মাত্র গতকাল, বইমেলা থেকে কিনে আনলাম জি এইচ হাবীবের অনুবাদকৃত ইয়স্তেন গার্ডারের লেখা সোফির জগৎ বা SOFIES VERDEN. বইটা হাতে নিয়ে থেকেই আমি খুব বেশী উত্তেজিত! আমার মনের ছন্দটা আসলে সবচেয়ে বেশী উদীপ্ত হয়ে ওঠে মনস্তত্ত্ব আর দর্শনের সমন্বয়ে। আর এই বইটা তেমনি একটি। আমার বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা কতটুকু আমি জানিনা, তবে প্রথম অংশটুকু পড়েই আমি লিখতে বসে গেছি, বিস্ময়ে! গত দশ-এগারো বছর ধরে আমি যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি, সেই প্রশ্নটি হল, পৃথিবীটা কোথা থেকে এলো? প্রশ্নটা দেখে বিস্মিত হইনি, হয়েছি সোফির ভাবনা দেখে, ঠিক যেভাবে আমি ভেবেছি, হুবহু সেইভাবেই সোফি ভাবছে! সৃষ্টিকর্তা আছেন কি নেই? আরেকটু অবাক হয়েছি, এটা খেয়াল করে, এই প্রশ্নের মুখোমুখি আমি যখন হয়েছি, সেই বয়সটা ছিল তের-চৌদ্দের সন্ধিক্ষণ, সোফির চেয়ে সামান্য কিছু কম! পার্থক্য এটুকুই, আমাকে কেউ চিরকুট পাঠায় নি। আফসোস লাগছে।
জন্মেছি ধর্মভীরু বাবা-মায়ের ঘরে। কিন্তু আমার শৈশবের নায়ক আমার দাদু! কে তিনি? তিনি একজন মানুষ, যিনি কখনও আমাকে সরাসরি কিছু শেখাননি। শুধু আমার এই পূর্বসুরীর কাছ থেকে আমি জেনেছি, চিন্তা করতে হয়। আমি আমার দাদুর সান্নিধ্য আসলেই খুব কম পেয়েছি! কিন্তু যেটুকু দেখেছি তাকে, বুকের নীচে একটা বালিশ দিয়ে উপুর হয়ে শুয়ে কি যেন পড়ছেন নাহয় কি যেন লিখছেন! পেশায় স্কুল শিক্ষক ছিলেন। ১৯৪২ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তে পড়তে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অসমাপ্ত রেখেই সেই যে গ্রামে ফিরে এলেন, আর কোনদিন ওমুখো হলেন না। সারাজীবন শুধু নিজেই পড়লেন। নিতান্ত সাদামাটা জীবন যাপন করলেন। আমি আমার স্মৃতি ঘেটে কোনদিন দেখিনি দাদুকে ঘরের ভিতরে ঘুমাতে। বারান্দায় একটা চৌকি পেতে তার উপর একটা পাটি আর একটা বালিশ! সাথে ঋতু ভেদে কাঁথা কিংবা লেপ! এইভাবে থাকার কারণ কি তা আমার কাছে একটা রহস্য! উত্তর জানা নেই। শীত গ্রীস্ম, ঝড় বৃষ্টি কিছুই তাকে ঘরের ভিতরে নিতে পারেনি। খোলা বাতাস গায়ে মেখে নব্বই বছর পার করে দিলেন! ওইখানে শুয়ে শুয়ে কি পড়েছেন? তার আগ্রহের বিষয় ছিল, ধর্ম ও দর্শন! সারাজীবনে কি শিখেছেন এতো পড়ে, তা কতটুকু ঠিক ছিল বা ভুল ছিল, আমি তা বিচার করতে যাই না। আমি শুধু জানি, আমি দাদুর কাছ থেকে শুধু তার উপস্থিতির কারণেই কিছু জানার আগ্রহ পেয়েছি। এই না হলে আমি আর এই আমি হতাম না। উত্তরসূরী হিসেবে এই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া!
দাদু পনের সন্তানের গর্বিত জনক। উনার পাঁচ কন্যা জানেনই না, আস্তিকতা বা নাস্তিকতা ভাবার মত একটা বিষয়। তিনপুত্র ধর্মভীরু, প্রকৃত অর্থেই উনারা ধর্মকে ভয় পান। একজন গোঁড়া ধার্মিক। দুইজন বুঝে উঠতে পারেন না ধর্ম আসলে কি, আস্তিকতা বা নাস্তিকতা এইসব নিয়ে ভেবে কি হবে, জীবন তো সুন্দর চলে যাচ্ছে। আর অবশিষ্ট তিন পুত্র নাস্তিক। আর আমি হলাম ভাগ্যবতী, এমন একটা বহুমাত্রিক পরিবারের অংশ বলে। তাই ছোটবেলা থেকেই এইসব নিয়ে ভেবেছি। চোখের সামনে এমন বিশ্বাসের বিভিন্নতা দেখে স্বাভাবিক ভাবেই চিন্তা করেছি, ঈশ্বর আছেন কি নেই? অনেক জায়গাই যুক্তি দিয়ে ঈশ্বর কে খুঁজে পাইনি, আবার যুক্তি দিয়ে খুঁজে পাইনি বলে ঈশ্বর নেই, এটাও ভেবে বসে থাকিনি। ভেবেছি, অনেক ভেবেছি। অবশেষে বিগ ব্যাং থিওরী যখন আমাকে শেখালো, একটা কেন্দ্রীভূত ভর থেকে মহাবিশ্বের বিস্ফোরণ, গ্রহ নক্ষত্রের ক্রমাগত বিস্তৃতির ব্যাপারটা যখন জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণ সমর্থন করে বলে জানলাম, তখন বিগ ব্যাং কে মেনে নিলাম। কিন্তু একটা কেন্দ্রীভূত ভর থেকেই যদি সবকিছু সৃষ্টি হয়ে থাকে তাহলে সেই কেন্দ্রীভূর ভর এলো কোথা থেকে? ওইটা কি শূন্য থেকে এলো? না তা হতে পারে না। নাকি নিজে নিজেই তৈরী হল? না, তা হতে পারে না। তাহলে কি আসলেই কেউ ঐ কেন্দ্রীভূত ভর সৃষ্টি করেছে? কে সে? সে-ই কি ঈশ্বর? তাহলে কি আসলেই ঈশ্বর আছেন? এই জায়গাই গিয়ে আমার যুক্তি যে থেমেছে... আমি এখনও তা অতিক্রম করতে পারিনি। কোন যুক্তি দিয়ে এই প্রশ্নের সন্তুষ্ট হবার মত উত্তর পাইনি বলেই ঈশ্বরের অস্তিত্বকে স্বীকার করে নিয়েছি। সেই প্রথম বিশ্বাস করেছি, ঈশ্বর হয়ত আসলেই আছেন। যেহেতু বিশ্বাস করি, তাই আমি আস্তিক। কিন্তু এখনও কিছু বিশ্বাসের মাঝেও কিছু জায়গা রেখেছি, যুক্তির জন্য। আমার ছোট কাকার সাথে এসব নিয়ে আমার অনেক কথা হয়। কাকুকে ক্লাস এইটে পড়ার সময় একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি যদি আমাকে যুক্তি দিয়ে বুঝাতে পারেন, সৃষ্টির রহস্য অন্যকিছু, আমি নির্দ্বিধায় যুক্তির কাছে মাথা নত করে দেব। কাকু সেদিন পারেনি। আবারো জিজ্ঞেস করেছিলাম, দ্বাদশ শ্রেনীতে পড়ার সময়, কেন আপনি নাস্তিক? সৃষ্টিরহস্য নিয়ে আমি যে প্রশ্ন করেছি আপনাকে, এর উত্তরে কিছু বলেন আমাকে। উত্তরে বলেছিলেন, তুমি বড় হও, নিজেই বুঝবে। এরপর আরো ছয় বছর কেটে গেছে। আমি আজো যুক্তি দিয়ে সমাধান পাইনি। অনেকেই অনেক রকম উত্তর দেয়। আমি সন্তুষ্ট হতে পারিনা। আর যারা কঠিন ধর্মভীরু, তাদের সাথে তো যুক্তি দিয়ে কথাই বলা যায় না। আমি জানিনা, মৃত্যুর আগে পদার্থবিজ্ঞান বা গণিতের সূত্রের মত কোন নিশ্চিত প্রমাণ পাব কিনা এই প্রশ্নের উত্তরে। আশাই আছি।
আমি আস্তিক বা নাস্তিক কোন দলকেই অসম্মান করি না। এটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার, সে কি বিশ্বাস করে। আমি শুধু বলতে চাই, বিশ্বাস এবং প্রমাণ দুটো আলাদা জিনিস।
[কাউকে না বুঝে আঘাত করে থাকলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।]
প্রথম প্রকাশ সচলায়তনে
February 9, 2010 [ Last six month have changed my thought a lot. I wish write it in my blog in time :) ]
No comments:
Post a Comment