Wednesday, August 8, 2012

নীলকণ্ঠের চিঠি (৮ই আগস্ট, ২০১২)

প্রিয় অরুণাভ,

আজকাল আমি লেখালেখির সাথে একধরনের দূরত্ব অনুভব করছি। গত দুইবছরের বেশী সময় ধরে আমার লেখালেখি মূলত ঘুরেফিরে বিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ থেকেছে, বলতে গেলে কিছুই লিখিনি নিজের সম্পর্কে, কোন ফিকশনের আশ্রয়েও প্রকাশ করিনি নিজেকে। ওটা ছিল নিজের উপর নিজেরই আরোপিত একধরণের অবরোধ। আমি খুবই আবেগী একটা মানুষ। গত কয়েকবছর ধরে আমার আবেগের বহিঃপ্রকাশে একধরণের পরিবর্তন এসেছে। একজন স্বচ্ছ মানুষের হৃদয়ে যখন আনন্দ খেলা করে, তার হাসিতে তার চোখের তারায় তারায় সেই আনন্দ ঝলমলিয়ে ওঠে। আবার যখন বুকের অলিন্দে কষ্টের ঢেউ আছড়ে পড়ে, সেই ঢেউয়ের গর্জন শোনা যায় বাইরে থেকে। মানুষটার চেহারার ভাঁজে, হাসিতে, চাহনিতে এক তীরভাঙ্গার গান শোনা যায়। আমার চেহারাতে এইসব অনুভূতি প্রকাশ পায়ই, প্রকাশ পায় আমার লেখাতেও। একজন ব্যক্তি আমি - তার কষ্ট আছে, আনন্দ আছে, তৃপ্তি আছে... সবই আছে। কিন্তু আমাদের সমাজে একধরনের চর্চিত আচারও আছে, যা শেখায়, অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ না করায় ভালো। জানতে চাও কেন? মানব সমাজে যুগে যুগে সবসময় কিছু অসুস্থ মানসিকতার মানুষ থাকে, যাদের নিজেদের মাঝে মানবিক চিন্তাবোধের অভাব আছে। সেই লেজকাটা শেয়ালের দল বাকি সবাইকে লেজ না থাকার ফজিলত বর্ণনা করতে চায়। তাদের নিজেদের হৃদয়টা শীসায় মোড়ানো বলে বাকিদেরও অনুভব করাতে চায় জৈবিক হৃদয় জিনিসটা ভালো নয়, পৃথিবীর সমস্ত জৈবিক হৃদয়ের মানুষকে এরা নির্দ্বিধায় বিদ্রুপ করে, আবেগের বহিঃপ্রকাশ দেখলে তাচ্ছিল্যে হেসে কুটি কুটি হয়। এরা না জানে আবেগকে অনুভব করতে, না জানে মানবীয় আবেগকে সম্মান জানাতে। সাম্প্রতিক পৃথিবীরে এদের সংখ্যা এতটাই বেড়ে গেছে, মানুষগুলো আজকাল এদের মাঝে দলিত মথিত হয়ে কোনমতে টিকে থাকে। এইদলটির সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল মাহজেরীনরের সাথে পরিচয়ের মাধ্যমে। ক্রমেই জেরীনের কিছু শিষ্যেরও দেখা মিলল। জেরীনের এই হৃদয়হীনতার প্রকাশটা এতোটাই শিল্পিত ছিলো, যে কিছু মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডহীন ব্যক্তি সেটাকেই আদর্শ ভাবতে শুরু করল। হৃদয়হীনতার অশিল্পিত রূপটাও আমি দেখেছি, মৌ নামের আমাদের এক সহপাঠিনীর মাঝে। গত কয়েকটা বছর কষ্ট যন্ত্রণা ভালোবাসাময় এমন একটা তীব্র সময় পার করেছি, যে শেষের দু বছরে আমি সযতনে হৃদয়ের কথা আড়াল করে গেছি, আর কোন কারণে নয়, কিছু হৃদয়হীন মানুষের কাছে আমার হৃদয়ের অনুভূতিগুলো আঘাতপ্রাপ্ত হবার সুযোগ সৃষ্টি হোক সেটা চাইনি বলেই। এখন ক্রমাগত হৃদয়ের ঝাঁঝ অনেকতা সহনীয় হয়ে এসেছে, তবুও মাঝে মাঝে অকল্পনীয় তুফানের মত তা প্রকাশিত হয়ে যায়। হৃদয়ের মাঝে পাথর চাঁপা সেইসব অনুভূতিকে এইবার তাই মুক্তি দিয়েছি, "বিচ্ছিন্ন দ্বীপ" নামের ছোট্ট লেখাটির মাধ্যমে। নিজেকে এখন আমার আগের চেয়ে অনেক নির্ভার লাগছে। আর এখন তোমার কাছে নিবেদন করছি, আমার দিনরাত্রের সকল কাব্যগাঁথা। একধরনের তৃপ্তি অনুভব করছি।

আমার বিগত দুইবছরের লেখালেখিতে আমি নিজেকে উপেক্ষা করে কেবল বিজ্ঞান চর্চা নিয়ে মেতে থেকেছি, কষ্ট ভুলে থাকার একধরনের ইন্দ্রজালের মত। সেখানে যে আমাকে সবাই দেখেছে, সে এক লৌহমানবী, জ্ঞানে বুদ্ধিতে সাধণায় আগ্রহে ঝকঝকে তারার মত। কিন্তু আজকের আমি নিতান্ত সাধারণ একজন মানবী, আমার আনন্দ দুঃখ বেদনা ভালোবাসা সবকিছু নিয়েই আমি, সম্পূর্ণা এবং আমার মানবীরূপ আজ প্রকাশিত। আজ আর কেবল বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখির আড়ালে আড়াল করতে চাই না আমি নিজেকে। গবেষণা তো আমার সারাজীবনের কর্ম। সে আমি করবই, তবে হৃদয়কে আড়াল করে আর নয়।

সম্প্রতি আমার কাজের মাঝে এমন একটা মোড় এসেছে, এখন খানিকটা আমার দিনরাত পড়ার সময়, জানার সময়। একদিকে নিউরোসায়েন্সের খুব মৌলিক বিছু বিষয়কে যেমন গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে, তেমনি তা প্রকাশের জন্য গণিতের অস্ত্রে শানও দিতে হবে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আর যাই হোক, আমার গণিতের অস্ত্রটাকে ধারালো করার বুদ্ধি বাতলে দেয়নি। আজকের প্রজন্মের কিশোরেরা গণিত অলিম্পিয়াডের মাঝে গনিতকে শিখ বুঝতে ভালোবাসতে শিখে যায়। আমার সেই না করে ওঠা কাজটা এইবার আমাকে করতে হবে। আমি আজকের কিশোরদের মত গণিতযজ্ঞে পারদর্শী না হলেও আমাকে হয়ে উঠতে হবে, আমার স্বপ্নের কাছাকাছি পৌছবার জন্য। তাই অল্প জেনে লেখালেখি করার মত সময় এখন আর নেই আমার। আমার লক্ষ্য জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক হওয়া না, জাত বিজ্ঞান গবেষক হওয়া। জনপ্রিয়তা আমাকে টানে না, যা টানে আমাকে, সেই জানার নেশার চক্করে নিজেকে এবার মনপ্রাণ দিয়ে সঁপে দেব।

-নীলকণ্ঠ
৮ই আগস্ট, ২০১২

No comments:

Post a Comment