Wednesday, September 15, 2010

ফিনিক্স পাখির গান

লেখিকা হওয়ার কোন যোগ্যতাই আমার নেই। কারন, আমি হলাম বাদশাহী আলসেখানার আলসেদের মত, লিখতে আমার মহা আলিস্যে। আর যদিও বা কিছু ছোট ছোট লেখা লিখে ফেলি মাঝে মাঝে, সেগুলো জনসাধারণের পাঠের উপযুক্ত মনে হয় না আমার। তাতে থাকে আমার একান্ত ব্যক্তিগত কিছু অনুভূতির ছোঁয়া। পানিতে নেমে এখনও কাপড় ভেজার ভয় আমার কাটেনি। কেন যেন, ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলোকে আমার মনের কুঠুরিতে সযত্নে লালিত মুহূর্ত করেই রাখতে ভালো লাগে। তাতে যদি আনন্দ থাকে, আমি মনে মনে হাসব, চেহারার আয়নাতে তার ভাসা ভাসা ছাপ পড়ে রইবে। তাতে যদি বেদনা থাকে, তবে আমার কপোল বেয়ে নিঃশব্দে জল গড়িয়ে পড়বে। কিংবা যদি খুব সাদামাটা কোন ব্যাপার হয়ে থাকে, তবে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে নির্লিপ্ত হয়ে বসে রইব। এই স্বাধীনতাটুকু কখনই হারাতে চাই না। তাই বিখ্যাতদের এড়িয়ে যেতেও ভালো লাগে, বিখ্যাত হতেও ভয় লাগে। আমার সহজ সরল নিটোল জীবনে কখনও বার্জার কিংবা এলিটের ইলাস্টিক পেইন্ট পড়ে যাক, সে আমি চাই নে। চেহারায় এখনও আমার খানিকটা কিশোরী সুলভ লালিত্য রয়ে গেছে। আর মায়ের কাছে, ভালোবাসার জনগুলোর কাছে আদুরে গলায় করি শিশুর মত আবদার। ওইটুকু হারালে আমি একেবারে খাঁটি মানব যন্ত্র হয়ে যাব।তাইতো আমার এতো আড়াল আবদার। অফিস, বিশ্ববিদ্যালয় আর বাসার বাইরে কাউকে চিনি না। চিনে ফেলার সম্ভাবনা থাকলে আগে ভাগে পালিয়ে বাঁচি। যোগাযোগের এই যুগে বসেও নেট বন্ধুতা আর টেলিফোনে সখ্যতা দারুন ভিতীকর আমার কাছে। এগুলো আমার কাছে প্রয়োজনে যোগাযোগের মাধ্যম, এর চেয়ে বেশী মূল্য পায়নি। সেই যে একবার, কলেজের বন্ধুরা মিলে গিয়েছিলাম পিকনিকে, সেখানে গিয়ে পুকুরের জলে পা ডুবিয়ে জলকে মুকুর বানিয়ে নিজের রূপে মুগ্ধ হয়েছিলাম, ভুলিনি তা।

আরেকবার জাহাংগীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শীতকালীন পাখি দেখতে গিয়ে গাছে চড়ে বানরী খ্যাতি পেয়েছিলাম, আফসোস আমার বানর সখাকে খুঁজে মরি। শৈশবে গাছে চড়তে পারিনি বলে কি জীবনেও সে সাধ মেটাবোনা? বরং ভালোই হয়েছে, কিছু শিশুসুলভ সাধ অপূর্ণ রয়ে গেছে বলে আমার শৈশবও এখনো কাটেনি। আমার ছোট বোন আমাকে ডাকে বাবুনী, ইলেকট্রিসিটি চলে গেলে চার্জার নিয়ে যখন পড়তে বসি, আমার মুখখানির দিকে আমার ছোট্ট বুবুনীটা অপলক তাকিয়ে থাকে, মাঝে হঠাৎ বলে ওঠে, তুমি আসলেই বাবু।আমি দেই কষে একটা বকা। ইঁচড়ে পাকা মেয়ে কোথাকার!

বুয়েটে যখন তরতাজা বছর, তখন এক স্ট্রাইকের দিনে দেয়াল টপকে ক্যাম্পাসে ঢুকে অ্যাডভাইজার স্যারের কাছে রেজিস্ট্রেশন করতে গিয়ে দিয়েছিলাম তাকে মহা চমকে! সে রিতীমত আমাকে জেরা করেছিল, ঢুকলে কিভাবে? আমি তো লাজুক লতাটির মত মাথা নীচু করে আছি দাড়িঁয়ে। বলিনা বলিনা। শেষে যখন বলে দিলাম, স্যার দেয়াল টপকে, স্যার যে বিখ্যাত হাসি খানা দিলো, সে আমি মরার আগেও ভুলব না।

ডিকেডি স্যারকে ভয় পায় না, এমন ছাত্রছাত্রী এখনো বুয়েটের মেক্যানিকাল ডিপার্টমেন্টে আসেনি। সেই স্যার কে দেখেছি মায়া গোপন করতে, অন্য স্যারকে দিয়ে খোঁজ নেয়াতে, তিনটি বালিকা কেন চুপসে আছে উৎসবের এক কোণে! স্যারের পড়ানোর ধরনে আমি স্যারকে শিক্ষক হিসেবে শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছিলাম। সেইদিন দেখেছি তার পিতৃরূপ। আমরা আবার আজকালকাল ছেলেমেয়ে তো। শিক্ষকদের নামের শেষে যে স্যার উচ্চারন করতে হয়, তা মনে রাখা বাহু্ল্য মনে করি। কিন্তু আমি বড়ই গুরুভক্ত। দীপক কান্তি দাশ স্যারকে আমার সামনে কেউ ডিকেডি বললে বেহায়ার মত শুধরে দিয়ে বলি, ডিকেডি না, ডিকেডি স্যার।
ফুটবল গ্যঞ্জাম আমরাও পেয়েছি। ব্রাজিল, আর্জেনটিনা, ফ্রান্সের গোল বন্যায় চিৎকার দিয়ে উল্লাসে মাতব বলে টার্ম জ়টে পড়তেও কখনো আমরা দ্বিধা করিনা। এইবার হল ভ্যাকান্টের পরের দিন ভালবাসার ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখি, ক্যাম্পাস এখন স্কুল ছাত্রদের দখলে। ভীষন হাসি পেয়ে গেল। মনে পড়ে গেলো প্রথম বর্ষের প্রথম দিনের কথা। ওএবির গোলক ধাঁধায় পথ হারিয়ে ক্লাস খুঁজে না পাই। এক অচেনা ছেলেকে তার অজান্তে অনুসরণ করে দেখি, সে আধাঁরে হারালো। আমি দাড়ালাম থমকে! এই অন্ধকারে ঢুকবো? এইখানে কি কোন ক্লাস থাকতে পারে? ছেলেটা এর মধ্যে ঢুকে আর বেরোচ্ছে না কেন? দুরু দুরু বুকে আমিও পা বাড়ালাম সেই অন্ধকারে। আধাঁর পেরিয়ে দেখি, সেই্খানে এক আদ্যিকালের ক্লাসরুম এবং সেটাই বিখ্যাত, ওএবি ২২২! জানালা দিয়ে দেখা যায়, স্কুলের বাচ্চাগুলো ক্লাসে মনোযোগ না দিয়ে খাতার পাতা ছিড়ে চিড়িয়াখানার বাঁদরকে কলা ছোড়ার মত করে আমাদের ক্লাসের দিকে ছুড়ে মারছে।

তৃতীয় বর্ষে পা দিয়েই উড়তে শিখেছিলাম। ক্লাস বাং মারা, ক্যাফেটরিয়া নিজেদের দখলে নেয়া, মেক্যানিকালের ছেলেবন্ধুদের সাথে ক্যাম্পাসে নতুন নতুন পাখি দেখা এবং দেখানো, অটো, সেশনালের রিপোর্ট কপি করা, ক্লাস টেস্ট না দেয়া, নবাগত বালক স্যারকে রিতীমত উপেক্ষা করে পিছনের বেঞ্চের বন্ধুর সাথে আড্ডা মারা এহেন কাজ নেই যা করিনি। সেইসাথে শুরু হল আমার বাঁধনে পদচারনা। আড্ডাবাজিতে রাতারাতি খ্যাতি পেয়ে গাদাখানেক জুনিয়র সাথে নিয়ে রাত সাড়ে নয়টা দশটা পর্যন্ত শহীদ মিনারে হৈ-হুলোড় কিছুই বাদ দেইনি।ক্লাশের বন্ধুরা ডাকে ভ্যাম্পায়ার! ক্যাম্পাসের দেয়ালে দেয়ালে দলবল নিয়ে পোষ্টার সাঁটি আর জায়গায় জায়গায় প্রোগাম বুঝে ব্যানার ঝুলাই। নিজেকে বেশ বড় বড় লাগে তখন। এসব করে টরে মনে হয়েছে, জীবনের রংগুলো সবই দেখে নিয়েছি। কিন্তু রঙ দেখা যে এখনো বাকি, সে আমি জানি।

সুইডেনে স্বপ্নসাধের বায়োমেডিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্সে চান্স পেয়ে খুশির রেশ না কাটতেই দেখি, ফাঁকা ফাঁকা লাগে! মনে হয়, পায়ের নিচ থেকে ঝুর ঝুর করে সরে যাচ্ছে মাটি। মামনির আদর করে সকাল বেলা ঘুম ভাঙ্গানো হাত কেমন যেন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। ছোট দুটো ভাই বোন যেন জোড়া চড়ুই পাখির মত উড়ে চলে যাচ্ছে। আমাকে ঘরে না দেখলে বাবা অস্থির হয়ে যায়, বাবা আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, না আমারই ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে! শেষবার যখন আমি আর আব্বু ট্রেনে চড়ে ঢাকায় ফিরছিলাম, সেদিনের গল্পগুলো, গাছগুলো, সবুজ মাঠ গুলো সব যেন হারিয়ে যাচ্ছে। অফিসের ট্যুরে নীলফামারীর নীলসাগরে গিয়ে হাতে মিউজিক বক্স নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলাম পানিতে পা চুবিয়ে।কয়েকটা জলফড়িং ঘুরছিল আশেপাশে।দেশময় সোনালী ধান আর সোনালু ফুলের ঝুলের গায়ে শেষবিকেলের যে রোদের ছোঁয়া দেখেছি, সব আমাকে পিছনে ফেলে যেতে হবে।সুইডিশ এম্বাসীর ডাকের অপেক্ষায় আছি কেবল।

মাথায় এখন নতুন চিন্তা। ভিসা, বাসা আর বেঁচে থাকার খোরাক যোগাতে হবে নিজের জন্য। সেই সাথে স্বপ্ন গড়া। একটা একটা করে বইয়ের পাতা উল্টাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে দারুন কিছু গবেষনায় যুক্ত হব, সেই আশা মনে। দেশের মাটি ছেড়ে যাবো, একটা মিশন নিয়ে। সেই মিশনে হেরে যাবার কোন পথ খোলা নেই আমার জন্য। তাই এখনি, মনোযোগ বিচ্যুত হতে পারে, এমন সব কিছু থেকে সরিয়েছি নিজেকে। কিন্তু নিজের আত্মাটাই তো এখানে। বাসে চড়ে ঘরে ফেরার মুহূর্তে মনে হয়, যে পথে পা বাড়ালাম, সে পথকে টেনে আমার দেশের দিকে আনতে পারবো তো। বিজয়ীনির বেশে আমার শাড়ির আঁচল উড়বে তো দিন শেষের পাগলা হাওয়ায়? নিশ্চিত স্থবির জীবনের প্রতি আমার মোহ নেই, মোহ আছে এই লড়াইয়ের প্রতিই। তাই এই অনিশ্চয়তা আমার কাছে স্বাগত। পাহাড়ী মেয়ের মত এইবার পাহাড় ডিঙ্গাবো, জলকন্যার মত এইবার জলে দেব ডুব, ফিনিক্সের মত এইবার উড়বো আকাশে। কিন্তু পুড়ে কি ছাই হব? দেশের মাটির বুকে সমাধিটুকু পাবো তো শেষটাই? জানিনা। জানার সময় হলে জেনে যাবো।শুধু প্রান আর স্মৃতি, আমার নিঃশ্বাসকে যেয়ো না নিঃস্ব করে।



No comments:

Post a Comment