এক মহাবিস্ফোরণে ফলে সৃষ্টি হল পৃথিবী, সেই জলন্ত অগ্নিপিন্ড ক্রমেই ঠান্ডা হয়ে এলো একসময়, কিভাবে কিভাবে যেন কেমন জটিল জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে উদ্ভব হল প্রথম প্রানের, এই কথাগুলো যখন শুনতাম স্কুলবেলায়, কেমন যেন বিস্ময়কর লাগতো! সবই রহস্য! তখন আমার সীমিত জ্ঞানের ভান্ডারকে কেবল বিস্মিত করত না একটা ব্যাপার, প্রথম প্রানের ছিল না মস্তিষ্ক। থাকবে কি করে? তার তো নাকি নিউক্লিয়াসটাই ছিল না সুগঠিত। পৃথিবীর জন্ম, প্রানের উদ্ভব এসব কিছু বিজ্ঞান আর ধর্মের ঘাত প্রতিঘাতে রহস্যময় ঠেকলেও আমার সাধারণ জ্ঞান ঠিকই মেনে নিয়েছিল, বেঁচে থাকার জন্য মস্তিষ্কের প্রয়োজন নেই। মানুষের মস্তিষ্ক থাকলেও মানুষের শরীরে বাসা বাধা ব্যাকটেরিয়াটা মস্তিষ্ক ছাড়াই দিব্যি বেঁচে আছে আর সু্যোগ পেলেই আমা্র মত মানুষকে অসুস্থ করে ফেলছে!
আগেই জেনেছি, আমাদের পৃথিবীতে প্রানের উদ্ভবের প্রায় বহু বহু কাল পরে এতে স্নায়ু কোষের দেখা মিলেছে, প্রায় ৭০০ মিলিয়ন বছর আগে। বিবর্তনের সবগুলো অধ্যায় এখনো আমাদের কাছে অজানা, সেইরকম অজানা এই স্নায়ু কোষ উদ্ভবের প্রক্রিয়াটাও। সাম্প্রতিক কালের বিজ্ঞানীদের ধারণা, সামুদ্রিক স্পঞ্জের মধযেই প্রথম শুরু হয়েছিল স্নায়ু কোষের উদ্ভব প্রকিয়া। পর্যবেক্ষনে দেখা গেছে, স্পঞ্জেরা স্পর্শ বা পারিপার্শ্বিক চাপ অনুভব করতে পারে এবং তাদের শরীর তাতে সংকুচিত হয়। ২০০৭ সালের ৬ই জুন ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, সান্টা বারবাবার বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানীরা প্রকাশ করেন, স্পঞ্জের স্নায়ুকোষ না থাকলেও স্পঞ্জের মধ্যে খুঁজে পাওয়া গেছে ২৫টা জিন যা মানুষের সাইন্যাপ্সের যোগাযোগ রক্ষাকারী জিনগুলোর অনুরূপ। আর বিস্ময়কর ব্যাপার হল, স্পঞ্জ জিনগুলো যে প্রোটিন তৈরী করে তাও মানবদেহের সিন্যাপ্সের প্রোটিনগুলোর মত করেই নিজেদের মাঝে যোগাযোগ করে। হয়তো সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল স্নায়ুতন্ত্র সৃষ্টির প্রক্রিয়া।
জালের মত গঠনের মস্তিষ্ক বিহীন সরল স্নায়ুতন্ত্রকে বলা হয় নার্ভ নেট বা স্নায়ুজালক। এই ধরনের স্নায়ুজালকের দেখা মেলে হাইড্রা, জেলীফিশ, সামুদ্রিক অ্যানেমোনদের শরীরে। স্নায়ুজালকের স্নায়িকোষগুলো বিচ্ছিন্ন কিন্তু সাইন্যাপ্স দ্বারা অন্তঃসংযুক্ত। এদের শরীরে স্নায়বিক যোগাযোগ উভয়মুখী। সাধারণত, মুখের চারিদিকে স্নায়ুকোষের আধিক্য দেখা যায়। এরাও স্পর্শ, আলো, রাসায়নিক পরিবর্তন ইত্যাদিতে সাড়া দিতে সক্ষম।
সেগমেন্টেড নার্ভ ট্রাঙ্ক বা বিভাজিত স্নায়ুতন্ত্রঃ
সাধারনত ফ্ল্যাটোয়ার্মে এই ধরনের দ্বিপ্রতিসম স্নায়ুতন্ত্র দেখা যায় যাতে থাকে স্নায়ুবজ্জু দিয়ে মইয়ের মত করে সংযুক্ত স্নায়ুজালক। মাথার দিকে থাকে পুঞ্জীভূত স্নায়ুকোষ যা অনেকটা মস্তিষ্কের মত কাজ করে। এই পুঞ্জীভূত স্নায়ুকোষ আবার নিচের মই আকৃতির স্নায়ু জালকের সাথেও সংযুক্ত।
গ্যাঙ্গগ্লিয়া বা পুঞ্জীভূত স্নায়ুকোষঃ
পুঞ্জীভূত স্নায়ুকোষ অনেকটা মস্তিষ্কের মত কাজ করে। সাধারণত দেহের অগ্রভাগে বা মাথার দিকে এই পুঞ্জীভূত স্নায়ুকোষের দেখা মেলে। স্কুইড জাতীয় প্রানীর শরীরে দেখা যায় এদের।
মস্তিষ্কঃ
মেরুরজ্জু সমেত সুগঠিত স্নায়ুতন্ত্রে মূল অংশই হল মস্তিষ্ক। কর্ডেট শ্রেনীতেই এই ধরনের সুগঠিত মস্তিষ্কের প্রাধান্য দেখা যায়। মস্তিষ্ক সুগঠিত হওয়ার সাথে সাথে প্রানীর চলন এবং শারীরিক গঠন হয়ে গেছে জটিলতর। এই মস্তিষ্ক নিয়েই হবে এবার আমাদের আলোচনা।
মানব বিবর্তনের নেপথ্যে
ট্যাক্সোনমিস্টরা আমাদের ফেলেছেন প্রাইমেট বর্গে, আরেকটু পরিষ্কার করে বললে আমরা পড়ি স্তন্যপায়ী প্রানীদের দলে। প্রানীজগতে আমরা ঠিক কোথায় আছি, তা বোঝানোর জন্য, আমরা মাত্র ২৩০ – ২৭০ টা প্রাইমেটের মাঝে অন্য সবপ্রানীর তুলনায় সামগ্রিকভাবে যোগ্যতায় দক্ষতায় অনন্য এক প্রজাতি, এইটুকু আত্মস্বীকৃতি নেহায়েত কম নয়। ওরাঙ্গওটাং, গরিলা, শিম্পাঞ্জীর সাথে বংশানুক্রমিক মিলের কারনেই আমরা এপ উপদলভুক্তও। নীচের ছবিটাই আমাকে মানব বিবর্তনের ধারা আরো বিশদ ব্যাখ্যার হাত থেকে মুক্তি দিয়ে দিচ্ছে।
খুব সাধারণ ভাবলে যদি আমাদের খুব পরিচিত কতগুলো প্রাইমেটের দিকে তাকাই, তাহলেই কতগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট চোখে পড়ে যাবে। প্রাইমেটরা সাধারণত তাদের হাতের ব্যবহার নিয়ন্ত্রনে দক্ষ হয়। বিবর্তন পরিক্রমায় তারা পেয়েছে বুড়ো আঙ্গুলকে যথেচ্ছ ঘোরাবার স্বাধীনতা, আর সেই সাথে বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে অবশিষ্ট আঙ্গুলগুলোর অগ্রভাগ স্পর্শ করার ক্ষমতা, যা তাদের যেকোন কিছু হাতের মুঠোয় ধরতে সাহায্য করে। ভাবুন বানরের কথা, তারা কি সুন্দর করে এক গাছের ডাল থেকে আরেক গাছে চলে যাচ্ছে, মুঠোর বন্ধনে গাছের ডাল। এই দক্ষতা এই জাতীয় প্রানী গুলোকে গাছের ফলমূল, পাতা, ইত্যাদি সংগ্রহে দিয়েছিল বিশেষ সুবিধা। আরেকটু ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এদের আঙ্গুলের নখর ক্রমাগত নখে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।
এইবার দৃষ্টি ফেরাই চোখের দিকে। পাখি বা মাছেদের ক্ষেত্রে চোখের অবস্থান ছিলো মাথার দুপাশে, তাই তাদের পক্ষে একটি চোখে কেবল একটা দিকের বস্তুগুলোই দেখা সম্ভব হত, কোন বিশেষ বস্তু কে দেখার জন্য একসাথে দুটি চোখ ব্যবহার করা সম্ভব ছিলো না। প্রাইমেটদের চোখ এইখানেও পেয়ে গেছে বিশেষ সুবিধা, তাদের চোখ দুটো মাথার সামনের দিকে অবস্থিত হওয়ায় তারা কোন বিশেষ বস্তুকে দেখার জন্য একই সাথে দুই চোখ দেখার ক্ষমতা রাখছে। তাদের এই বাইনোকিউলার দৃষ্টির কারণে তারা ত্রিমাত্রিক বস্তু দেখার সুবিধা পাচ্ছে, বস্তুর উচ্চতা বা গভীরতা অনুধাবন করতে পারছে আর সাথে যুক্ত হয়েছে রঙ। তাই প্রাইমেটদের পৃথিবীটা অন্য প্রানীদের মত একরঙ্গা বা দ্বি-রঙ্গা নয়, রঙ্গে রঙ্গে রাঙ্গা!
সাধারণত, প্রাইমেট বর্গের প্রানীরা, প্রত্যেকবার গর্ভধারনে একটি করেই সন্তান প্রসব করে এবং তাদের গর্ভধারন কালও অন্যদের তুলনায় লম্বা। ফলশ্রুতিতে প্রাইমেট শিশুরা পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠই হচ্ছে অধিক পরিপক্কতা নিয়ে। তারপরও একটি প্রাইমেট শিশুর পরিপূর্ণ অবস্থায় আসতে লেগে যায় অনেক দীর্ঘসময়, দরকার হয় পরিচর্যা। এই সময়কালটা অনেকাংশেই প্রাইমেটদের সামাজিক আচরণের জন্য দায়ী।
অধিকাংশ প্রাইমেটদের ক্ষেত্রেই সোজা হয়ে দাড়াবার বা বসার প্রবণতা দেখা যায়। পরিপূর্ণভাবে মানুষের মত বা আধুনিক মানুষের নিকট পূর্বপুরুষের মত দাড়াতে না পারলেও তারা ক্রমাগত দেহের ভরকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রন অর্জন করেছে। আর সাথে, দেহের লম্বা হাড়গুলোর সংযোগস্থলের ঘূর্ণন কোণও বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রাইমেটদের ত্রিমাত্রিক দৃষ্টিশক্তি, নাকের গড়ন এবং মস্তিষ্কের ঘ্রানেন্দ্রিয়ের এলাকায় সংকোচন, জটিল স্বরযন্ত্র, সাজসজ্জার প্রবণতা, সামাজিকতা, সন্তান লালন পালন এইসব বৈশিষ্টের বেশ উন্নত সমন্বয়ই অন্য প্রানীদের চেয়ে তাদের বেঁচে থাকার জন্য দিয়েছে বাড়তি সুবিধা। আর এই সবকিছুর পিছনে মূল চাবিকাঠি হিসাবে কাজ করেছে তাদের উন্নততর মস্তিষ্কের গঠন এবং কার্যক্ষমতা।
দেহের ভরের সাথে মস্তিষ্কের আকারের সম্পর্ক
The Evolution of the Brain and Intelligence বইতে হ্যারি জেফারসন প্রানীর জটিল আচরণের সাথে মস্তিষ্কের আকারের সম্পর্ক বোঝাতে ব্যবহার করেন principle of proper mass. তিনি একটি সূচক ব্যবহার করেন, যাতে তিনি দেখান, মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধি শরীরের আকার বৃদ্ধির প্রায় সমানুপাতিক। কোন প্রানীর ওজন এবং আয়তন থেকে সেই প্রানীর মস্তিষ্কের আকার সম্পর্কে অনুমান করা যায়। এই সূচককে বলা যায়, মস্তিষ্কের আয়তন-দেহের ভর এর অনুপাত। ছবিতে x অক্ষ বরাবর দেহের ওজন এবং y অক্ষ বরাবর মস্তিষ্কের ওজন দেখান হয়েছে। ডায়াগোনাল রেখাটা প্রানীর মস্তিষ্কের প্রত্যাশিত আকার।
EQ= Weight (Brain)/Expected Weight (Brain)। মস্তিষ্কের প্রত্যাশিত ভর বা EW= 0.12 w(Body)^2/3 যদিও কিছু শ্রেনীর জন্য এই ঘাত 2/3 এর বদলে 3/4 ই বেশী নিকটতম।
Encephalization Quotient এর ছবি থেকে স্পষ্ট ভাবেই দেখা যাচ্ছে, হোমিনিডদের দেহের অনুপাতে তাদের মস্তিষ্কের আকার বেড়ে গেছে। এখন প্রশ্ন হল, কেন হোমিনিডদের মস্তিষ্কের আকার বেড়ে গেল? বিজ্ঞানীরা, এই প্রশ্নের উত্তরে নানান মতামত দিয়েছেন, যদিও সবকটা মতামতই অনুমান নির্ভর, তবে অনুমানগুলো অযৌক্তিক নয়।
মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধিতে জলবায়ু এবং পরিবেশগত পরিবর্তন বেশ ভূমিকা রেখেছে বলেই ধারণা করা হয়। প্রানীরা গভীর এবং আদ্র অরণ্যভূমি থেকে যতই শুষ্ক তৃণভূমির দিকে এসেছে, ততই হোমিনিডদের সোজা হয়ে দাড়াবার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। টিকে থাকার চাপের কারণেই এইসব জায়গায় আস্তে আস্তে আধিপত্যবিস্তার করেছে মানব বৈশিষ্টের দিকে বিবর্তিত হোমিনিডেরাই। পরিবর্তন এসেছে তাদের খ্যাদ্যাভাসেও। বিজ্ঞানীদের মতে, হোমো হাবিলিস, হোমো ইরেকটাস, হোমো সেপিয়েন্স সবকটা প্রজাতির বিবর্তনের পিছে এই পরিবেশের প্রভাবই অন্যতম কারণ। পরবর্তিত পরিবেশের সাথে যারা খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে তারাই টিকে গেছে শেষ পর্যন্ত। আর এই সব কটা ক্ষেত্রেই বড় মস্তিষ্কের অধিকারীরাই পেয়েছে সুবিধা, কারণ তাদের ছিলো পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেবার মত বুদ্ধিমত্তা!
মানব বিবর্তনে মস্তিষ্কের ভূমিকা নিয়ে যেকটা হাইপোথেসিস আছে, তার মধ্যে আমরা সর্বপেক্ষা আলোচিত, গ্রহণযোগ্য তিনটি হাইপোথেসিস নিয়ে আলোচনা করব।
প্রাইমেটদের জীবনধারা
গল্পটা অনেকটা এই রকম, পাকা ফল খেয়ে কোন একটা প্রানী জীবন ধারন করে, তাহলে, তার কয়েকটি বৈশিষ্টের দরকার হবে। প্রানীটিকে ফল পাকা নাকি কাঁচা এটা রঙ দেখে বুঝতে হবে, ফলের এই গাছটি কোথায় আছে, সেটা জানতে হবে, বছরের কোন কোন সময়ে এই গাছের ফল খাওয়া যাবে, তা বুঝতে হবে, পাকা ফল খাওয়ার জন্য তার দক্ষতার সাথে গাছে উঠতে হবে, আর ফল সংগ্রহের জন্য নিজের প্রজাতির মধ্যে এবং অন্য প্রজাতির প্রানীর সাথে সহযোগিতার সম্পর্ক তৈরী করতে হবে। আর এইসব জটিল বৈশিষ্ট অর্জন করতে সন্দেহাতীত ভাবেই প্রয়োজন একটা জ়টিল কর্মসাধনে সক্ষম বড় মস্তিষ্ক। যাদের এই বৈশিষ্টগুলো ছিল, তারাই ফল খেয়ে ভালোভাবে পরিবেশে টিকে থাকতে পেরেছে। বিবর্তনের ধারায় যারা ছিল বড় মস্তিষ্কের উত্তরাধীকারী তারাই সাফল্য অর্জন করেছে টিকে থাকার এই যুদ্ধে। ১৯৯৩ সালে ক্যাথেরিন মিল্টন তার একটা সমীক্ষায় দেখিয়েছেন ফল সংগ্রহ করে জীবনধারনের সাফল্যের সাথে বড় আকারের মস্তিষ্কের গুরুত্ব এবং সম্পর্ক।
শারীরবৃত্তিয় পরিবর্তনঃ
১৯৯০ সালে ডিন ফক নামের একজন নিউরোসাইকোলজিস্ট তার সমীক্ষায় উপস্থাপন করে মস্তিষ্কের বিবর্তনে এই রেডিয়েটর তত্ত্ব। চিন্তা করে দেখুন একটা গাড়ির রেডিয়েটরের কথা, প্রচুর তাপ উৎপাদিত হচ্ছে, তা ঠান্ডা করার ও প্রয়োজন হচ্ছে। রেডিয়েটরের পৃষ্ঠদেশ যত বড় হবে, তা ঠান্ডা করা তত সহজ হবে। এটা রেডিয়েটর কেন, তাপ বিকিরন করে এমন যে কোন পদার্থের জন্যই সত্য। কত দ্রুত উত্তপ্ত বস্তু ঠান্ডা হবে, বা কতক্ষন বস্তুটাকে কার্যকরী অবস্থায় রাখা যাবে, তা নির্ভর করে পৃষ্ঠদেশের ক্ষেত্রফলের মত। আমাদের মস্তিষ্কও কাজ করে অনেকটা গাড়ীর ইঞ্জিনের মতই, প্রতিদিন আমরা যত চিন্তা করছি, যত জটিল কাজে লিপ্ত হচ্ছি, যত আমাদের জীবনযাপন হচ্ছে জটিল, ততই আমাদের মস্তিষ্কের কাজ বেড়ে যাচ্ছে। বাড়ছে তাতে তাপের উৎপাদনও। তাই একে ঠান্ডাও করার প্রয়োজন বেড়েছে। গাড়ির রেডিয়েটর ঠান্ডা করতে আমরা যেমন বাতাস বা পানি ব্যবহার করি, তেমনি আমাদের মস্তিষ্ক ঠান্ডা করতেও প্রয়োজন প্রচুর রক্ত চলাচল। প্রয়োজন বড় পৃষ্ঠদেশ। আর সেই প্রয়োজনের তাগিদেই বেড়েছে মস্তিষ্কের আয়তন। অনেক ভাজে ভাজ হয়ে বেড়েছে বহিঃস্তরে শিরা উপশিরা কৈশিক জালিকা। সেইসাথে আরেকটা ব্যাপারও ঘটে গেছে। অধিক রক্ত চলাচলের কারণে মস্তিষ্ক অক্সিজেন আর গ্লুকোজও পেয়েছে বেশী। বেড়েছে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা। মানুষের মস্তিষ্ক, যা দেহের মোট ভরের ২% ও না, তা একাই ব্যবহার করে আমাদের অক্সিজেন সরবরাহের শতকরা ২৫ ভাগ আর গ্লুকোজ সরবরাহের শতকরা ৭০ ভাগ! এইভাবেই মস্তিষ্কের আয়তন বৃদ্ধি কেবল মানুষকে নিয়ে গেছে প্রয়োজন আর সরবরাহের সাম্যবিন্দুর নিকটে!
আরেকটা লক্ষ্যনীয় পরিবর্তন হল, বিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের চোয়ালের গঠনে পরিবর্তিত হয়েছে। কামড়ানো এবং চিবানোর জন্য যে বড় এবং শক্ত হাড় এবং মাংশপেশী ছিল, তা যখন আগের চেয়ে কম যায়গা নিতে শুরু করল, তখন মস্তিষ্কও আয়তন বৃদ্ধি প্রাপ্ত হবার মত যথেষ্ট জায়গা পেয়ে গেল। হ্যানসেল স্টেডম্যান ও তার দলের মতে (২০০৪), প্রায় ২.৪ মিলিয়ন বছর আগে ঘটা এমন এক মিউটেশনের ফলেই এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।
অপরিণতবস্থা
একটু অদ্ভুত শোনাচ্ছে শব্দটা, তাই না? ইংরেজীতে শব্দটা হল Neoteny. কোন প্রজাতির পরিণত হবার হার কমে যাবার প্রকিয়াকে বলা হয় নিওটেনি। যখন একটা শিশু জন্মগ্রহন করে, তার মস্তিষ্কের আয়তন থাকে তার শরীরের তুলনায় বেশী। এখন কোন এক জেনেটিক মিউটেশনের কারণে যদি শিশুটির শরীর পর্যাপ্ত পরিমাণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত না হয়, তাহলে মস্তিষ্কের ওজন-দেহের ওজনের যে অনুপাত তা বেড়ে যাবে। মানুষের পূর্বপুরুষের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, আধুনিক মানুষের সাথেও এমনি একটা ঘটনা ঘটেছে। জন্মের পরবর্তী সময়েই মস্তিষ্ক পরিণত হয়ে উঠলেও সময়ের সাথে সাথে দেহের বৃদ্ধি ঘটেনি যথার্থভাবে। বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষন করে দেখেছেন, মানব শিশুর মাথার আকৃতির সাথে শিম্পাঞ্জীর মাথার আকৃতির বেশ খানিকটাই মিল পাওয়া যায় কিন্তু পরিনত অবস্থায় আর ততখানি মিল দেখা যায় না। এখানেই ক্ষান্ত নয়, মানব শিশুর অনেক বৈশিষ্টের সাথেই মিল খুঁজে পাওয়া যায় শিম্পাঞ্জী শিশুর। জন্মের পরও মানুষের মস্তিষ্ক বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে যতখানি, ততখানি হয়নি শিম্পাঞ্জীর। কিন্তু শিম্পাঞ্জীর মস্তিষ্ক বৃদ্ধি না হলেও দৈহিক বৃদ্ধি ঠিকই হয়েছে। এভাবেই মানুষ আর শিম্পাঞ্জীর EQ হয়ে গেছে ভিন্ন। ধারণা করা হয়, মানুষ হল শিম্পাঞ্জীর নিওটেনিক রূপ। প্রানী জগতে এমন নিওটেনির উদাহরণ আরো পাওয়া যায়।
ম্যাককিনির মতে (১৯৯৮) নিওটেনির কারণেই মানুষের মস্তিষ্কের কোষগুলো বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবার জন্য বেশী সময় পেয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে অধিকাংশ মস্তিষ্ক কোষ তৈরী হয় জন্মের আগে এবং পরে (prenatal & neonatal period)। তারপর আর মস্তিষ্ক কোষ জন্মায় না, যা ঘটে তা কেবল দৈহিক বৃদ্ধি। তাই গর্ভকালীন অবস্থা এবং গর্ভপরবর্তী বৃদ্ধি পর্যায় যতই দীর্ঘায়িত হবে ততই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে মস্তিষ্কের আয়তন বৃদ্ধি!
আধুনিক মানুষ হয়ে উঠার পিছনের জেনেটিক বিবর্তন
জীববিজ্ঞানের জগতে মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা তুলনামূলক ভাবে নবীন একটা শাখা। বিজ্ঞানীদের কাছে বিবর্তন এমন এক বিশাল সমুদ্র, যার মাঝে মানব বিবর্তনকে একটা ক্ষুদ্র দ্বীপপুঞ্জ বলা যায়, সেই দ্বীপপুঞ্জের জন্ম রূপান্তর নিয়ে চলছে তাদের নিরলস গবেষনা। বিবর্তনে মস্তিষ্কের ভুমিকা ও স্নায়ুতান্ত্রিক বিবর্তন নিয়ে আমরা এতোকাল ধরে নানান সমীক্ষা, আলোচনা, যুক্তি দাড় করার চেষ্টা করে আসলেও এর মূল রহস্য কিন্তু লুকিয়ে আছে আমাদের জেনেটিক কোডের মধ্যেই। মানব জিনোম সিকোয়েন্স বের করে ফেলার পরই জীববিজ্ঞানের গবেষনায় চলে এসেছে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। রেডিয়েটর তত্ত্ব, নিওটেনি আরো কত কিছু নিয়েই না চলছে আমাদের জল্পনা কল্পনা, এই তত্ত্ব গুলো আমাদের একটা একটা করে মানব বিবর্তনের অনুমান দিতে পারলেও কিভাবে আমরা আধুনিক মানুষ হয়ে উঠলাম, তার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা দিতে পারে না। যার ব্যাখ্যা দিতে পারবে জেনেটিক সিকোয়েন্স।
ক্যাথেরিন দেখিয়েছেন, Human Accelerated Region নামে একটি জেনেটিক সিকোয়েন্স মানব বিবর্তনের সময়কালে এসে দাড়াবার আগে খুব কম পরিবর্তিত হয়েছে।
তথ্যসূত্রঃ
1. Introduction to Brain & Behavior by Bryan Kolb / Ian Q. Whishaw, 2001
2. What make us human?, Katherine S. Pollard, Scientific American, 2009
3. “The nervous system of invertebrates: an evolutionary and comparative approach” by Wolfram, Page no: 25-26
4. http://faculty.washington.edu/
5. http://anthro.palomar.edu/
6. http://anthro.palomar.edu/
7. http://en.wikipedia.org/wiki/
No comments:
Post a Comment