Saturday, May 5, 2012

মডেল

আমার বন্ধু তনু, বুয়েটে পড়াকালে এই মেয়েকে দেখতাম শুধু দৌড়ের উপর থাকতো। আর সাথে একটি কথা, যাই রে, মডেলের জন্য কাজ করতে হবে। না ভাই, এই মডেল সেই বিজ্ঞাপনের মডেল না, এই মডেল হল স্থাপত্য প্রকল্পের জন্য ডিজাইন করা মডেল। ধরুন  একটা স্কুলের নকশা তৈরী করবে, কেমন হবে স্কুলের ক্লাসরুম, কেমন হবে তার চত্ত্বরটি, কোনদিকে থাকবে এর মুখটি ঘোরানো, এইসব আরকি কিছু পরিচিত চিহ্নের সাহায্যে প্রকাশ করা, যা দেখলেই সব স্থপতি আর পুরকৌশলীরা বুঝে ফেলবে, নকশাকারী কেমন নকশার কথা ভাবছে। অটোক্যাডে সেসব নকশা করে তা আবার ফোমবোর্ড কেটে কেটে স্কুল বা হাসপাতাল বা বহুতল ভবনের একটা আপাত প্রতিকৃতিও বানিয়ে ফেলতো ওরা। বুয়েটে আমার হল জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ কেটেছে আমার তনুর সাথে, স্থাপত্যকলার শিক্ষার্থীদের সাথে। আমি মোটামুটি আধা না হলেও সিকি ভাগ বুঝি স্থাপত্যকলার ব্যাপার স্যাপার। তবে আমি সচেতন একটি ব্যাপারে, ভুল করেও সবজান্তা বাঙ্গালীর মত স্থপতিগিরি ফলাতে যাবো না।

তনুর সাথে কাটানো সেই দিনগুলোর এক অদ্ভুত ধরণের সৃত্মি জমা আছে আমার মনের মধ্যে। তনুর কাছ থেকে আমি শিখেছি একধরণের পর্যবেক্ষণ। আমি আর তনু বিকেলে যখন রাস্তায় হাঁটতে বেরুতাম, ওকে দেখতাম, রাস্তার পাশের টুকরো টুকরো জিনিশ থেকে আস্ত জিনিস সবকিছু কি গভীর মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করছে। বিকেলের সেই ভ্রমনে আমাদের কোন বাধাধরা সময় সীমা ছিল না, ধীর পদক্ষেপে আমরা হাটতাম, গল্প করতাম, এটা ওটা আলোচনা করতাম। আর সাথে চলত সেইসব আপাত তুচ্ছ জিনিসের পর্যবেক্ষণ। কোন এক পুরনো নোনা ধরা দেয়ালে হয়তো একটি বড় ফাটল, তার ফোকরে ফোকরে শেওলা, দেখার চোখ থাকলে সেই ফাটলই হয়ে ওঠে তথ্যের খনি। আচ্ছা, ফাটলটা এমন কোনাকুনি কেন? ইঞ্জিনিয়ারিং বা স্থাপত্যের শিক্ষার্থী হলে জানার কথা, এটা কোন মামুলি প্রশ্ন নয়, এই একটি ফাটলের জন্য পুরো ভবনের নকশা থেকে শুরু করে নকশাকারীকে পর্যন্ত নাস্তানাবুদ করে ছাড়া যায়। যমুনা সেতুর ফাটল নিয়ে হাজারো সমালোচনার মুখে আছে সেতুর নকশাকারী, প্রকৌশলীরা।

পায়ের কাছে পড়ে আছে হয়ত একটা ছোট্ট কাঁচের টুকরো, এটাকে কি করে মনোহরী শিল্পে রূপান্তরিত করা যায়, তা ভাবার বিষয় বটে। অথচ, জিনিসগুলো বেখেয়ালে কত তুচ্ছই না মনে হয়। এইভাবে নিজের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য তুচ্ছ জিনিসের মাঝ থেকে জ্ঞানটুকু, সুন্দরটুকু খুঁজে নিতে শিখেছিলাম তনুর কাজ থেকে। এখন আর আমাদের একসাথে হাঁটা হয় না বিকেলের মায়াবী আলোয়, কিন্তু তনুর কাছ থেকে পাওয়া অভ্যাসটা আমাকে ছেড়ে যায় না একটি মুহুর্ত।

তনুকে দেখতাম, যেকোন প্রজেক্টের মডেলের প্রথম সরলরেখাটা টানার আগে সে বিষয় নিয়ে করত বিস্তর পড়ালেখা। দরকারে যেতো প্রজেক্ট সাইটে। সঙ্গে থাকতো ডায়রী, পেন্সিল, ক্যামেরা। কাজে বসবার আগে কাজের পরিকল্পনাটা করে নিতো যথাসম্ভব নিখুত ভাবে। ১৪ সপ্তাহের সময় সীমা আছে মাথার ভিতরে, তবুও ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনাটা করতে না পারলে কাজের কাজটি হবে না যে।

আমি তনুর কাছে ঋণী, যখন আমি কেবলই একজন ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্রী ছিলাম, গবেষণার সাথে সম্পৃক্ত হইনি, তখনই ও আমাকে দেখিয়েছিল কিভাবে করতে হয় কাজ। ঋণী আমার প্রফেসরের কাছেও, যিনি আমাকে গবেষক হিসেবে গড়ে তুলতে দিয়ে যাচ্ছেন শ্রম। গবেষক মানেই নয় বিশাল কিছু করে ফেলা, বরং প্রথমত অনুসন্ধানে নিয়োজিত হতে শেখা।

এখন আমাকেও ভাবতে হয় তনুর মত, একটা মডেলএর কথা। অটোক্যাডে একে নয়, প্রজেক্ট সাইটে গিয়ে নয়, কূল কিনারা হীন জ্ঞানের চারনভূমি চষে নিজের মাঝে গড়ে তোলা একটা অন্তর্দৃষ্টি যা দিয়ে আমি গড়র আমার মডেল, গাণিতিক নকশা।

2 comments:

  1. অপেক্ষায় রইলাম সেই মডেল দেখার মাই লিল সিস!
    শুভ কামনা।

    ReplyDelete
    Replies
    1. আপনার অপেক্ষা যেন জলদি জলদি সার্থক হয়। :)

      Delete