উত্তর আমেরিকায় বসবাসকারী মানুষ মাত্রই জানে, অত্র এলাকার প্রগতিশীল আর রক্ষণশীল জনগোষ্ঠীর মাঝে বিতর্কের একটা প্রধান বিষয় হল অ্যাবরশন রাইট। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামা অঙ্গরাজ্যে পাস হয়ে গেল অ্যাবরশন নিষিদ্ধকরণ আইন। এই অঙ্গরাজ্যে আইনত এখন অ্যাবরশন অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে, শিশু হত্যার অপরাধে গর্ভধারণকারী নারীকে বা দম্পতিকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে, এমনকি যে চিকিৎসক/ নার্স অ্যাবরশন করবেন বা সাহায্য করবেন তার শাস্তি হবে। তাই নিয়ে আমেরিকার প্রগতিশীল জনগোষ্ঠী তুমুল ক্ষুব্ধ, ক্ষোভে ফুঁসছে নারীবাদীরা। ব্যাপারটা আমেরিকার, আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারতো, আমার এই ব্লগ লেখার হয়তো কোন প্রয়োজনই হত না, যদি না দেশটা বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী একটি দেশ হত যেখানে ঘটে যাওয়া প্রত্যেকটা প্রশাসনিক এবং আইনি ঘটনা প্রভাবিত করে বিশ্বের অন্যান্য সকল দেশকে। ঘটনাচক্রে এই মূহুর্তে আমি পড়ালেখা করছি আমেরিকাতেই, তাই যতদিন এই দেশের মাটিতে আছি, ততদিন এই দেশের আইন এবং সমাজ আমাকেও সরাসরি প্রভাবিত করবে। বছর দশেক আগেও যখন সহজ সরল সদ্য কৈশোর পেরুনো তরুণী ছিলাম, যখন আমাদের সমাজব্যবস্থা নারীর প্রতি কতটা কঠিন মাত্রায় রুদ্র হতে পারে, সে বুঝতাম সীমিতই, তখনও হয়ত আমি অ্যাবরশনের মত বিষয় নিয়ে লিখতে বসতাম না। সরল মনে ভাবতাম, আমি তো গর্ভবতী না, আমার কি? যখন অন্তসত্বা হব, তখন না হয় এই নিয়ে মাথা ঘামানো যাবে, এই ভেবে এই বিষয়টাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতাম। কিন্তু গত দশ বছর জীবন আমাকে যা শিখিয়েছে, তাতে অ্যাবরশন রাইটের মত বিতর্কিত বিষয়ে কলম ধরতেই হল। কারণ, সারাবিশ্বের সব কটা দেশেই এই বিষয়টা নিয়ে নারীকে এক হাত দেখে নেয়া হয়, আমার ছোট্ট বাংলাদেশেও।
অ্যাবরশন বিরোধীরা নিজেদের pro-life বা জীবনবাদী হিসেবে চিন্তা করে। তাদের চিন্তাভাবনা হল, জীবন চলবে জীবনের গতিতে, জীবনে শুধু নিজের সুবিধামত সিদ্ধান্ত নেব আর অসুবিধা হলেই একটা জীবন ফেলে দিব সেটা ঠিক না। মায়ের বা দম্পতির তাদের অসুবিধার কারণে গর্ভে আসা নতুন জীবনকে পৃথিবীতে না আসতে দেয়ার অধিকার নেই। পৃথিবীতে আসাটা তাদের ভাষায় ভ্রূণের অধিকার। তারা অ্যাবরশন এবং সন্তান হত্যাকে একইরকম ভয়াবহ অপরাধ মনে করে। এইটা তাদের কাছে মানুষের নৈতিকতার প্রশ্ন। নৈতিকতার প্রশ্ন ছাড়াও তাদের অ্যাবরশনকে সন্তান হত্যার সমতুল্য অপরাধ মনে করার পিছনে আছে ধর্মীয় চিন্তাভাবনা। সব প্রচলিত ধর্মেই শিশু হত্যা পাপ, এমনকি জন্মনিয়ন্ত্রণও অনেকেদের কাছে পাপ মনে হয়, কারণ জন্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শিশুর জন্মকে বাধা দেয়া হচ্ছে বলে অনেকে মনে করে। ধর্মালয়ের অনেক গুরুই, কনডম, জন্ম নিয়ন্ত্রক পিল ইত্যাদিকে অনৈতিক বলে শিক্ষা দেয়।
অপরপক্ষে প্রগতিশীলেরা প্রগতিপন্থী, জীবনের মান উন্নয়নের পক্ষে, যে জীবনটা পৃথিবীতে আসছে, তার পৃথিবীতে আসাই একমাত্র প্রশ্ন নয়, শিশুর যত্ন থেকে শুরু করে শিক্ষা বড় হওয়া, সেইগুলো এদের কাছে আরও বড় প্রশ্ন। কোন অবস্থায় একজন মা হচ্ছে, একজন মা তার সন্তানকে পালন করতে সক্ষম কিনা সেটা বিশাল বড় প্রশ্ন তাদের কাছে। আর এই সক্ষমতা কেবল শারীরিক নয়, একজন মায়ের মানসিক সক্ষমতা সন্তান লালনে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ তাদের কাছে। ১৩ বছরের একটি শিশুকন্যা যখন ধর্ষণের শিকার হয়ে গর্ভবতী হয়েছে, সে নিজেই এখনো একজন শিশু, তার পক্ষে কোনভাবেই আরেকটি শিশুর দ্বায়িত্ব নেয়া সম্ভব না, তাকে বড় করা কার্যত অসম্ভব। এই গর্ভধারন যে কেবল মাত্র নতুন জন্ম নেয়া শিশুটির জীবনকে বিপদাপন্ন করছে তা নয়, একই সাথে বিপদাপন্ন করছে গর্ভধারণ করা শিশুটির জীবনও। মা হওয়া শিশুটি আরেকটা শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারে, যদিবা সে বেঁচে যায়, একজন কিশোরী যে নিজেই তার জীবনে ঘটে যাওয়া যৌন সহিংসতা নিয়ে আতংকগ্রস্থ, যার নিজেরই এখনো সঙ্গীদের সাথে খেলে বেড়ানর বয়স, তারপক্ষে যে আরেকটা শিশুর দ্বায়িত্ব নেয়া সম্ভব নয়, তা সহজেই সবার কাছে বোধ্যগম্য, কেবল মাত্র কট্টরপন্থী রক্ষণশীলরা ছাড়া। এমনকি যে নারী তার তিরিশ ছুঁয়েও মা হতে চাইছেনা, তাকে যদি তার অনিচ্ছায় মা হবার দ্বায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হয়, তা কোনভাবেই মা এবং শিশুর জন্য মঙ্গল বয়ে আনেনা। এইসব শিশুদের অধিকাংশই পিতামাতা দ্বারা উপেক্ষিত হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে এই শিশুদের মধ্যে তাদের পরিপক্ব বয়সে দেখা যায় পারিবারিক বা সামাজিক সহিংসতার প্রবণতা, যা যেকোনো সমাজের জন্যই অমঙ্গলকর। যাক সে কথা, এইসব নিয়ে আমেরিকান রিপাবলিকান আর ডেমোক্রাটদের মধ্যে গুটিবাজি চলছে বহু বছর ধরে, তাদের এইসব তর্ক সবসময় যেমন যুক্তিসঙ্গত নয়, তেমন যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করাও সম্ভব নয়।
রক্ষণশীল জীবনবাদীরা জীবন বলতে আসলে কি বোঝে, তা সবসময়ই আমার ব্যাপক আগ্রহের বিষয়।তবে আমি আগ্রহী তার চেয়েও বড় প্রশ্ন নিয়ে, বুঝতে চেষ্টা করছি ঠিক কবে থেকে মানবজীবন শুরু হয়? যেইদিন পিতামাতার শুক্রাণু আর ডিম্বাণুর সম্মিলনে একটা ভ্রূণের জন্ম হল, সেইদিন? সেটাতো আসলে কেবল একটা নতুন জেনেটিক কম্বিনেশন, যা ন-দশ মাস পরে একজন মানুষ শিশুর জন্ম দেবে। কিন্তু চোখ নাক, মুখ, মস্তিষ্কহীন একটি কোষ তা কিনা একটি বালুকণার চেয়েও ছোট, তাকে কি আপনি মানুষ হিসেবে গণ্য করতে পারেন? একটি ভ্রূণকে যদি আমরা মানব হিসেবে চিন্তা করে তার অধিকার নিয়ে সোচ্চার হই, তাহলে পৃথিবীর অসংখ্য এক কোষী থেকে বহুকোষী প্রাণীর অধিকারটাও কি আমাদের চিন্তা করা উচিত নয়? জৈবিকভাবে একটি ডিম আর একটি মানব ভ্রূণের তো আসলে কোন পার্থক্য নেই, এদুটোর কেবল জেনেটিক ম্যাটেরিয়াল আলাদা। একটি ভ্রূণ আর একটি ডিম্বকে আলাদা করে দেখার কারণ কেবল এর ভবিষ্যৎ চিন্তা করে, ভ্রূণটা বেঁচে থাকলে দশমাস পরে একটি মানব শিশুর জন্ম দেবে আর ডিমটা আপনি মুরগীর কাছ থেকে ছিনিয়ে এনে খেয়ে না খেললে ২১ দিন পরে তা থেকে ছোট্ট হলুদ মুরগীর ছানা জন্মাত। এখন আমাদের কাছে, ডিমটা খেয়ে ফেলা ঠিক আছে, কারণ আমরা তো পাখি নই, তাছাড়া ফুড চেইন বলে একটা কথা আছে না! কিন্তু চোখ নাক, মাথা, হাত পা হীন একটা কোষের দলাকে অ্যাবরশন করাকে আমাদের অনেকের কাছেই নৈতিক মনে হয় না, কারণ ঐ কোষের দলাটার একদিন নাক-মুখ-চোখ-মাথা হয়ে একটা শিশুর জন্ম হত, যা কিনা আমাদেরই মানব প্রজাতির একজন হত। বিবর্তন কথা বলে আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে।
No comments:
Post a Comment