চল্লিশ কেজির খানিক বেশী এই শরীরটার ওজন। মাথাটা মনে হয় সেই তুলনায় একটু বেশীই ভারী। মাঝে মাঝেই মনে হয়, মাথাটা না থাকলে একটু সাচ্ছন্দ্যে চলতে পারতাম। এই মাথাটাতেই কিনা আমার ইচ্ছা করে সারা দুনিয়ার সব কিছু ঢুকিয়ে রাখি। নাহ ঠিক বললাম না, সব কিছু না, কেবল তাই যা আমি শিখতে চাই, জানতে চাই আর আমার জীবনের সুন্দর মুহুর্তগুলো। নতুন কিছু করার যে কি আনন্দ, তা আমি জানি। খুব সাধারন একটা ধারণাকে যখন নিজের মত করে আবিষ্কার করে ফেলি, মনে হয়, এইতো চেয়েছিলাম। রবীন্দ্রনাথ পারে না আমায় এমন ভাবে হাসাতে। তবে শান্তিনিকেতন বড় টানে। ল্যাবে আমার পাশে বসে থাকে জামান। আমার চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট। কোকড়া চুল, হাসে খুব মিষ্টি করে। জামানকে যখন দেখি এক দৃষ্টিতে ব্রেডবোর্ডের দিকে তাকিয়ে আছে, কোথায় যেন ঝালেমা পাকাচ্ছে সার্কিটটা, তখন আমি মনে মনে খুশি হয়ে যাই। জানি, ঝালেমার মুন্ডুপাত করে ফেললেই জামানের মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে মায়াবী হাসিতে। এই নভেম্বরেও রোজকার টিশার্টের জায়গায় শার্ট পড়তে হলে জামানের বিরক্ত লাগে। বাহুল্য ছাড়া আর কি! ওদের একটা মজার ব্যাপার আছে, যাতে আমি কোনদিন যোগ দেইনি। কাজ করতে করতে হঠাৎ হঠাৎ উঠে যায় ওরা। কিছুক্ষনের জন্য সিগারেটে আত্মসম্পর্পন করে আবার জীবন জলাঞ্জলি দেয় সার্কিটের ঘোর প্যাচে। কি সাধারন একটা জীবন অথচ কি সুন্দর। ভারী মায়া জমে গেছে আমার জামানের সরলতায়।
আমার এখনো সার্কিটে মন বসাতে হয়নি। হবে হয়ত একদিন। আমার মাথার মধ্যে খালি ঘোরে স্টিলের তারের নির্ঝঞ্ঝাট চলাচল। অ্যানসিস নামের বিদ্ঘুটে সফটওয়্যারটা জীবনে প্রথমবারের মত হাতে নিয়ে বড় কষ্ট লাগছে। এই সফটওয়্যার যারা বানায়, তারা কি জিনিসরে বাবা! আমার তো ব্যবহার করতেই জান খারাপ হয়ে যাবে। রাতঘুমে স্বপ্ন দেখা কেমন কেমন জানি! কিন্তু জেগে জেগে স্বপ্ন দেখার কি যে ভয়ানক চাপ, সে আমাকে চারপাশের বাস্তবতাকে ভুলিয়ে দেয়। কিন্তু ছাড়তে পারিনা কিছিতেই। বাঁচবোই না ছাড়লে! নিজে না বাঁচি, স্বপ্নকে বাঁচাতে হবে। বাঁচাতে হবে জামানের মুখের মায়াবী হাসিকে। বাঁচাতে হবে ওর মত গবেষনায় বুঁদ হয়ে নিশঃব্দে যারা একটা একটা করে সিঁড়ি গেঁথে আকাশ ছোঁবে, তাদের স্পৃহাকে।
মার্কিনীরা যদি পারে জন হপকিন্সের মত বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে, আমরা কেন পারবো না?