশোর সংস্করণ বের করবেন আর তার প্রচ্ছদ আঁকাবেন সত্যজিৎ রায়কে দিয়ে। এদিকে সত্যজিৎ তখনও পড়েননি মূল বইটিই। ডি.কে. গুপ্তার নির্দেশে তিনি হাতে নিলেন পথের পাঁচালী, পড়ে তো তিনি মুগ্ধ। সাথে সাথে মাথায় খেলে গেল, এই বই থেকে হতে পারে একটা চমৎকার ছবি। কোনদিন যদি ছবি নির্মাণ করেন তবে পথের পাঁচালি তিনি নির্মাণ করবেনই। এবং তার পরিচালক জীবন সত্যিই তিনি শুরু করেছিলেন "পথের পাঁচালি" দিয়ে।

সত্যজিতের সাথে তার সেই তরুণ দুরন্ত সময়ে পরিচয় হয়েছিল এক-ঝাঁক ফিল্ম পাগল মানুষের, তাদের নিয়েই সত্যজিৎ গড়েছিলেন কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি, যাদের কাজ ছিল প্রত্যেক শনিবারে একসাথে বসে ফিল্ম দেখা আর ফিল্মের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা। পথের পাঁচালির শুটিং যখন তিনি শুরু করেন, পাশে পেয়েছিলেন এই ফিল্ম সোসাইটিটাকেই, এই দলটা কিভাবে যেন রূপান্তরিত হয়ে গেল শুটিং ইউনিটে, কেউ ভাবছে না শুটিং করে ক'টাকার রোজগার হবে, কিন্তু কি উৎসাহের জোয়ারে ভেসে তারা শুরু করতে যাচ্ছে একটি চলচ্চিত্রের শুটিং। তারা প্রযোজক খুঁজে চলেছে হন্নে হয়ে, কি রাজি নয় অর্থ লগ্নি করতে। আর হবেই বা কেন? এই দলটির না আছে কোন অভিজ্ঞতা, না আছে প্রচলিত ধারার চিত্রনাট্য। পুরো মুভিতে নেই নায়ক-নায়িকা, নেই সাজ সজ্জা, নেই নৃত্য-গীত... লোকে কেন আসবে এই চলচ্চিত্র দেখতে! তখনকার ভারতে চলচ্চিত্র বলতে মানুষ যা বুঝত, তারা মোটেও সেই ধারার কিছু নির্মাণ করতে চাইছে না। তারা চলচ্চিত্র বানাতে চায় একটা আর্ট-ফর্ম হিসেবে, অর্থ উপার্জনের পন্থা হিসেবে নয়। তারুণ্যের জোয়ারে কত অদ্ভুত স্বপ্নই না আসে মনে। তাই প্রযোজকরাও রাজি হল না তার ছবিতে টাকা ঢালতে।  অবশেষে একজন রাজি হল, তার সম্প্রতি একটি ছবিতে বেশ ব্যবসা হয়েছে, তাই আরেকটি ছবিতে লগ্নি করেও বেশ কিছু টাকা হাতে আছে। তিনি তখন ৭০ হাজার টাকার মোট বাজেটের মধ্যে ৪০ হাজার টাকা দিলেন সত্যজিতের দলের হাতে, তবে শর্ত হল, অর্ধেক শুটিং-এর পরে যদি দেখেন কাজ হয়েছে ভালো, তবেই তিনি বাকি টাকা দেবেন। তারা তাতেই রাজি- বিশ্বাস ছিল, প্রমাণ করতে পারবেন তারা নিজেদের। ততদিনে ঐ ভদ্রলোক আরেক ছবিতে মার খাওয়ায় অর্ধেক শেষ করবার পরে ঐ ভদ্রলোকের কাছ থেকে বাকি টাকা আর তারা পাননি ছবিটা শেষ করার জন্য। আটমাস বিরতির পর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের অনুদানে শেষ হয় পথের পাঁচালি ছবিটি। পথের পাঁচালির খন্ড খন্ড মেকিং-এর কথা পড়লে মনে হয়, এটা ছিল একটা অ্যাডভেঞ্চার, কি এক দারুণ নেশায় পেয়ে বসা একদল তরুণ এগিয়ে চলেছে অজস্র বাধা পেরিয়ে। এর পরিচালক, ক্যামেরাম্যান, আর্ট ডিরেক্টর, আর্টিস্ট সবই নতুন, কারোর নেই কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা, একমাত্র হরিহর চরিত্রে অভিনয় করা কানু বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়া... অথচ এই ছবিটিই কিনা একই সাথে দেশে- বিদেশে সাড়া জাগানো ছবি। দর্শকদেরও কি ভীমরতি হয়েছিল, সুন্দরী নায়িকার উপস্থিতি-বিহীন চলচ্চিত্র হওয়া স্বত্বেও তারা হলে এসেছে, এসে এই অবিমিশ্র দারিদ্রের ছবি দেখেছে, গ্রাম বাংলার সত্যিকারের রূপ দেখেছে, পানাপুকুর, জলফড়িঙ্গের ছোটাছুটি দেখেছে, অপু-দূর্গার চরিত্রে অভিনয় করা দুটি শিশুর আন্তরিকতায় মিশে গেছে। সত্যজিৎ ও তার দল হেঁটেছিল স্বপ্নের পথে, আর দর্শকেরা এরা সেই পথের ভিতরের দরজা খুলে দিয়েছিল সত্যজিতের জন্য। এই চলচ্চিত্র নির্মাণের পরেই সত্যজিৎ সিদ্ধান্ত নেয়, চলচ্চিত্র তৈরিই হবে তার পেশা, যার সাথে জড়িয়ে আছে তার উদ্দীপনা আর ভালবাসা!

পথের পাঁচালির অভিনয়েও কোত্থেকে কোত্থেকে ধরে আনতে লাগলেন আনকোরা সব অভিনেতা, যারা আগে করেনি অভিনয়। স্ক্রিপ্টের সাথেকে মিলিয়ে মিলিয়ে মানানসই অভিনেতা-অভিনেত্রীদের খুঁজে আনলেন, কেউ বন্ধুর বউ, কেউ স্কুলের ছাত্র ছাত্রী, ইন্দির ঠাকুরণের চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছিলেন, তিনি যেন এই ছবিতে অভিনয় করার জন্যই বেঁচে ছিলেন। ৮০ বছরের থুত্থুড়ে বুড়ি এক থিয়েটার কর্মী চুনিবালা, যে বিগত ৩০ বছর কোন অভিনয় করেনি। একমাত্র হরিহরের চরিত্রে নিলেন একজন প্রফেশনাল অভিনেতাকে। তারও ভাব-সাব এমন, এ কি অভিনয়, মুখে এরা একফোঁটা রঙ দেবে না... এইভাবে অভিনয় কেউ করেছে নাকি! অথচ সত্যজিৎ এসব করে গেলেন কেবল মাত্র একটি দিককে গুরুত্ব দিয়ে, তার নির্মিত ছবি হবে জীবন্ত, বাস্তবের প্রতিচ্ছবি, কোন মেকি ভাবের ছিটেফোঁটা থাকবে না তাতে।

সত্যজিতের লেখা থেকে জানতে পারি, এইসব আনকোরা শিল্পীরাই তার নির্দেশনায় হোক আর সহজাত ভাবেই হোক, সাবলীল অভিনয় করেছিলেন, পথের পাঁচালি যখন আমি বসে বসে দেখছিলাম, তখন সত্যজিতের কথার সত্যতার প্রমাণটাই পেয়েছি আমি। সত্যজিতের ভাষায় একমাত্র অপুর চরিত্রে অভিনয় কারী ছয় বছরের বাচ্চা সুবীরকে দিয়ে অভিনয় করাতেই কষ্ট হয়েছে, নানান কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছে। কাশবনের দৃশ্যটাতে প্রাণ আনতে সুবীরের পথে কাঠ ফেলে রাখতে হয়েছে যাতে সুবীরকে সেটা লাফিয়ে পেরুতে হয়, এদিক থেকে ওদিক থেকে বিভিন্ন জনকে দিকে সুবীর সুবীর বলে ডাকতে হয়েছে যাতে সুবীর সেদিকে ঘুরে তাকায় যেটা দেখলে সত্য মনে হয় সে এদিক ওদিক ঘুরছে দূর্গাকে খুঁজতে। হয়ত অদ্ভুত শোনাবে, তবে আমার কাছে অসাধারণ লেগেছে সুবীরের অভিনয়। যদি ঐটুকু শিশুর কাছ থেকে অভিনয় আশা করা যায় না, কিন্তু সুবীরের বড় বড় চোখের চাহনি যেন সব পুষিয়ে দিয়েছে, অপুর চরিত্রটাকে সার্থক করে তুলেছে ঐ বাচ্চা ছেলেটা।

অপু ত্রয়ীর শেষ ছবি অপুর সংসার আমার আগেই দেখা ছিল, সেখানেও সবচেয়ে মন কেড়েছে আমার অপুর ছেলে কাজলের ভূমিকায় অভিনয় করা শিশুটি। সেটা সত্যজিতের কৃতিত্ব বলব আমি, সত্যজিৎ  রায় যেভাবে  ঝোপ জঙ্গলের মাঝে কাজলের পা টিপে টিপে হাটার দৃশ্য ধারণ করেছে, বাবার অপেক্ষায় থাকা কাজলকে দিয়ে বলিয়েছে, বাব এলে বলে দেব, মন ছুঁয়ে যায়। খুব অল্প সময়ের জন্য কাজলের উপস্থিতি দেখালেও কাজলকেই পুরো ছবির মধ্যে আমার সবচেয়ে আকর্ষণীয় চরিত্র মনে হয়েছে। আর যা কিছু আকর্ষণীয় মনে হয়েছে, সে হল অপুর ভূমিকায় অভিনয় করা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় আর সত্যজিতের ছবির আর্ট ডিরেক্টরের সাজানো অপুর ঘরটিকে। ঐ ঘরটাই যেন বলে দিয়েছে অপুর সংসারের অর্ধেক কথা। এমন একটা জীবন আর তার সংগ্রামের কথা ফুটে ওঠে ঐ ঘরের সজ্জায়, ছন্নছাড়া, বাঁধনহারা অপু, যার বন্ধন জীবন ভবিষ্যতের চিন্তা কিচ্ছুটি নেই। তবে প্রাণ বলে যা বোঝায়, একবিন্দু ম্লান করেনি ঐ ঘরটি।

অপরাজিত চলচ্চিত্রটি দেখেছি আমি সবার শেষে, যে চলচ্চিত্রটা দেখলে মনে হয়, সত্যজিৎ রায় একজন যাদুকর! অপু ত্রয়ীর তিনটি ছবিকেই এমন জীবন্ত রূপ দিয়েছেন অসাধারণ!সত্যি কথা বলতে কি, প্রচণ্ড আগ্রহ থেকে কাল রাতেই দেখেছি যাদুকর সত্যজিতের সৃষ্টি অপরাজিত। অপর সংসার আমার মনে দাগ কাটতে পারেনি, ঐটাকে আমার কাছে একটি ভালো ছবি মনে হয়েছে, তবে এমন ছবি নয় যা মনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। পথের পাঁচালি আমি ছেলেবেলায় দেখেছিলাম একবার, এবারে যখন দেখেছি, তখন আসলে দেখেছি সত্যজিতের বর্ণনার সাথে মিলিয়ে মিলিয়ে, প্রায় বিশ বছর বাদে আমার এই আবার দেখা পথের পাঁচালি অন্যরকম ভালো লেগেছে, আমি একটা নতুন ধারার সূচনাকারী ছবি যে দেখছি, তার স্বাক্ষর পেয়েছি পথের পাঁচালির বাঁকে বাঁকে। পথের পাঁচালি একটি মাস্টারপিস, একথা ২০১২ তে বসে আধুনিক ফিল্ম মেকিং টেকনোলজির দুনিয়ায় বসে অনেকের মন স্বীকার যদি কেউ নাও করতে চায়, তাদের উদ্দেশ্যে কেবল একটি প্রশ্ন, বর্তমানের গতিশীল চলচ্চিত্রের জগতে পথের পাঁচালির মত ডিটেইল বিশিষ্ট একটি ছবি আমি দেখতে চাই। আর অপরাজিত? গতরাতেই প্রথমবারের মত দেখে মনটা আমার বর্ষার আকাশের মত মেঘে মেঘে ভারী হয়ে গেছে। অপু ত্রয়ীর সেরা চলচ্চিত্র অপরাজিত! খুব সম্ভবত সত্যজিতের সেরা সৃষ্টিও অপরাজিত!

পুরো চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু অপুর বড় হবার সংগ্রাম আর মা সর্বজয়ার সাথে অপুর হার্দিক টানাপড়েন। গায়ের স্কুল থেকে পাশ করে অপু শহরে পড়তে যাবে, শূন্য হয়ে যায় সর্বজয়ার ভুবন... কি অপরিসীম শুণ্যতা, অপু যত বড় হয়, বাড়তে থাকে দূরত্ব, কিন্তু থামে না অপু আর সর্বজয়ার জীবনসংগ্রাম। মা ছেলেকে যতই কাছে চায়, ততই অনুভব করতে থাকে সে দূরে সরে যাচ্ছে। কষ্ট করে বড় হওয়া কলেজ পড়ুয়া অ্যাম্বিশাস অপুর মন পড়ে থাকে বইয়ের পাতায়, অসুস্থ মায়ের মুখটা মনে পড়েনা ঠিক সেভাবে। সর্বজয়ার দিন কাটে প্রতীক্ষায় প্রতীক্ষায়, সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটে সর্বজয়ার মৃত্যুতে। অপরাজিতের শেষ দৃশ্যে জগত সংসারে একলা অপু গায়ের মেটে পথ ধরে হেঁটে চলে কলকাতার দিকে, যেখানে তার একক জীবন। হৃদয়ের ভালোবাসা আর দূরত্ব নিয়ে এমন ভাঙ্গা গড়ার খেলা বুঝি বাংলা সাহিত্যে কেবল বিভূতিভূষণের কলমে আর চলচ্চিত্রে সত্যজিতের হাতেই হয়েছে। অপরাজিত অপরাজেয়!

Monday, July 2, 2012

এলোমেলো ভাবনা- “খাও এবং মর”

এইমাত্র পড়ে শেষ করলাম ডঃ মুহাম্মদ জাফর ইকবালের লেখা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী “কেপলার টুটুবি”। আমি যে জাফর ইকবাল স্যারের অনেক লেখা পড়েছি, বা সব বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী পড়েছি সে দাবী করিনা, তবে উনার লেখার সাধারণ প্যাটার্ণ ধরার মত বেশ খানেক বই পড়েছি বটে। আমার কখনও বইয়ের নাম মনে থাকে না, বিখ্যাত লেখকের কোন বিখ্যাত সাহিত্য খন্ড না হলে। জাফর ইকবাল স্যার বিখ্যাত বটে, তবে উনার লেখা একেকটা কল্পকাহিনী অতটা বিখ্যাত না, যতটা বিখ্যাত “জাফর ইকবাল স্যারের লেখা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী।” এই মানুষটার লেখা আমি পড়ি মনের মধ্যে একধরণের শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে… ছোট বেলায় “বাচ্চা ভয়ঙ্কর কাচ্চা ভয়ঙ্কর” পড়ার সময় মনের মধ্যে যেমন একটা উত্তেজনা কাজ করত, ঠিক তেমনি, এখনো যেন শিশুদের মতই তার লেখা কল্পকাহিনী পড়তে গেলে সেই উচ্ছ্বাস মনে জাগে। তিনি আমার মত আমাদের প্রজন্মের তরুণদের শৈশব কৈশোর গড়েছেন একটা ফ্যান্টাসি দিয়ে। সেই ফ্যান্টাসির জগতটা অনেকটা রূপকথার মত, সেখানে কোন অশুভ শক্তি শেষ অব্দি বিজয়ী হতে পারে না। ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়েরা দুরন্ত চঞ্চল, তাদের চাঞ্চল্য দিয়ে সম্ভব করে ফেলছে অসাধ্যকে, মানুষ মানেই মায়া মমতা ভালোবাসার আঁধার। চরম বিপদের মুখে মানবজাতি শেষ অব্দি টিকে যায় তাদের হৃদয়ের ভালোবাসার জন্যেই, রোবটেরা বারবার মানব জাতিকে পদানত করে ফেলার চেষ্টা করে, কিন্তু বুদ্ধিমত্তা, গণিতে রোবট প্রজাতি মানুষের চেয়ে তুখোড় হলেও মানুষ ঠিকই তাদের বুদ্ধিমত্তাকে অতিক্রম করে যায়। জাফর ইকবাল স্যারের গল্পে কোয়ান্টাম কম্পিউটার আর ক্রিস্টালে রেকর্ডকৃত তথ্য থাকে। প্রাচীন পৃথিবী সম্পর্কে ভবিষ্যতের মানুষ গুলো জানতে পারে দৈবাৎ পেয়ে যাওয়া ক্রিস্টাল থেকে। সেখানে সবকিছুর শেষে মানুষের জয় হয়, ভালোবাসার জয় হয়। একটা গল্পের সামগ্রিক চিত্রটা যখন এভাবে দেখা হয়, তখন সেটাকে রূপকথা বলেই মনে হয়। আসলে তো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী আর রূপকথার মধ্যে পার্থক্য শুধু একটাই, আগডুম বাগডুম দৈত্য দানো ভূত প্রেতকে স্থলাভিষিক্ত করে বৈজ্ঞানিকের কল্পনায় গড়া যন্ত্র দানবেরা, পাতাল পুরী, আকাশ পুরীর জায়গায়, ভিনগ্রহ, নক্ষত্র, মহাকাশ যান আর রাজকন্যা রাজপুত্রকে স্থলাভিষিক্ত করে মহাকাশযানের অভিযাত্রী, সাধারণ কোন মানুষ বা তারছেড়া কোন পাগলা বিজ্ঞানী। মন্দ নয়। 

এগুলো উচ্চদরের সাহিত্য না হলেও ভালো মানের শিশু-খাদ্য বটে। প্রশ্ন হল ফ্যান্টাসীর জগতে ঘুরতে থাকা শিশুমন যখন জাফর ইকবাল স্যারের বইয়ের জগত থেকে বেরিয়ে অমানবিক জগতের দিকে তাকায়, বুঝতে পারে ক্রমাগত মানুষের মাঝে মানবতা বোধ কমছে, তখন একধাক্কায় মানবতা, মায়া মমতা ভালোবাসার গল্প কি শুধুই গল্প হয়ে যায় না?

বর্তমান কালের মানুষগুলো মানুষের মৃত্যুর খবরে নির্বিকার হয়ে থাকে, মুখ দিয়ে হয়তো, ছোট্ট করে বের হয়, “আহা!” আমাদের সংবাদপত্রগুলো আমাদের কাছে প্রতিদিন যে বাস্তব সংবাদ প্রচার করে, তাতে কি মনে হয় না, প্রাচীনকালের রূপকথার দৈত্যদানব, জাফর ইকবাল স্যারের কল্পকাহিনীর মায়া মমতাহীন রোবট প্রজাতিকে স্থলাভিষিক্ত করে ফেলেছে আমাদেরই মানব সম্প্রদায়। রূপকথা গুলো বা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীগুলো ক্রমেই গল্প হয়ে যাচ্ছে, কল্পনার জোরে নয়, মানবতার অবলুপ্তির ফলশ্রুতিতে!

নতুন করে আজ জীবনের অর্থ খুঁজতে বসেছি, কি চাই জীবনে, জ্ঞান, ধন, যশ? কোন পথে গেলে মনে হবে জীবনটা সার্থক? মানব সেবার কথা ভেবেছি এতোটা দিন। এখন ভাবছি, সামগ্রিক অর্থে যে মানব জাতির সেবার কথা ভেবেছি, সেই মানব জাতি আসলে কি চায়?
জীবনের অর্থই যদি হয় অমুক খ্রিষ্টাব্দ থেকে অমুক খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বেঁচে থাকা স্রেফ, তাহলে জীবনের আসলেই কোন আল্টিমেট গোল আছে? জাফর ইকবাল স্যার যেই মানবতা বোধকে উচ্চে তুলে ধরার জন্য গল্প লিখেন, এটাই কি শেখাবো আমার সন্তানকে? সেই সাথে তো তাহলে আমাকে এটাও শেখাতে হবে, এই পৃথিবীতে রোজ চলবে হানাহানি, তার মধ্যেই বেঁচে থাকতে হবে, সয়ে যেতে হবে মানুষের অমানবিক আচরণ। এইভাবে নীতিগতভাবে দ্বিচারী হতে শেখানোই কি বাঁচতে শেখানো? আপাত দৃষ্টিতে সত্য এবং মিথ্যার এমন একটা সংকটে “মানবতা” শব্দটার ভাবার্থ দাঁড়িয়ে রয়েছে, দ্বিচারীতা ছাড়া আর কি শেখাতে পারবো? সেই বা কি শেখাবে তার সন্তানকে? “বাঁচতে শেখা” মানেটা কি?

বিবর্তনীয় প্রয়োজনে একদিন সৃষ্টি হয়েছিল প্রাণী জগতের সহমর্মী সহযোগী আচরণ। আমি যে গবেষণার সাথে জড়িত, সেই গবেষণায় সফল হলে একদিন মানুষ জৈবিক অঙ্গ হারিয়ে কৃত্রিম অঙ্গকেই নিজের দেহের অংশ ভাবতে শুরু করবে, বুঝতে পারবে না, জৈবিক অঙ্গের সাথে কৃত্রিম অঙ্গের পার্থক্য কোথায়। হয়ত এটা রোবটিক্সের জগতেও এনে দেবে বিপ্লব। কি হবে আসলে সেটা ভবিষ্যতের ব্যাপার, কিন্তু আমি বা আমার মত অনেক বাচ্চা গবেষক যে এইভাবে ব্যয় করছে তার জীবনী শক্তি, কি তার উদ্দেশ্য? প্রয়াত বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ক্রিক, যিনি একাধারে মলিকুলার বায়োলজি এবং নিউরোসায়েন্স নিয়ে কাজ করে গেছেন, শেষ অব্দি তো তিনি একটি নাম ছাড়া কিছু নন। সময়ের হিসেবে তার কর্মময় সময়ের অস্তিত্ব ছাড়া আর কিছু নেই। আজ যেমন লুইগি গ্যালভানীর দৈহিক অস্তিত্ব আমি অনুভব করিনা, কিছুদিন পরে, ফ্রান্সিস ক্রিকের দৈহিক অস্তিত্ব ছিল, তাও কেউ অনুভব করবে না। তাও তো তারা নামে বেঁচে আছেন, কিভাবে বেঁচে থাকবো আমরা? মানবসেবা এবং মানবতা-বোধও জীবনের লক্ষ্য যদি না হয়ে থাকে, তবে কেন খুঁজে চলেছি জীবন বোধ? রোজ রাতে ঘুমোবার সময় এটুকু ভাবার জন্য আজকের জীবনটা সুন্দর কেটেছে, আজকের দিনটা সার্থক, আজ আমি এই কাজটি করে তৃপ্তি অনুভব করেছি?

এই আমি, মহাজাগতিক ধূলিকণা, আদি এবং অন্তহীন। আমার মস্তিষ্ক আমাকে দিচ্ছে জীবনের একধরণের অনুভূতি, যার আসলে কোন উদ্দেশ্য নেই। বাঁচো, খাও এবং মর। ছোটবেলায় যেমন বাংলা পরীক্ষায় “জীবনের লক্ষ্য” রচনা লিখতে বলা হত, আজ কেউ লিখতে বললে, দু-শব্দে লিখে দিতাম, “ইট এন্ড ডাই”।

Thursday, June 28, 2012

বিচ্ছিন্ন দ্বীপ

১. মাঝে মাঝে এমন মূর্তির মত স্থিরতায় কেটে যায় আমার দিন… মনে হয়, আমি বুঝি এই পৃথিবীর হিসেবের খাতায় আর নেই। একদিন এক প্রচন্ড ব্যস্ত সময়ে মনের কোণে কবিতার একটি লাইন গুনগুনিয়ে উঠল…
“জীবনের সাথে সম্পর্কহীন
একটি জীবন করে যাচ্ছে জীবনযাপন!”
চমকে উঠলাম… একি! মনটা তেতো হয়ে গেলো। কবিতার পরের লাইনগুলো আর বের হয়নি। দেশ ছেড়ে বিদেশের মাটিতে নিঃশ্বাস নেবার যে যন্ত্রণা, যে একাকীত্ব – তা বলে বোঝাবার নয়। একটা যান্ত্রিক মানুষের বেঁচে থাকা- বুকভরা নিঃসঙ্গতা।

২. বেঁচে ছিলাম কি আমি আমার দেশের মাটিতেও? পালিয়েই তো এসেছি আমি জীবন বাঁচাতে… বাংলাদেশের সমাজ এখনও আমার মত স্বাধীনচেতা, স্বপ্নবাজ তরুণ হৃদয়কে ধারণ করার যোগ্য হয়নি। সেখানে মেয়েরা জন্মে হাঁটতে শুরু করে যখন, তখনই মেয়েদের মায়েরা লাল টুকুটুকে শাড়ি পড়িয়ে দেখে মেয়েটা বড় হয়ে বৌ সাজলে কেমন দেখাবে? কন্যাশিশুটিও তার পুতুলের গায়ে লাল কাপড় জড়িয়ে পুতুলের বিয়ে দিয়ে দেয়। পুতুল খেলার বয়স পেরুলে সত্যি সত্যি মেয়েটিকে পুতুলের মত করে লাল শাড়িতে পেঁচিয়ে গা ভর্তি সোনাদানায় জড়িয়ে পাঠিয়ে দেয় আরেক ঘরে… নারীপাঁচার।

৩. বাংলার সমাজে আজকাল শারিরীক নিযার্তনটা বোধ করি কমেছে। কিন্তু কমেনি মানসিক নির্যাতনটা। কিশোরী বা তরুণী যাই বলিনা কেন, বিবাহিত অবিবাহিত নির্বিশেষে মানসিক নির্যাতনের শিকার। সমাজের চোখে সেটা মোটেও কোন অপরাধ নয়, আইনের চোখে তো প্রশ্নই ওঠে না। মানসিক যন্ত্রণাটা যে চোখে দেখা যায় না।

৪. আমার মা বলেছিল, বিএসসির পরে আর কি পড়ালেখা বাকি থাকে? আস্ত একটা অশিক্ষিত সমাজের চিন্তার দৌড়, মানসিক দৈন্যতা পরিষ্কার হয়ে যায় এই একটি কথায়। ছেলেকে বিএসসি অব্দি পড়ানোর উদ্দেশ্য চাকরী করার যোগ্য করে তোলা, আর মেয়েকে বিয়ের বাজারে মূল্যবান করে তোলা। অশিক্ষিত সমাজটার কাছে শিক্ষা মানে বিক্রয় হবার সার্টিফিকেট অর্জন। হয় পূঁজিপতির কাছে নয় পু্রুষের কাছে।

৫. কোরিয়ার মানুষগুলো জীবন যাপন করে, জীবন নামের বোঝা বহন করে না। খালি চোখে প্রত্যেকটা মানুষকে দেখলে এটাই মনে হয়। তবুও কর্মক্ষেত্রে উচ্চপদে এইখানে নারীদের দেখিনি আমি। কেন? গোটা মানব সমাজই কি একটি নষ্ট এক্স ক্রোমোজম বহন করছে?

৬. আমার বাবার মত মানুষেরা তবে এলো কি করে? যারা স্বপ্ন দেখেতে শেখায়, যারা ভালোবেসে ভালোবাসতে শেখায়, যারা কন্যাকে বিপ্লবী হতে শেখায়, এরা এলো কি করে নষ্ট সমাজে? আমার বাবার মত মানুষেরা কি তবে মানবসমাজের ঘুনে ধরা এক্স ক্রোমজোমে রেয়ার মিউটেশনের ফলাফল?

৭. এখন আমি স্বাধীন। এখন আমি মামদো ভূতের মত কাঁধে চেপে বসে থাকা সমাজটাকে ছুড়ে ফেলতে শিখেছি। এখন আমি মানুষের জীবন যাপন করি।

৮. এখানে আসার পর কদিনের জন্য জীবনের স্বাদ পেয়েছিলাম। কোরিয়াতে তখন আমার অনেকবন্ধু ছিল। একটি সেমিস্টার শেষ হতে না হতেই… মানুষগুলো হারিয়ে গেলো, চলে গেলো অন্য ভূ-খন্ডে, থেমে গেলো আমার জীবনের উৎসবটাও। এ ভূ-খন্ড আমার নয়।

৯. এখন আমি একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ।

Tuesday, June 12, 2012

দেয়াল

এখন "আমার" বলে লেখার কিছু নেই।
গোধূলির রঙ মনের ক্যানভাসে আর আপ্লুত হয় না।
অতি সতর্কতায় কলম থেকে শুষে নিয়েছি
সুখ অথবা কষ্টের উচ্ছল সুধা।

শরণার্থী শিবিরে আটকে পড়া বহির্মুখিতাকে
জলাঞ্জলির মহিমায় কাঁদিয়েছি নির্বিকারে!
এ এক অনন্য আবেগ, সর্বনাশা!
কাঠামোর বাস্তবতায় বেঁচে থাকে জ্ঞান,
বেঁচে থাকে শ্রম অথবা স্বপ্নের মোড়কে জেদ।
বিজ্ঞাপণের জন্য জমে আছে উপেক্ষা।

Friday, May 25, 2012

হডজকিন-হাক্সলি মডেলঃ নিউরনের প্রকৃত রূপ!

১৯৬৩ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী-দ্বয়ের নাম স্যার অ্যালান হডজকিন এবং স্যার এন্ড্রু হাক্সলি, যাদের অসাধারণ বৈজ্ঞানিক গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫২ সালে জার্নাল অফ ফিজিওলজিতে। তারাই মানুষের সামনে প্রথমবারের মত উপস্থাপন করেছিল অ্যাকশন পটেনশিয়ালের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা, নিউরনে অনুরণনের পিছনের ঘটনা, “কিভাবে ঘটে? কেন ঘটে?, কখন ঘটে?”। মানুষের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সমগ্র মানব সভ্যতা মুগ্ধ হয়ে থাকলেও ১৯৫২ সালের আগ পর্যন্ত মানুষের জানা ছিল না, কোন মৌলিক নিয়ম অনুসরণ করে কাজ করে মানুষের স্নায়ুতন্ত্র। ব্যাপারটা অনেকটা এমন, মানুষ বুদ্ধিমান, মানুষ এটা পারে, ওটা পারে, কিন্তু কিভাবে পারে তা মানুষ জানতো না। আজও আমরা জানিনা এমন অনেক কিছুই, তবে যে কটা ঘটনা জানতে পেরেছি, তাদের মধ্যে অন্যতম এই একটি, অ্যাকশন পটেনশিয়ালের ব্যাখ্যা, নার্ভের ইলেক্টিকাল বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জ্ঞানার্জন। ১৯৫২ সালে প্রকাশিত সেই বিখ্যাত গবেষণা পত্রে বিজ্ঞানী কোল-মারমন্ট উদ্ভাবিত ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প পদ্ধতিতে পরীক্ষণ থেকে প্রাপ্ত মেমব্রেনের ইলেকট্রিকাল বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে হডজকিন-হাক্সলি উপস্থাপন করেছিলেন নিউরন বা স্নায়ুকোষের গাণিতিক মডেল, যে মডেলটি দিয়ে মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে প্রথম সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারার শুরু। মস্তিষ্ক- প্রাণীর মাথার খুলির মধ্যে বসে থাকা নরম তুলতুলে হালকা গোলাপি রঙের সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুয়িডে ভেসে থাকা কোষ পিন্ড নয় কেবল, এর প্রত্যেকটি কোষ একেকটি কার্যক্ষম ইলেকট্রিকাল ইউনিট, পুরো মস্তিষ্কটা আসলে একটি বিশাল সার্কিট, তথ্য সঞ্চালনকারী কোষসমূহের নেটওয়ার্ক!
এই ব্লগটির উদ্দেশ্য নিউরন নামের সংবেদনশীল কোষটির আড়ালে লুকিয়ে থাকা মৌলিক ইলেকট্রিকাল ইউনিটের কাঠামোটির প্রতি আলোকপাত করা, যা অনুধাবন করতে মানুষের লেগে গেছে ১৭৯ বছর! এর আগে কয়েকটি পর্বে দেখিয়েছি নিউরন কিভাবে কাজ করে? এবং গাণিতিক ভাবে নিউরনের কাজ বা অ্যাকশন পটেনশিয়ালের ব্যাখ্যা দানকারীদের হাত ধরে নিউরাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর জন্মকথা । ঐ লেখাগুলোতে উল্লেখ করেছিলাম, মেমব্রেন পটেনশিয়াল সৃষ্টিতে মেমব্রেনে বিভিন্ন আয়নের প্রবেশযোগ্যতার ভূমিকার কথা। সেখানেই উল্লেখ করেছিলাম ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প টেকনিকের কথা, যা অ্যাকশন পটেনশিয়াল সৃষ্টির মেকানিজম ব্যাখ্যায় কাজে লেগেছিল। এই পর্বে দেখাব, কিভাবে ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প টেকনিক ব্যবহার করে হডজকিন হাক্সলি নিউরনের গাণিতিক মডেল এবং এর কাজ ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়েছিল। আসুন সংক্ষেপে দেখে নিই নিউরনের কোষপর্দার ইলেকট্রিকাল বৈশিষ্ট্য কেমন? এই ছবিটি সরাসরি হডজকিন –হাক্সলির মূল গবেষণাপত্র থেকেই তুলে দিলাম।


চিত্রঃ নিউরন মেমব্রেনের হডজকিন-হাক্সলি প্রদত্ত গাণিতিক মডেল
কোষ পর্দার এই ইলেকট্রিকাল ইকুইভ্যালেন্ট মডেলের দিকে তাকালে বোঝা যায়, নিউরনের কোষ পর্দার মূলত দুই ধরণের ইলেকট্রিকাল বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
১. পরিবাহকত্ব বা কন্ডাকটেন্স
২. ধারকত্ব বা ক্যাপাসিটেন্স
বিস্তারিত ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের জীববিজ্ঞান এবং পদার্থ বিজ্ঞান থেকে কিছু বেসিক কনসেপ্ট মাথার মধ্যে একবার ঝালিয়ে নিই। আমরা পড়েছিলাম, কোষপর্দার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মডেল হল লিপিড বাইলেয়ার মডেল, যাতে স্যান্ডউইচের মত মাঝখানে দুটি লিপিড লেয়ার, আর তার বাইরের দিকে থাকে হাইড্রোফিলিক বা পানি-গ্রাহী পদার্থের আস্তরণ। লিপিডকে বলা হল হাইড্রোফোবিক পদার্থ, যা অর্থ হল, লিপিড পানি এবং সকল প্রকার আয়নকে বিকর্ষণ করে। অর্থাৎ পানি এবং সকল প্রকার আয়ন লিপিড লেয়ারকে ভেদ করে কোষের বাইরে বা ভিতরে যেতে পারে না। এই অভেদ্য লিপিডের লেয়ারটিই কোষপর্দার ভিতরে এবং বাহিরে বিদ্যমান আয়নকে (চার্জকে) পৃথক করে রেখেছে, যা বৈদ্যুতিক ধারকের বা ক্যাপাসিটরের অনুরূপ কাজ করে। এখন আমরা উচ্চমাধ্যমিকের পদার্থবিজ্ঞান বই থেকে ক্যাপাসিটেন্সের ধারণাটা একটু মনে করে নিই। ক্যাপাসিটেন্সের কাজ হল একটি ডাইইলেক্ট্রিক বা অপরিবাহী পদার্থ দ্বারা অপরিবাহকের দুইপাশে কিছু চার্জকে পৃথক করে জমিয়ে রাখা। কি অদ্ভুত মিল, তাই না? কোষপর্দার লিপিড লেয়ারও তো কোষের ভিতরে এবং বাহিরে কিছু আয়ন বা চার্জকেই পৃথক করে ধারণ করে। তাহলে বলা চলে, কোষপর্দা একটা ক্যাপাসিটরের মত কাজ করে।
প্রশ্ন হল, লিপিড বাইলেয়ার ভেদ করে যদি পানি এবং আয়ন চলাচল করতে নাই পারে, তাহলে কোষীয় পর্যায়ে খাবার, লবণ এবং পানির আদান প্রদান হয় কি করে? এগুলো তো কোষের ভিতরে ঢুকতে বা বের হতে হবে! এজন্য ক্যাপাসিটরের মাঝে মাঝে কিছু প্রোটিন নির্মিত আয়ন চ্যানেল আছে, ঐ চ্যানেলগুলো যখন খোলা থাকে তখন কোষপর্দা ভেদ করে আয়ন এপাশ থেকে ওপাশে চলাচল করতে পারে। আচ্ছা, পরিবাহকের মধ্য দিয়েও তো ধনাত্মক বা ঋণাত্মক আধান চলাচল করতে পারে, তাই না? তাহলে কোষপর্দায় উপস্থিত এই আয়ন চ্যানেল গুলো খোলা অবস্থায় আসলে কাজ করে পরিবাহকের মত! তারমানে, কোষপর্দাটি মূলত ক্যাপাসিটর হলেও এতে জায়গায় জায়গায় আয়ন পরিবহনের জন্য পরিবাহকও আছে। আর পরিবাহক যখন আছে, তখন কোষপর্দার বা মেমব্রেনের পরিবাহকত্ব বা কন্ডাক্টেন্সও আছে।
হডজকিন এবং হাক্সলি যখন তাদের গবেষণা করেছেন, তখন এই লিপিড বাইলেয়ার মডেলের কথা, জানা ছিল না ভালো ভাবে। তবে জানা ছিল কোষপর্দার কন্ডাক্টিভ এবং ক্যাপাসিটিভ বৈশিষ্ট্যের কথা। এটা জানায় কিন্তু একক কৃতিত্ব হডজকিন এবং হাক্সলির নয়। বরং কোষপর্দার লিপিড বাইলেয়ার মডেলের কথা না জানলেও ১৯০২ সালে বার্নেস্টাইন প্রদত্ত অনুকল্পেই তিনি উল্লেখ করেছিলেন কোষ পর্দার পটাসিয়াম(আয়নের) প্রবেশযোগ্যতার কথা, যাকে ইলেকট্রিকাল কন্ডাক্টেন্সের অনুরূপ চিন্তা করা যায়। পরবর্তী সময়ে মেমব্রেন পটেনশিয়াল পরিবর্তনের গ্রাফ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মানুষ বুঝতে পারে, কোষপর্দার কেবল পরিবাহকত্ব নয়, ধারকত্বও আছে, যা স্পষ্টভাবে প্রভাব ফেলে মেমব্রেন পটেনশিয়াল কার্ভে। কোষপর্দার পরিবাহকত্ব এবং ধারকত্ব নিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পরীক্ষণ চালিয়েছেন বিজ্ঞানী কোল এবং কার্টিস, যা প্রকাশিত হয়েছে ১৯৩৯ সালে। জার্নাল অফ সেল বায়োলজিতে প্রকাশিত কেনেথ এস. কোল এবং হোয়ার্ড জে. কার্টিসের গবেষণা পত্রে দেখান হয়, অ্যাকশন পটেনশিয়াল ঘটাকালে নার্ভ মেমব্রেনের ক্যাপাসিটেন্সের পরিবর্তন ঘটে মাত্র ২% যেখানে পরিবাহকত্বের পরিবর্তন লক্ষণীয় পরিমাণে বেশী, ১০০০ ওহম/বর্গ সেমি. থেকে মাত্র ২৫ ওহম/বর্গ সেমি. তে নেমে আসে, অর্থাৎ ৯৭.৫% কমে যায়। এখান থেকে অনুধাবন করা যায়, অ্যাকশন পটেনশিয়াল ঘটাকালে মেমব্রেনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কারেন্টের মুখ্য অংশ আয়নিক কারেন্ট, ক্যাপাসিটিভ নয়। এই গবেষণার পূর্বে স্থিতিশীল অবস্থায় কোষপর্দার পরিবাহকত্ব নিয়ে গবেষণা চালিয়েছিলেন হডজকিন এবং কোল, তাদের দুজনের যৌথ প্রচেষ্টায় জানা সম্ভব হয়েছিল, নিষ্ক্রিয় অবস্থায় কোষপর্দায় থাকে ১০০০ ওহম/বর্গ সেমি রোধক।
কোষ পর্দার মধ্য দিয়ে যেরকম কারেন্টই প্রবাহিত হোক না কেন, তা ঘটে আয়নের এপার ওপার পারাপারের জন্যই। হডজকিন-হাক্সলি আয়নের প্রবেশযোগ্যতার উপর মেমব্রেন পটেনশিয়ালের প্রভাবকে সংক্ষিপ্ত ভাবে উপস্থাপন করেছেন এভাবে,
“প্রথমত, ডিপোলারাইজেশনের কারণে খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য কোষপর্দায় সোডিয়াম প্রবেশযোগ্যতা বেড়ে যায় বহুগুণে এবং পটাসিয়ামের জন্য বাড়ে একটু ধীর গতিতে। দ্বিতীয়ত, এই পরিবর্তন ঘটে পর্যায়ক্রমে এবং মেমব্রেনের রিপোলারাইজেশনের মাধ্যমে এটা ফিরে যেতে পারে আগের অবস্থায়। কোষপর্দায় আয়নের প্রবেশযোগ্যতার এই পরিবর্তন অ্যাকশন পটেনশিয়াল এবং তার পরবর্তী নিস্ক্রিয়াবস্থা ঘটানোর জন্য উপযুক্ত কিনা, সে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সোডিয়াম এবং পটাশিয়ামের মেমব্রেন ভোল্টেজ এবং সময় নির্ভরশীল পরি-বহনযোগ্যতা বুঝে ওঠা প্রয়োজন”।
মানুষ হডজকিন-হাক্সলির আগে থেকেই মেমব্রেনের কন্ডাক্টেন্স, ক্যাপাসিটেন্স সম্পর্কে জানলেও এগুলো পরিমাপ যোগ্য হতে হবে, তা না হলে জানা অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। বৈজ্ঞানিক গবেষণার এটি অন্যতম একটি মূল শর্ত, পরিমাপযোগ্যতা। এই পরিমাপযোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প পরীক্ষণের মাধ্যমে। কিভাবে তা জানতে শুরুতেই বোঝা প্রয়োজন, ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প টেকনিক বলতে আসলে কি বোঝায়?
ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প টেকনিকটির নামের সাথেই তার অর্থ বলে দেয়া আছে, এর কাজ হল, সেল মেমব্রেনের ভোল্টেজকে একটি নির্দিষ্ট মানে স্থির রাখা। অর্থাৎ, বাইরে থেকে আসা কোন স্টিমুলেশনের কারণে যখন মেমব্রেন পটেনশিয়ালের মান পরিবর্তিত হবার প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন একটি নেগেটিভ ফিডব্যাক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মেমব্রেন পটেনশিয়ালের পরিবর্তন রোধ করে। একটি অ্যাকশন পটেনশিয়ালের ডিপোলারাইজেশন এবং রিপোলারাইজেশন প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে চক্রটি সমাপ্ত হতে সময় লাগে মাত্র ৫ মিলি সেকেন্ড। এতো অল্প সময়ের মধ্যে এটি একাধারে স্থান এবং সময়ের উভয়ের সাপেক্ষে পরিবর্তিত হয়। অ্যাকশন পটেনশিয়াল অ্যাক্সনের মেমব্রেনের দৈর্ঘ্য বরাবর প্রবাহিত হচ্ছে, প্রবাহিত হচ্ছে একটি নিউরন থেকে আরেকটি নিউরনে। একই সাথে এটি পরিবর্তিত হচ্ছে সময়ের সাথে সাথেও। যখন একটি নার্ভ মেমব্রেনের পটেনশিয়াল (Vm) নামক একটি নির্ভরশীল চলক (Dependent variable) একই সাথে দুটি স্বাধীন চলকের (Independent variable), মেমব্রেনের দৈর্ঘ্য(L) এবং সময় ( t ) এর উপর নির্ভর করে, তখন কেবলমাত্র মেমব্রেন পটেনশিয়াল, Vm পরিমাপের মাধ্যমে কোনভাবেই অ্যাকশন পটেনশিয়ালে আসলে কি কি ঘটছে তা অনুধাবন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প টেকনিক নিয়ে আসে এই অসাধ্যকেই সাধ্যের সীমানায়। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যা অ্যাক্সনের মেমব্রেনের একটি ক্ষুদ্র ক্ষেত্রফল বিশিষ্ট এলাকার বিভবকে নিয়ন্ত্রণ যোগ্য করে পরিণত করে সম-বিভব বিশিষ্ট অঞ্চলে। আর ভোল্টেজ ক্যাম্প এই কাজটি করে ছোট্ট একটি ইলেক্ট্রনিক ফিডব্যাক সার্কিটের মাধ্যমে। এই ইলেক্ট্রনিক ফিডব্যাক সার্কিটটি যখনই ভোল্টেজ পরিবর্তনের উপক্রম হয়, তখনই কিছু পরিমাণ তড়িৎ প্রবাহ ঘটিয়ে বা শোষণ করে, ভোল্টেজকে ফিরিয়ে আনে আগের জায়গায়।

চিত্রঃ ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প পদ্ধতি (মূল উৎসঃ Cole, KS(1968), Membranes, Ions, Impulses: A Chapter of Classical Biophysics.)
ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প টেকনিকে প্রথমে স্কুইডের ১ মিলিমিটার ব্যাসের প্রশস্ত অ্যাক্সনের একটা খণ্ডাংশ নিয়ে তার কোষস্থ তরলে একটি ইলেক্ট্রোড এবং আরেকটি ইলেক্ট্রোড কোষের বহিস্থ তরলে স্থাপন করা হয়, যা পরীক্ষার সুবিধার্থে সামুদ্রিক পানি দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে। এই দুটি ইলেক্ট্রোড (রেকর্ডিং ইলেক্ট্রোড এবং রেফারেন্স ইলেক্ট্রোড) অ্যাক্সনের মেমব্রেন পটেনশিয়াল, অর্থাৎ কোষের বহিস্থ তরলের সাথে কোষস্থ তরলের বিভব পার্থক্য, Vm নির্ণয় করে। ভোল্টেজ ক্ল্যাম্পের কাজ যেহেতু মেমব্রেন ভোল্টেজকে কোন একটি নির্ধারিত মানে স্থির করে রাখা। ধরে নিলাম, সেই নির্ধারিত মানটি হচ্ছে Vc। এটি মেমব্রেন পটেনশিয়ালকে (Vm) এরপর কমান্ড ভোল্টেজের (Vc) সাথে তুলনা করা হয়। যদি মেমব্রেন ভোল্টেজ আর কমান্ড ভোল্টেজের মধ্যে পার্থক্য থাকে তাহলে, বিপরীত দিক থেকে একটি কারেন্ট পাসিং ইলেক্ট্রোড দিয়ে কোষের অন্তস্থ তরলে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করে, যা কমান্ড ভোল্টেজের সাথে মেমব্রেন ভোল্টেজের পার্থক্য শূন্যকরণ করবে। কিন্তু কত টুকু কারেন্ট পাস করবে? কিভাবে বিভব পার্থক্য শূন্যে নিয়ে আসে?
গাণিতিক সমস্যা সমাধানের মত করে ধরে নিলাম, t1 মুহূর্তে মেমব্রেন ভোল্টেজ Vm1=Vc, অর্থাৎ মেমব্রেন পটেনশিয়াল কমান্ড ভোল্টেজের সমান। কিন্তু Vm1 রেস্টিং পটেনশিয়াল নয়। মেমব্রেন ভোল্টেজ যখনই রেস্টিং পটেনশিয়াল ছাড়া অন্য কোন মানে থাকে তখন মেমব্রেনের প্রবণতা থাকে কিছু আয়ন ভিতরে-বাহিরে আদানপ্রদান করে মেমব্রেন পটেনশিয়ালের মান রেস্টিং পটেনশিয়ালে ফিরিয়ে আনা। সুতরাং, Vm1ভোল্টেজে মেমব্রেনের মধ্য দিয়ে কিছু তড়িৎ প্রবাহ ঘটবে। যার ফলে ধরি I পরিমাণ বিদ্যুৎ তথা +q (=Im x t) পরিমাণ চার্জ মেমব্রেন অতিক্রম করে কোষস্থ তরলে প্রবেশ করেছে। ফলে, t2 মুহূর্তে দেখা গেল, মেমব্রেন ভোল্টেজ Vm2 হয়ে গেছে, যা Vc এর সমান নয়। এদের বিভব পার্থক্য ΔV= Vc-Vm2, যা ক্ল্যাম্প অ্যামপ্লিফায়ারকে নির্দেশ দিল, Im পরিমাণ কারেন্ট আরেকটি ইলেক্ট্রোডের মধ্য দিয়ে কোষের মধ্যে প্রবেশ করাতে। যেহেতু I পরিমাণ কারেন্ট প্রবাহের কারণে মেমব্রেন পটেনশিয়ালের পরিবর্তন ঘটেছে, তাই একে যদি কমান্ড ভোল্টেজে ফিরিয়ে আনতে হয়, তাহলে অবশ্যই কোষস্থ তরলে I এর বিপরীত এবং সমান পরিমাণ কারেন্ট Im সরবারহ করতে হবে যা পূর্ববর্তী পরিবর্তনের প্রভাবকে শুন্যকরণ করতে পারবে । সুতরাং,
Im=- I.
ফলশ্রুতিতে কোষের মধ্যে প্রবেশ করা -q (=-Im x t) পরিমাণ চার্জের প্রভাবে মেমব্রেন ভোল্টেজ Vm1 এ ফিরে যাবে। এই প্রক্রিয়ায়, ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প সর্বদা, মেমব্রেন ভোল্টেজকে কমান্ড ভোল্টেজের সমান রাখতে পারে।
ভোল্টেজ ক্ল্যাম্পের মাধ্যমে জানা গেল, Vm1 এর দরুন মেমব্রেনের মধ্য দিয়ে I=-Im পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়, কোষের দুই পাশের তরলের মধ্যে আয়নের আদান-প্রদানের মাধ্যমে ঘটেছে। ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প পরীক্ষণকালে মেমব্রেনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কারেন্ট ক্যাপাসিটিভ কারেন্ট না আয়নিক কারেন্ট তা অনুধাবন করা সম্ভব সময়ের সাপেক্ষে কারেন্টের গ্রাফ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে, যেখানে দেখা যায়, যে মুহূর্তে পটেনশিয়াল পরিবর্তিত হচ্ছে, ঠিক সেই মূহুর্তে সম্পূর্ণ কারেন্টই ক্যাপাসিটিভ কারেন্ট, যা খুবই ক্ষণ স্থায়ী, এরপর আস্তে আস্তে আয়নিক কারেন্টের পরিমাণ বাড়তে থাকে আর ক্যাপাসিটিভ কারেন্ট শূন্য হয়ে যায়, অর্থাৎ ক্ষণস্থায়ী ক্যাপাসিটিভ কারেন্ট পরিবর্তিত হয়ে আয়নিক কারেন্টে পরিণত হয়।
ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প প্রক্রিয়া পরিমাপকৃত কারেন্ট I থেকে নির্ণয় করা যায় প্রবাহিত চার্জের পরিমাণ, q (=I x t). নির্ণয় করা হয়েছে ΔV= Vc-Vm2, যেখান থেকে নির্ণয় করা হয় মেমব্রেনের ক্যাপাসিটেন্স, C=q/ΔV. নীচের ছবিটি থেকে আরও ভালো ভাবে বোঝা যাবে, যে ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প প্রক্রিয়ায়, ক্যাপাসিটিভ কারেন্ট, আয়নিক কারেন্ট নির্ণয় করা সম্ভব।
চিত্রঃ ক) অ্যাকশন পটেনশিয়াল ঘটাকালে প্রবাহিত ক্যাপাসিটিভ ও আয়নিক কারেন্ট। খ) পটাশিয়াম জনিত আয়নিক কারেন্ট। গ) সোডিয়াম জনিত আয়নিক কারেন্ট।
ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প পদ্ধতি ব্যবহার করে, একটি নির্দিষ্ট ভোল্টেজে মেমব্রেনের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত আয়নিক কারেন্টের পরিমাণ, ক্যাপাসিটিভ কারেন্টের পরিমাণ, মেমব্রেনের ক্যাপাসিটেন্স জানা সম্ভব। উপরের ছবিটাতে পরিষ্কার ভাবেই বোঝা যাচ্ছে, খুব স্বল্প সময়ের (০.০২ মিলি সেকেন্ড- যে সময়টুকুর মধ্যে পটেনশিয়ালের পরিবর্তিত হয়ে যায়) জন্য উপস্থিত ক্যাপাসিটিভ কারেন্টের স্পাইকের পরই তা রূপান্তরিত হয়েছে আয়নিক কারেন্টে, অর্থাৎ প্রথম ০.০২ মিলি সেকেন্ডের পরে সম্পূর্ণ কারেন্টই আয়নিক কারেন্ট। আয়নগুলোর মধ্যে সোডিয়াম এবং পটাসিয়াম আয়নের প্রাধান্য থাকায় এই আয়নিক কারেন্টকে আবার দুইভাগে ভাগ করা যায়, অন্য নগণ্য পরিমাণ আয়নকে উপেক্ষা করে।
I= INa1+Ik1
এখন যদি, পটাসিয়াম আয়নের দরুন সৃষ্ট কারেন্টে কোনভাবে বন্ধ করা যায়, তাহলে প্রবাহিত কারেন্ট হবে কেবল সোডিয়াম আয়নের প্রবাহের জন্য সৃষ্ট কারেন্ট। বিপরীত ভাবে সোডিয়াম আয়নের দরুন সৃষ্ট কারেন্টকে যদি বন্ধ করা যায়, তাহলে আমরা কেবল মাত্র পটাশিয়াম আয়নের জন্য ঘটিত কারেন্টটা পাব। অর্থাৎ একটি আয়নের চলাচল বন্ধ করে দিলে অপর আয়ন ঘটিত কারেন্টটি পাওয়া যায়। হডজকিন -হাক্সলি, পরীক্ষণের সময়, কোষের বহিস্থ তরল সামুদ্রিক পানি দিয়ে প্রতিস্থাপিত করেছিলেন, শুধু তাই নয়, সামুদ্রিক পানিতে বিশুদ্ধ পানি মিশিয়ে লবনাক্ততার পরিমাণ কমিয়েও পরীক্ষা করেছিলেন। কেবল মাত্র পটাশিয়াম আয়ন ঘটিত কারেন্ট সনাক্ত করার জন্য তাদের হাতে উপায় ছিল বহিস্থ তরলে সোডিয়ামের পরিমাণ শূন্য করে ফেলা (০% সামুদ্রিক পানি) অর্থাৎ সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ পানি বহিস্থ তরল হিসেবে ব্যবহার করা, যাতে কোন সোডিয়াম আয়নের উপস্থিতি না থাকে। যখন বহিস্থ তরল থেকে সোডিয়াম অপসারণ করে নেয়া হয়, তখন কেবল মাত্র পটাশিয়াম আয়নের দরুন সৃষ্ট আয়নিক কারেন্ট পাওয়া যায়, উপরের ছবির দ্বিতীয় কার্ভটি তাই নির্দেশ করছে। তার নীচের কার্ভটিতে দেখানো হয়েছে সোডিয়াম জনিত আয়নিক কারেন্ট, যা পাওয়া গেছে মোট কারেন্ট থেকে পটাসিয়াম কারেন্টকে বিয়োগ করে। বর্তমান সময়ে একটি আয়নিক কারেন্টের পরিমাণ জানতে হলে অপর আয়নের চ্যানেল বন্ধ করে দিতে ব্যবহার করা হয় কিছু রাসায়নিক পদার্থ; সোডিয়াম চ্যানেল গুলো ব্লক করার কাজে ব্যবহার করা হয় টেট্রোডক্সিন আর টেট্রামিথাইল অ্যামোনিয়ামকে ব্যবহার করা হয় পটাসিয়াম চ্যানেল ব্লক করার কাজে। একটি পরীক্ষণের এই দুটি আয়ন চ্যানেলের যে কোন একটি ব্লক করলেই কাজ চলে যায়।
কোষপর্দার ইলেকট্রিকাল মডেলে আরেকবার চোখ বুলিয়ে দেখি, সার্কিটে কিছু ব্যাটারির অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে, সেগুলো এলো কি করে? কোষের ভিতরে বা বাহিরে জমা থাকে প্রচুর আয়ন, প্রধানত সোডিয়াম আয়ন এবং এবং পটাসিয়াম আয়ন। কোষের ভিতরে পটাসিয়াম আয়নের ঘনত্ব বেশী থাকে আর বাইরে সোডিয়াম আয়নের ঘনত্ব বেশী থাকে। তাই সুযোগ পেলেই পটাসিয়াম আয়ন কোষের ভিতর থেকে বাইরের দিকে যেতে চায় আর সোডিয়াম আয়ন কোষের বাইরে থেকে ভিতরে চলে আসতে চায়। এই যে কোষপর্দা দিয়ে সোডিয়াম আয়নের প্রবাহ বা পটাসিয়াম আয়নের প্রবাহ বা আয়নিক কারেন্ট, তা ঘটছে তাদের রাসায়নিক ঘনত্বের ভিন্নতার কারণে। এই রাসায়নিক ঘনত্বের ভিন্নতা কোষপর্দার দুইপাশে বিভব পার্থক্য সৃষ্টি করে বলে সেই বিভবকে ইলেক্ট্রো-কেমিক্যাল ফোর্স হিসেবে বিবেচনা করা যায়, আর যে বিভবে গেলে আয়নগুলোর প্রবাহ সাম্যাবস্থায় থাকবে, সেই বিভবকে ব্যাটারি আকারে দেখানো হয় ইলেকট্রিকাল মডেলে, কারণ সেই বিভবটিই হল আয়নগুলোর চালক-শক্তি। এইসব ব্যাটারিকে বলা হয় ইকুইলিব্রিয়াম পটেনশিয়াল বা রিভার্সাল পটেনশিয়াল। সোডিয়ামের রিভার্সাল পটেনশিয়াল ENa হল সেই পটেনশিয়াল যে পটেনশিয়ালে সোডিয়াম আয়নের জন্য যে পটেনশিয়ালে সোডিয়ামের রাসায়নিক ঘনত্ব এবং ইলেক্ট্রোমোটিভ ফোর্স উভয়ই পরস্পরের সাথে সাম্যাবস্থায় থাকে, একে অধিকাংশ সময় সোডিয়ামের নার্নেস্ট পটেনশিয়াল হিসেবে উল্লেখ করা হয়। নার্নেস্ট সমীকরণ ব্যবহার করে খুব সহজেই নির্ণয় করা যায় একটি বিশেষ আয়নের রিভার্সাল পটেনশিয়াল।
ভোল্টেজ ক্ল্যাম্পের মাধ্যমে আয়নিক কারেন্টের পরিমাণ জানার মাধ্যমে প্রত্যেকটি আয়নের জন্য আলাদা আলাদা করে জানা যায় কোষ পর্দার পরিবাহকত্বের পরিমাণও। তবে মনে রাখতে হবে এরা ভোল্টেজ এবং সময় নির্ভর, মূলত একেকটি ফাংশন (ভোল্টেজ, সময়)। নীচে আয়নিক কারেন্ট থেকে পরিবাহকত্ব নির্ণয়ের পদ্ধতি দেখানো হল।
INa= gNa(Vm-ENa)
উপরের সমীকরণ থেকে আমরা পাচ্ছি নার্ভ মেমব্রেনে সোডিয়াম আয়নের পরিবাহকত্ব, gNa.
gNa= INa/(Vm-ENa)
ঠিক অনুরূপ ভাবে নির্ণয় করা যায় gk
তাহলে দেখা যাচ্ছে, INa, Ik, gNa, gk , C, ENa, Ek সবই নির্ণয় করা যায়। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে হডজকিন-হাক্সলির নিউরন মেমব্রেনের মডেলটি আক্ষরিক অর্থে সম্পূর্ণ পরিমাপযোগ্য, যা নিউরোসায়েন্সকে অন্তর্ভুক্ত করে পরিমাপযোগ্য বিজ্ঞানের তালিকায়। এভাবেই কনডাক্টেন্সের সাথে সিরিজে একটি করে ব্যাটারি, আর এদের প্যারালালে ক্যাপাসিটর বসিয়ে হডজকিন হাক্সলি উপস্থাপন করেছিলেন মেমব্রেনের ইলেকট্রিকাল বৈশিষ্ট্য, যেখানে মেমব্রেনের দুইপাশের বিভব পার্থক্যই হল মেমব্রেন পটেনশিয়াল। যখন কোষ স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে, তখন কোষের পরিবাহকত্বও স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু কোন কারণে কোষের দুইপাশের জমা আয়নে অস্থিতিশীলতা চলে এলেই মেমব্রেন পটেনশিয়াল বদলে যায়, আর কোষের পরিবাহকত্বও পরিবর্তনশীল হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হয় অ্যাকশন পটেনশিয়াল। তাদের লব্ধ এই সব জ্ঞানকে তারা নিউরনের কোষপর্দার ইলেকট্রিকাল মডেল রূপে উপস্থাপন করিয়েই সমগ্র বিশ্বকে অনুধাবন করিয়েছিলেন, নিউরন আসলে কি? স্নায়ুতন্ত্রের ফাংশনাল ইউনিটের কর্মপ্রক্রিয়ার স্বরূপ।
——————————————————————————–
[বেশ কয়েক পর্বে নিউরন এবং এর কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা করার কারণটি ছিল ছিল নিউরাল মেকানিজমকে ভালভাবে জানা, যার উপর ভিত্তি করে বুঝতে হবে পুরো স্নায়ুতন্ত্রকে, এর কাজকে। এই পর্যন্ত এসে বুঝতে পারছি, নিউরন এবং অ্যাকশন পটেনশিয়াল নিয়ে লিখে যেতে থাকলে হয়ত শেষ করতে পারব না। তবে আশার কথা হচ্ছে, অভিজিৎ দার মস্তিষ্কের আনইন্টিলিজেন্ট ডিজাইন নিয়ে লেখাটায় দেখলাম, ভাইয়া অ্যাকশন পটেনশিয়াল সঞ্চালন, কেবল থিওরি (তথ্য চুইয়ে পড়া) নিয়ে লিখবেন, আমি নিশ্চিন্ত মনে আপাতত নিউরন নিয়ে আলোচনা এখানেই শেষ করছি। নিউরনকে বুঝতে গেলে শুধু বায়োলজির জ্ঞান দিয়ে আর বেশী দূর টেনে নেয় সম্ভব নয়, এইবার দরকার গণিতের জ্ঞান। হডজকিন- হাক্সলির মূল প্রবন্ধে যত গাণিতিক সমীকরণ আছে, সেগুলো যেদিন নিজে বুঝতে এবং অন্যকে বোঝাতে সমর্থ হব, সেদিন না হয় আবার শুরু করব নিউরন নিয়ে আলোচনা-যজ্ঞ। সামগ্রিক অর্থে এতো বিশাল, এতো নিখুঁত, এতো শ্রম সাপেক্ষ কাজ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবার জন্য আমার মত একজন শিক্ষানবিশকে যথেষ্টই সাধনা করতে হবে।
নিউরন নিয়ে আমার সব লেখালেখি সেই সব তরুণদের উদ্দেশ্যে, যারা জানতে চায় মস্তিষ্কের রহস্যকে। একটা অবিশ্বাস্য ধরণের কৌতূহল উদ্দীপক জ্ঞানের চারণভূমি পড়ে আছে, যার অধিকাংশ রহস্যই এখনো উন্মোচিত হয়নি, একদিন হয়ত বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম হাত লাগাবে সেই রহস্য উন্মোচনে। আমি আশাবাদী।]
———————————————————————————-
তথ্যসূত্রঃ
1. Hodgkin, A.L. & Huxley, A.F. A quantitative description of membrane current and its application to conduction and excitation in nerve. The Journal of Physiology 117, 500-544 (1952).
2. Cole, K.S. & Curtis, H.J. ELECTRIC IMPEDANCE OF THE SQUID GIANT AXON DURING ACTIVITY. The Journal of general physiology 22, 649-670 (1939).
3. Hodgkin, A.L., Huxley, A.F. & Katz, B. Measurement of current-voltage relations in the membrane of the giant axon of Loligo. Journal of Physiology 116, 424-448 (1952).
4. Huxley, A.F. Hodgkin and the action potential 1935–1952. The Journal of Physiology 538, 2 (2002).
5. The Nerve Impulse.
6. Hodgkin-Huxley Experiments
7. Active Behavior of the Cell Membrane

Saturday, May 5, 2012

মডেল

আমার বন্ধু তনু, বুয়েটে পড়াকালে এই মেয়েকে দেখতাম শুধু দৌড়ের উপর থাকতো। আর সাথে একটি কথা, যাই রে, মডেলের জন্য কাজ করতে হবে। না ভাই, এই মডেল সেই বিজ্ঞাপনের মডেল না, এই মডেল হল স্থাপত্য প্রকল্পের জন্য ডিজাইন করা মডেল। ধরুন  একটা স্কুলের নকশা তৈরী করবে, কেমন হবে স্কুলের ক্লাসরুম, কেমন হবে তার চত্ত্বরটি, কোনদিকে থাকবে এর মুখটি ঘোরানো, এইসব আরকি কিছু পরিচিত চিহ্নের সাহায্যে প্রকাশ করা, যা দেখলেই সব স্থপতি আর পুরকৌশলীরা বুঝে ফেলবে, নকশাকারী কেমন নকশার কথা ভাবছে। অটোক্যাডে সেসব নকশা করে তা আবার ফোমবোর্ড কেটে কেটে স্কুল বা হাসপাতাল বা বহুতল ভবনের একটা আপাত প্রতিকৃতিও বানিয়ে ফেলতো ওরা। বুয়েটে আমার হল জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ কেটেছে আমার তনুর সাথে, স্থাপত্যকলার শিক্ষার্থীদের সাথে। আমি মোটামুটি আধা না হলেও সিকি ভাগ বুঝি স্থাপত্যকলার ব্যাপার স্যাপার। তবে আমি সচেতন একটি ব্যাপারে, ভুল করেও সবজান্তা বাঙ্গালীর মত স্থপতিগিরি ফলাতে যাবো না।

তনুর সাথে কাটানো সেই দিনগুলোর এক অদ্ভুত ধরণের সৃত্মি জমা আছে আমার মনের মধ্যে। তনুর কাছ থেকে আমি শিখেছি একধরণের পর্যবেক্ষণ। আমি আর তনু বিকেলে যখন রাস্তায় হাঁটতে বেরুতাম, ওকে দেখতাম, রাস্তার পাশের টুকরো টুকরো জিনিশ থেকে আস্ত জিনিস সবকিছু কি গভীর মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করছে। বিকেলের সেই ভ্রমনে আমাদের কোন বাধাধরা সময় সীমা ছিল না, ধীর পদক্ষেপে আমরা হাটতাম, গল্প করতাম, এটা ওটা আলোচনা করতাম। আর সাথে চলত সেইসব আপাত তুচ্ছ জিনিসের পর্যবেক্ষণ। কোন এক পুরনো নোনা ধরা দেয়ালে হয়তো একটি বড় ফাটল, তার ফোকরে ফোকরে শেওলা, দেখার চোখ থাকলে সেই ফাটলই হয়ে ওঠে তথ্যের খনি। আচ্ছা, ফাটলটা এমন কোনাকুনি কেন? ইঞ্জিনিয়ারিং বা স্থাপত্যের শিক্ষার্থী হলে জানার কথা, এটা কোন মামুলি প্রশ্ন নয়, এই একটি ফাটলের জন্য পুরো ভবনের নকশা থেকে শুরু করে নকশাকারীকে পর্যন্ত নাস্তানাবুদ করে ছাড়া যায়। যমুনা সেতুর ফাটল নিয়ে হাজারো সমালোচনার মুখে আছে সেতুর নকশাকারী, প্রকৌশলীরা।

পায়ের কাছে পড়ে আছে হয়ত একটা ছোট্ট কাঁচের টুকরো, এটাকে কি করে মনোহরী শিল্পে রূপান্তরিত করা যায়, তা ভাবার বিষয় বটে। অথচ, জিনিসগুলো বেখেয়ালে কত তুচ্ছই না মনে হয়। এইভাবে নিজের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য তুচ্ছ জিনিসের মাঝ থেকে জ্ঞানটুকু, সুন্দরটুকু খুঁজে নিতে শিখেছিলাম তনুর কাজ থেকে। এখন আর আমাদের একসাথে হাঁটা হয় না বিকেলের মায়াবী আলোয়, কিন্তু তনুর কাছ থেকে পাওয়া অভ্যাসটা আমাকে ছেড়ে যায় না একটি মুহুর্ত।

তনুকে দেখতাম, যেকোন প্রজেক্টের মডেলের প্রথম সরলরেখাটা টানার আগে সে বিষয় নিয়ে করত বিস্তর পড়ালেখা। দরকারে যেতো প্রজেক্ট সাইটে। সঙ্গে থাকতো ডায়রী, পেন্সিল, ক্যামেরা। কাজে বসবার আগে কাজের পরিকল্পনাটা করে নিতো যথাসম্ভব নিখুত ভাবে। ১৪ সপ্তাহের সময় সীমা আছে মাথার ভিতরে, তবুও ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনাটা করতে না পারলে কাজের কাজটি হবে না যে।

আমি তনুর কাছে ঋণী, যখন আমি কেবলই একজন ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্রী ছিলাম, গবেষণার সাথে সম্পৃক্ত হইনি, তখনই ও আমাকে দেখিয়েছিল কিভাবে করতে হয় কাজ। ঋণী আমার প্রফেসরের কাছেও, যিনি আমাকে গবেষক হিসেবে গড়ে তুলতে দিয়ে যাচ্ছেন শ্রম। গবেষক মানেই নয় বিশাল কিছু করে ফেলা, বরং প্রথমত অনুসন্ধানে নিয়োজিত হতে শেখা।

এখন আমাকেও ভাবতে হয় তনুর মত, একটা মডেলএর কথা। অটোক্যাডে একে নয়, প্রজেক্ট সাইটে গিয়ে নয়, কূল কিনারা হীন জ্ঞানের চারনভূমি চষে নিজের মাঝে গড়ে তোলা একটা অন্তর্দৃষ্টি যা দিয়ে আমি গড়র আমার মডেল, গাণিতিক নকশা।

Tuesday, March 13, 2012

দুখঃবোধেরা বজায় থাকুক চিরকাল

এক একজন মানুষ হঠাৎ হঠাৎ ভালোবাসতে শিখে যায়।
আর তাতেই, তাতেই ঘনিয়ে আসে তার সব দুর্দশা।
ভালোবাসতে না জানা মানুষগুলো হেসে হেসে লুটোপুটি খায়।
বলে কিনা, দেখ দেখ, আবেগ যেন গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
তারা অন্তরে জ্বলে পুড়ে মরে,
ভালোবাসতে জানা মানুষটার শুদ্ধতায়।
নির্জনে ভাবে, মানুষটা ভালো...
আমাদের মত এখনো মরেনি অন্তরে।
এখনো হয়নি সে শকুনের গ্রাস!

Monday, February 20, 2012

জৈবিক বুদ্ধিমত্তার নিরিখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা


মানুষ এই পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত প্রাণী, কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহারে মানুষ অনেক উন্নত একথা সত্যি হলেও বিস্ময়কর ভাবে আমাদের মস্তিষ্কটিই আমাদের কাছে বিরাট একটি বিস্ময় রয়ে গেছে। আমরা এখনো জানতে পারিনি, ঠিক কি ঘটছে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে। আকাশের তারা দেখে যতটা ভাবনায় ডুব দিয়েছি, তার চেয়েও বিস্ময়কর ব্যাপার কিভাবে আমরা ভাবছি? কিভাবে শিখছি, কিভাবে সৃষ্টি করছি শিল্পের সব বিমূর্ত ধারণা? জানিনা, তবে থেমে নেই আমাদের জানার চেষ্টা। বিগত শতাব্দীর অনেকটা সময় জুড়েই মানুষের ধারনা ছিল, মানুষের মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে কি ঘটছে, তা জানা প্রায় অসম্ভব। চিকিৎসাবিজ্ঞানে হিউম্যান এনাটমী যেরকম যুগান্তকারী ভুমিকা রেখেছে, ততখানি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা নিউরোএনাটমি নিউরোসায়েন্সে রাখতে পারেনি। তার প্রধান কারনগুলোর মধ্যে পড়ে, মস্তিষ্ক বা নার্ভাস সিস্টেম মানব দেহের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ, যার ন্যূনতম বিচ্যুতির কারনে মানুষের কার্যক্রমে বড় রকমের প্রভাব পড়তে পারে। তার দরুন বর্তমান সময়ে এসেও আমরা সরাসরি জীবিত মানুষের মস্তিষ্কে কোন ইলেক্ট্রনিক প্রোব বসাতে পারিনা, মস্তিষ্কের কার্যক্রম বুঝতে গিয়ে যাতে মস্তিষ্কের ক্ষতি না হয়ে যায়, সেই দিকে সবসময় লক্ষ্য রাখতে হয়। মানব দেহ যতটুকু অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক প্রবাহ সহ্য করতে পারে, সেই সীমার মধ্যে আমাদের এক্সপেরিমেন্ট গুলো চালাতে হয়। কারণ মস্তিষ্কের একটি কোষও যদি ক্ষতিগ্রস্থ হয়, তা আর পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব হবে না। মানবেহের অন্য সব কোষের স্বতঃস্ফূর্ত পুনঃস্থাপন প্রক্রিয়া থাকলেও নিউরণের নেই। তাই মস্তিষ্কের আঘাত বা কোন রকম ক্ষতিকে এড়ানোর সর্বোচ্চ চিন্তা মাথায় রেখেই কাজ করতে হয় এখানে। এখনও পর্যন্ত অনেক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় সাবজেক্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয় মানুষের নিকট আত্মীয় শিম্পাঞ্জী বা বানরকে। মানুষের মৃত্যুর পর পরই এর জৈব কোষগুলোর পচন প্রকিয়া শুরু হয়ে যায়। তখন মস্তিষ্ক কেটেকুটে দেখেও খুব বেশী লাভ নেই, সমস্ত স্নায়ুতন্ত্র জুড়েই নিউরণ ও তার এক্সনগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, কিন্তু মৃত্যুর সাথে সাথে তাদের নিউরাল অ্যাকটিভিটি বন্ধ হয়ে গেছে। এই সমস্ত সীমাবদ্ধতা এবং সেই সাথে মানুষের অর্জিত জ্ঞানের অভাবের কারনেই  একটা সময় পর্যন্ত বিজ্ঞনীদের ধারনা ছিলো, মস্তিষ্ক নামের এই ব্ল্যাক বক্সটার প্রকৃত কার্যপ্রণালী জানা সম্ভব নয়। কিন্তু মানুষের আগ্রহ কি তাই বলে থেমে থাকতে জানে?

জেনেটিক-মেমেটিক কো-এভোলিউশন (শেষার্ধ)


সেই আদিম মানুষ, যার শরীর আবৃত ছিল এক স্তর লোমে, খুঁজে খুঁজে পশু শিকারের জন্য বেছে নিয়েছিল ধারালো পাথর, পাথরে-পাথরে ঠোকাঠুকিতে জ্বালিয়ে ফেলেছিল অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, সে কি নিজেকে জিজ্ঞেস করেছিল, কেন আমি সবার চেয়ে আলাদা? কিংবা সুন্দরবনের শিকারী বাঘ, ক্ষুধা মেটাতে যে অভাবনীয় মাত্রার দ্রুতগতি আর শারীরিক শক্তিতে অনায়াসে ঘায়েল করে ফেলছে বুনো হরিণ, সে কি নিজের কাছে কখনো জানতে চেয়েছে, আমি কি করে এতো দ্রুত ছুটতে পারি? এই “আমি” বোধটি কি আসলেই উপস্থিত ছিল আমার আদিম পূর্বপুরুষের মাঝে বা শক্তিশালী বাঘের মস্তিষ্কে? এই প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর আমার জানা নেই। তবে এটুকু জানা আছে… মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করেছে, আমি কে? কোথা থেকে এলাম, কিভাবে এলাম? আত্মপরিচয় সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর-পর্বের শেষে মানুষ এখন আছে ‘কেন আমি আলাদা?’ এই প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে।

জেনেটিক-মেমেটিক কো-এভোলিউশন (প্রথমার্ধ)

“Koi desh perfect nehi hota, Usko perfect banana pudta hai.” (“No country is perfect. It has to be made perfect.”)
তেজদীপ্ত কন্ঠে বলে ওঠে এক যুবক, সেই প্রত্যয়ী তরুণদলটি হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে রেডিওতে জানান দিচ্ছে, এক এক করে কয়েকজন ক্ষমতাধারী দুর্নীতিপরায়ণ মানুষকে তারা ছুটি দিয়েছে পৃথিবীর দেনা পাওনার খাতা থেকে… তারা জানে, তাদের নিঃশ্বাস ফুরিয়ে আসার সময় ঘড়ির কাটার চেয়েও দ্রুতই এগিয়ে আসছে… এমনই এক মুহূর্তে তারা দেশবাসীকে জানান দিচ্ছে… এই দেশকে বদলে দেবার প্রত্যয়ের কথা! এটা আমার অন্যতম প্রিয় চলচ্চিত্র “RANG DE BASANTI” এর সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্ত! বুলেটবিদ্ধ রক্তাক্ত শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্যটা আমাদের কাছে একটা বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছে… যদি দেশটাকে বদলে দিতে চাও তবে বদলে ফেলো, করবো বলার আগে বলে ওঠো আমি যা করতে চেয়েছি, তাই করেছি!এই দেশটাকে অন্যায়ের কালো রঙ থেকে তুলে শুদ্ধতার রঙে আলোকিত করে দেব, কথাটি যতটা অন্তঃসারশূন্য, আমি বা আমরা শুদ্ধতার পথে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় পদক্ষেপটা বাড়িয়ে ফেলেছি, এই উচ্চারণটা ততটাই আনন্দে দৃপ্ততায় সাহসে পরিপূর্ণ!

মস্তিষ্কে, অনুরণন সংগোপনে – নিউরণ কিভাবে কাজ করে?


নিউরণের গঠন নিয়ে অনেক হৈচৈ করলাম, এইবার একটু দেখি, স্নায়ুকোষ কিভাবে কাজ করে, কিভাবে তথ্য পরিবহন করে, তার কার্যনীতিটা কেমন?
আগেই বলেছি, মানব দেহের ভিতরে যা কিছুই হয়, তা মূলত কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়া। কিংবা একটি অনুর অথবা আয়নের দেহের ভিতরে একটা জায়গা থেকে আরেকটা জায়গায় যাওয়া। সুতরাং নিউরণের কার্যক্রমেও যে অনু পরমাণু বা আয়নের একটা জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়াই হবে, সে নতুন কিছু নয়।
কোষের ভিতরে এবং বাইরে আছে তরল পদার্থ এবং তাতে ভেসে বেড়ায় কিছু আয়ন, প্রোটিন ইত্যাদি। ব্যাপারটা এভাবে চিন্তা করা যেতে, খাবার লবন এবং অন্যান্য ধরণের কিছু লবণ, কিছু অদ্রবণীয় পদার্থকে যথেষ্ট পরিমাণ পানির মধ্যে ভালোভাবে মিশ্রিত করে খুব ছোট ছোট ফুটো বিশিষ্ট কোন পর্দার মাধ্যমে একটি পাত্রে বিশুদ্ধ পানি থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছে। পর্দাটি সেক্ষেত্রে কোষ পর্দার মত কাজ করবে, তবে শর্ত হল, পর্দাটি হতে হবে সেমি পারমিয়েবল বা সিলেকটিভলি পারমিয়েবল। তাহলে সেমি পারমিয়েবল পর্দার বাধা অতিক্রম করে আয়ন এবং অন্যান্য পদার্থগুলো উচ্চ ঘনত্বের তরল থেকে বিশুদ্ধ তরলের দিকে যেতে চেষ্টা করবে। কোন আয়নকে যেতে দেবে, আর কোন আয়নকে যেতে দেবে না, তা নির্ভর করবে, মধ্যস্থ পর্দাটি কখন কোন আয়ন বা পদার্থের জন্য কতটুকু অতিক্রম যোগ্য, তার উপর। এইভাবে কিছু আয়ন থাকে কোষের ভিতরের তরলে আর কিছু আয়ন কোষের বাইরের তরলে। আর এই দুই তরলকে আলাদা করে রাখে সেল মেমব্রেন বা কোষ পর্দা নামের একটি সেমি-পারমিয়েবল পর্দা, যা সিলেকটিভলি পারমিয়েবলও বটে। যার মধ্য দিয়ে কিছু নির্দিষ্ট অনু যেতে পারে, আর কিছু অনু যেতে পারে না। অর্থাৎ, কিছু রাসায়নিক দ্রব্যকে সে সময় মত যেতে দেবে, আবার সময় মত যেতে দেয় না।

মস্তিষ্কে, অনুরণন সংগোপনে – নিউরনের গল্প

আমি যখন স্কুলে পড়তাম, তখন জীববিজ্ঞান বইয়ের জীবকোষ সংক্রান্ত অধ্যায়ে একটা অদ্ভুত দর্শন কোষের ছবি আঁকা থাকতো, আর লেখা থাকতো, স্নায়ুতন্ত্র গঠনকারী কোষকে বলা হয় নিউরন। অন্যরা কি করত বলতে পারবো না, কিন্তু যতবার আমি ছবিটা দেখতাম, ততবার মনে হত, একটা কোষ দেখতে এতো সুন্দর হয় কি করে? একটা তন্তু আছে, যার নাম কিনা অ্যাক্সন, অন্যান্য কোষের মত কোষদেহ আছে, নিউক্লিয়াস আছে, কিন্তু কোষদেহ থেকে আবার ডেনড্রাইট নামের অনেকগুলো শাখা প্রশাখা বেরিয়েছে। আমার তখন ইন্টারনেটে পদচারণা ছিল না। আমাদের স্কুলের লাইব্রেরীটা ছিলো অনেকটা শোকেসের মত, বই তাতে সাজানো থাকতো। কলেজের আপুরা এসে কিছু ক্লাসের বই পড়ত, কিন্তু স্কুলের কেউ আসতো না লাইব্রেরীতে… জীববিজ্ঞানের বই খুঁজে দেখেছিলাম, পেয়েছিলাম কতগুলো উচ্চমাধ্যমিক ক্লাসের বই, সেখানেও এমন কোন তথ্য পাইনি নিউরন সম্পর্কে, যা আমি জানিনা। টের পেতাম, মনের মধ্যে জানার আগ্রহ, কিন্তু তারচেয়েও বড় কথা, এই অদ্ভুত কোষটাকে আমার অদ্ভুত সুন্দর লাগে, অ্যাক্সন, ডেনড্রাইট, নোড অফ র্যা নভিয়ার, নিউরনের বিভিন্ন অংশের এইসব নামগুলোকে পর্যন্ত আমি ভালোবাসতে শুরু করেছি। আর বিস্ময়, এই কোষটা ছিলো বলেই আমি ভাবতে পারছি, মনে রাখতে পারছি, শিখতে পারছি… কি কল্পনাতীত ক্ষমতা এই কোষটার! কী এক বিস্ময়!

মস্তিষ্কে, অনুরণন সংগোপনে – নিউরোএনাটমি


মাতৃভাষা, শব্দটার আবেদনই আলাদা! মায়ের মুখে শোনা ভাষা তো বটেই, মায়ের গর্ভ থেকেও শোনা ভাষা এটা। এভাবেই ভাষার বুনিয়াদ। তারপর বর্ণমালায় বই হাতে নিয়ে পড়তে শেখা, লিখতে শেখা। আমাদের এক শিক্ষকের মেয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, মা, তুমি বলেছ, “এ” কে এ বলতে আবার “A” কেও এ বলতে, কোনটা আসল এ? এইভাবে শনাক্ত করতে, এক ভাষাকে আরেক ভাষায় রূপান্তর করতেও আমরা একসময় শিখে যাই। আসল কথা হল, ইটের পর ইট গাঁথা! প্রথম ইটটা না বসালে গাঁথা যায় না দ্বিতীয় ইট! তাই মস্তিষ্ক সপর্কে জানতে গেলে আমাদের প্রথমে যেটা জানতে হবে, তা হল নিউরো এনাটমি। একটা সময় ছিল যখন প্লেটো এরিস্টটল মন বা স্বত্তার অস্তিত্ব নিয়েই ছিল দ্বিধান্বিত। সেই অতীতের দর্শন যুগ পেরিয়ে আমরা এখন পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের যুগে। স্টিফেন হকিং এর মত দর্শনকে মৃত বলছি না, কিন্তু মস্তিষ্ককে কেটেকুটে দেখার মধ্যে, স্নায়ুকোষে আয়নিক ঘনত্বের পরিবর্তন বা মস্তিষ্কের ঠিক কোন অংশ দেহের কোন অংশকে নিয়ন্ত্রন করছে, তা জানার প্রচেষ্টায় এখন আমরা ধোঁয়াশা দর্শনের মুখাপেক্ষী নই। আমাদের জানা শেষ হতে মেলা দেরী এ সত্যি, তবে কোনটা “এ” আর কোনটা “A”, সে আমরা জানি। এই বিল্ডিং ব্লকগুলোকেই একটু নেড়েচেড়ে দেখব আজ।

মস্তিষ্কে, অনুরণন সংগোপনে – নিউরাল এভোলিউশন


এক মহাবিস্ফোরণে ফলে সৃষ্টি হল পৃথিবী, সেই জলন্ত অগ্নিপিন্ড ক্রমেই ঠান্ডা হয়ে এলো একসময়, কিভাবে কিভাবে যেন কেমন জটিল জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে উদ্ভব হল প্রথম প্রানের, এই কথাগুলো যখন শুনতাম স্কুলবেলায়, কেমন যেন বিস্ময়কর লাগতো! সবই রহস্য! তখন আমার সীমিত জ্ঞানের ভান্ডারকে কেবল বিস্মিত করত না একটা ব্যাপার, প্রথম প্রানের ছিল না মস্তিষ্ক। থাকবে কি করে? তার তো নাকি নিউক্লিয়াসটাই ছিল না সুগঠিত। পৃথিবীর জন্ম, প্রানের উদ্ভব এসব কিছু বিজ্ঞান আর ধর্মের ঘাত প্রতিঘাতে রহস্যময় ঠেকলেও আমার সাধারণ জ্ঞান ঠিকই মেনে নিয়েছিল, বেঁচে থাকার জন্য মস্তিষ্কের প্রয়োজন নেই। মানুষের মস্তিষ্ক থাকলেও মানুষের শরীরে বাসা বাধা ব্যাকটেরিয়াটা মস্তিষ্ক ছাড়াই দিব্যি বেঁচে আছে আর সু্যোগ পেলেই আমা্র মত মানুষকে অসুস্থ করে ফেলছে!

Thursday, February 16, 2012

মস্তিষ্কে, অনুরণন সংগোপনে – সূচনা

মহাবিশ্বের এক ছোট্ট গ্রহে বসবাস আমাদের, এই জীবজগতের অসংখ্য উদ্ভিদ এবং প্রাণীর এবং তাদেরই একাংশ হয়ে মানুষের। হ্যা, জীবজগত, উদ্ভিদ, প্রাণী এসবকিছু বলার পরেও বিশেষভাবে আলাদা কর বলা প্রয়োজন হচ্ছে মানুষের কথা, যারা আদতে আর দশটা প্রাণীর মতই প্রাণীকূলের আরেকটি প্রজাতি মাত্র। তবু কেন এইভাবে আলাদা করে বলতে হচ্ছে? কারণ, এই যে আমি লিখেছি, আপনি এখন পড়ছেন, ঠিক এইভাবে আর কোন প্রাণী পারছে না লিখতে পড়তে। আমি ভাবছি, আপনাকে ভাবাচ্ছি, এমনি করে কত না নানান ভাবে প্রতিমুহূর্তে আমরা করছি যোগাযোগ। চিন্তা করুন সে সময়ের কথা, যখন মানুষ আগুন দেখে ভয়ে পালাতো, মানুষের বসবাসের জঙ্গলগুলো আগুনে পুড়ে হতো ছারখার। ডালে ডালে ঘর্ষণে যে আগুনের স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি হত, শুকনো পাতায় ছড়িয়ে পড়ে সে আগুনের ফুলকি থেকে সর্বগ্রাসী দাবানল কেড়ে নিতো মানুষের প্রাণ, স্থান আর সঙ্গঘবদ্ধতা, তাকে ভয় না পেয়ে উপায় কি ছিল? তবু সেইকালে মানুষ চিন্তা করেছে, কেন এই আগুন? কেন আকাশ থেকে আসে বজ্রের গর্জন। তারা জানেনা কিছুই, জানার নেই উপায়ও কোন। কিন্তু প্রশ্নটা ঠিকই করে ফেলেছে। অজ্ঞতা থেকে হয়ত সেদিন আগুনের আক্রোশ মেটাতে পূজো দিয়েছে আগ্নিদেবকে, সে মানুষের ব্যর্থতা নয়, বরং সাফল্য এইখানেই, মানুষ প্রশ্নটা করে ফেলেছে নিজেদের কাছে, খুঁজতে শুরু করেছে উত্তর! আর এইভাবেই কোন এক অতি আদিম যুগে ঘটেছিল বুদ্ধির উন্মেষ। সেই মানুষ, আজ জ্ঞান বিজ্ঞান সভ্যতা, সংস্কৃতি, সমাজ কতকিছুর ধারক ও বাহক! সেই আদিম এক বুদ্ধির উন্মেষ কোথায় নিয়ে এসেছে মানুষকে। কিন্তু কই, আর কোন প্রাণীতো পারেনি এই উত্তোরণে সামিল হতে। বনে আগুন লাগলে আজো বন্যপশুরা প্রাণ বাঁচাতে ছুটে পালায়, কিন্তু হাজার হাজার বছর ধরে তারা কেবল ছুটেই পালালো, আগুনে কাঁচা ফল-মাংস রান্না তো করে খেতে পারল না। তাই স্বাভাবিকভাবেই সমগ্র প্রাণীজগতের কথা বলার পরেও আলাদা করে বলতে হয় মানুষের কথা, তার বৌদ্ধিক বিকাশের কথা, সভ্যতার উত্তরণের কথা, প্রকৃতিকে ব্যবহার করতে পারার কথা। আর এইসবই মানুষ পেরেছে কেবল মাত্র অন্যসব প্রাণীর চেয়ে উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন মস্তিষ্কের জোরে, মস্তিষ্কের ভিন্ন গঠনের জোরে। আমাদের এই উত্তরণের সবটুকু রহস্য লুকিয়ে আছে মাথার খুলির মাঝে যে নরম টিশ্যুটা, সেইখানে।